মৃত্যুর পরের প্রথম রাত: কবরে কী ঘটে
মৃত্যুর পর কবরের জীবন ও মুনকার-নাকিরের জিজ্ঞাসাবাদের বিস্তারিত বর্ণনা
ধর্ম ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর থেকে কেয়ামত পর্যন্ত সময়টিকে ‘বরজখ’ বা অন্তর্বর্তীকালীন জগত বলা হয় এবং কবর হলো পরকালের প্রথম গন্তব্য। যখন স্বজনেরা মৃত ব্যক্তিকে অন্ধকার কবরে একাকী রেখে ফিরে আসেন, তখন শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও অপরিচিত অধ্যায়—কবরের প্রথম রাত। ওসমান (রা.) কবরের পাশে দাঁড়ালে অঝোরে কাঁদতেন, কারণ মহানবী (সা.) বলেছেন, কবর হলো পরকালের প্রথম ঘাঁটি এবং কেউ এখানে মুক্তি পেলে তার পরের স্তরগুলো সহজ হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
মৃত ব্যক্তিকে দাফন করে স্বজনেরা ফিরে গেলে তিনি তাদের জুতার আওয়াজ শুনতে পান। এরপরই শুরু হয় কবরের প্রথম ও ভীতিকর অভিজ্ঞতা, যাকে হাদিসের ভাষায় ‘দাবগাতুল কবর’ বা কবরের চাপ বলা হয়। মাটি তার ভেতরের বাসিন্দাকে চারদিক থেকে প্রবল জোরে চেপে ধরে; এই চাপ থেকে পাপী বা পুণ্যবান কেউই পুরোপুরি মুক্ত নন। তবে পুণ্যবানদের জন্য এই চাপ হয় মায়ের মমতাময়ী আলিঙ্গনের মতো, আর পাপীদের জন্য তা পাঁজর ভেঙে দেওয়ার মতো। মহানবী (সা.) মদিনার শ্রেষ্ঠ সাহাবিদের একজন সাদ ইবনে মুয়াজের জানাজা শেষে বলেছিলেন, ‘কবরের একটি চাপ আছে; যদি কেউ এই চাপ থেকে রেহাই পেত, তবে সাদ ইবনে মুয়াজ রেহাই পেত।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ২০৫৪)।
কবরের চাপ শেষ হওয়ার পর সেখানে উপস্থিত হন মুনকার ও নাকির নামক দুজন ভয়াবহ আকৃতির ফেরেশতা, যাদের চোখগুলো তামার হাড়ির মতো জ্বলজ্বলে এবং গলার আওয়াজ বজ্রপাতের মতো। তাঁরা মৃত ব্যক্তিকে বসিয়ে অত্যন্ত কঠোরভাবে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন করেন—‘তোমার রব কে?’, ‘তোমার ধর্ম কী?’ এবং ‘এই ব্যক্তি (মুহাম্মদ সা.) সম্পর্কে তুমি কী বলতে?’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৫৩)। পার্থিব বিদ্যা দিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়, তবে যাদের অন্তরে প্রকৃত ইমান ছিল, আল্লাহ তাদের এই ভয়ংকর মুহূর্তে স্থির রাখবেন।
আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ মুমিনদের ইহকাল ও পরকালে (কবরে) শাশ্বত বাণীর ওপর সুদৃঢ় রাখেন...।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ২৭)। ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, কবরে মুনকার-নাকিরের জেরার সময় মুমিনদের অন্তর স্থির রাখা এবং সঠিক উত্তর দেওয়ানোর নিশ্চয়তা আল্লাহ এই আয়াতে দিয়েছেন (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৪/৫০৬, দারু তাইয়িবাহ, রিয়াদ, ১৯৯৯)।
কবরের প্রথম রাতের একাকিত্বে মৃত ব্যক্তির পাহারাদার হিসেবে আবির্ভূত হয় তার দুনিয়ার নেক আমলগুলো। যখন আজাব বা ভীতি তার কাছে আসতে চায়, তখন আমলগুলো শারীরিক রূপ নিয়ে ছায়ার মতো আগলে রাখে। যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখা হয়, তখন নামাজ মাথার কাছে, রোজা ডান পাশে, জাকাত বাঁ পাশে এবং দান-সদকা ও মানুষের সঙ্গে করা সদাচরণ পায়ের কাছে এসে দাঁড়ায়। ফেরেশতারা যেদিক থেকেই আসতে চান, আমলগুলো বলে ওঠে—এদিক দিয়ে আসার কোনো পথ নেই (আল-কুরতুবি, আত-তাজকিরাহ বি-আহওয়ালিল মাওতা ওয়া উমুরিল আখিরাহ, পৃষ্ঠা ১৫৪, মাকতাবাতুল বুখারি, কায়রো, ২০০৮)।
বিজ্ঞাপন
মুনকার ও নাকিরের তিনটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়ার পর আসমান থেকে ঘোষক ঘোষণা দেন যে, ‘আমার বান্দা সত্য বলেছে।’ এরপর তার কবরে বেহেশতের বিছানা বিছিয়ে দেওয়া হয় এবং বেহেশতের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়া হয়, যেখান থেকে প্রশান্তির বাতাস বইতে থাকে। আর যদি উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়, তবে কবরে দোজখের আগুন বিছিয়ে দেওয়া হয়। মহানবী (সা.) এই পরিণতির বিষয়ে বলেছেন, ‘কবর হলো বেহেশতের বাগানগুলোর মধ্য থেকে একটি বাগান অথবা দোজখের গর্তগুলোর মধ্য থেকে একটি গর্ত।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৬০)।
কবরের প্রথম রাতের এই পরীক্ষার মুখে মৃত ব্যক্তি যখন থাকেন, তখন জীবিতদের একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। নবীজির সুন্নত হলো, দাফন শেষ করে দ্রুত চলে না গিয়ে কিছু সময় কবরের পাশে দাঁড়ানো। মহানবী (সা.) দাফন শেষে সাহাবিদের বলতেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং সে যেন (জিজ্ঞাসাবাদের সময়) অবিচল থাকতে পারে, সেই দোয়া করো; কারণ এখনই তাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩২২১)। কবরের জীবন মানুষের চোখের আড়ালে হলেও এটি চিরন্তন সত্য এবং দুনিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপে পরকালের প্রস্তুতির নামই হলো বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ মুমিনের কাজ।