সূরা ওয়াকিয়া বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: বিষয়বস্তু ও ফজিলত
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
"আমি যখন রাতে সূরা ওয়াকিয়া পড়ি, মনে হয় চোখের সামনে কিয়ামতের ছবি ভেসে ওঠে।" এমন অনুভূতির কথা অনেক পাঠকই বলেন। কারণ সূরাটির ভাষা ছোট ছোট বাক্যে, দ্রুত লয়ে, যেন একটি মহা ঘটনার ধারাবিবরণী।
বিজ্ঞাপন
সূরা ওয়াকিয়া কোরআনের ৫৬তম সূরা। এটি মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত সংখ্যা ৯৬, অবস্থান ২৭তম পারায়, সূরা আর রহমানের ঠিক পরে। ওয়াকিয়া শব্দের অর্থ অবশ্যম্ভাবী ঘটনা, এখানে কিয়ামত বোঝানো হয়েছে।
সূরার কেন্দ্রীয় বিষয় হলো কিয়ামতের দিন মানুষ তিন দলে ভাগ হয়ে যাবে: অগ্রবর্তী দল, ডান দিকের দল এবং বাম দিকের দল। প্রত্যেক দলের পরিণতি বর্ণনার পর আল্লাহর সৃষ্টিক্ষমতার কিছু চেনা উদাহরণ দিয়ে পুনরুত্থানের প্রমাণ দেওয়া হয়েছে, আর শেষ হয়েছে মৃত্যুর মুহূর্তের এক জীবন্ত দৃশ্য দিয়ে।
প্রথম ছয় আয়াত: বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
আয়াত ১-৩: ইজা ওয়াকাআতিল ওয়াকিআহ। লাইসা লিওয়াকআতিহা কাজিবাহ। খাফিদাতুর রাফিআহ।
বিজ্ঞাপন
অর্থ: যখন সেই অবশ্যম্ভাবী ঘটনা ঘটবে, তখন তার সংঘটনকে অস্বীকার করার কেউ থাকবে না। তা কাউকে নিচে নামিয়ে দেবে, কাউকে ওপরে তুলে দেবে।
আয়াত ৪-৬: ইজা রুজ্জাতিল আরদু রাজ্জা। ওয়া বুসসাতিল জিবালু বাসসা। ফাকানাত হাবাআম মুম্বাসসা।
অর্থ: যখন পৃথিবী প্রবল কম্পনে কেঁপে উঠবে, আর পাহাড়গুলো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে, তারপর তা বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত হবে।
তৃতীয় আয়াতটি বিশেষভাবে ভাবার মতো। দুনিয়াতে যারা ক্ষমতা ও সম্পদে উঁচুতে ছিল, তাদের অনেকে সেদিন নিচে নেমে যাবে; আর দুনিয়াতে অবহেলিত অনেক মুমিন উঁচু মর্যাদা পাবে।
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ দিয়ে কোরআনের সঠিক তিলাওয়াত সম্ভব নয়। পুরো সূরা আরবি মুসহাফ দেখে কোনো শিক্ষকের কাছে শিখে নিন।
মানুষের তিন দল
অগ্রবর্তী দল (আস-সাবিকুন): আয়াত ১০ থেকে ২৬। যাঁরা ঈমান ও সৎকাজে সবার আগে এগিয়ে ছিলেন, তাঁরাই আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী। এ দলের বড় অংশ পূর্ববর্তী যুগের, আর অল্প কিছু পরবর্তী যুগের। তাঁদের জন্য নেয়ামতে ভরা জান্নাত, মণিমুক্তা খচিত আসন, অনিঃশেষ পানীয়, পছন্দের ফল ও পাখির গোশত। সেখানে কোনো অনর্থক বা পাপের কথা শোনা যাবে না, শুধু "সালাম, সালাম"।
ডান দিকের দল (আসহাবুল ইয়ামিন): আয়াত ২৭ থেকে ৪০। সাধারণ মুমিনেরা, যাঁদের আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে। তাঁদের জন্য কাঁটাহীন কুলগাছ, থরে থরে সাজানো কলা, বিস্তৃত ছায়া, প্রবহমান পানি আর অফুরন্ত ফল। এ দলে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী দুই যুগেরই বহু মানুষ থাকবেন।
বিজ্ঞাপন
বাম দিকের দল (আসহাবুশ শিমাল): আয়াত ৪১ থেকে ৫৬। যারা দুনিয়ায় ভোগবিলাসে মত্ত ছিল, বড় গুনাহে অটল ছিল এবং বলত, মরে মাটি ও হাড় হয়ে গেলে আবার কি আমাদের উঠানো হবে? তাদের জন্য উত্তপ্ত বাতাস, ফুটন্ত পানি, কালো ধোঁয়ার ছায়া, যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়। খাবার হিসেবে জাক্কুম গাছ।
এই তিন দলের বর্ণনা পাঠককে নিজেকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে: আমি কোন দলের পথে হাঁটছি? লক্ষ করার বিষয়, বাম দিকের দলের অপরাধ হিসেবে শুধু কুফরির কথা বলা হয়নি, বলা হয়েছে তারা আগে ভোগবিলাসে ডুবে ছিল এবং বড় পাপে অটল থাকত। অর্থাৎ উদাসীন আরামপ্রিয় জীবন আর গুনাহে জেদ ধরে থাকা, দুটিই মানুষকে ভুল দলের দিকে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে অগ্রবর্তীদের পরিচয় একটাই, তারা কল্যাণের কাজে অন্যদের আগে এগিয়ে যেত।
চারটি প্রশ্ন: সৃষ্টির নিদর্শন
আয়াত ৫৭ থেকে ৭৪ পর্যন্ত আল্লাহ মানুষের সামনে প্রতিদিনের চারটি বিষয় তুলে ধরে প্রশ্ন রেখেছেন।
বিজ্ঞাপন
১. মানুষের জন্ম: তোমরা যে শুক্রবিন্দু নিক্ষেপ করো, তা থেকে মানুষ কি তোমরা সৃষ্টি করো, না আমি সৃষ্টিকর্তা?
২. ফসল: তোমরা যে বীজ বপন করো, তা থেকে কি তোমরা ফসল উৎপন্ন করো, না আমি? আমি চাইলে একে খড়কুটো বানিয়ে দিতে পারতাম।
৩. পানি: যে পানি তোমরা পান করো, মেঘ থেকে তা কি তোমরা নামাও, না আমি? আমি চাইলে একে লবণাক্ত করে দিতে পারতাম, তবু কেন তোমরা কৃতজ্ঞ হও না?
৪. আগুন: যে আগুন তোমরা জ্বালাও, তার গাছ কি তোমরা সৃষ্টি করেছ, না আমি?
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের কৃষক যখন মাঠে বীজ ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির অপেক্ষা করেন, তখন এই আয়াতগুলোর বাস্তবতা সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়। প্রতিটি প্রশ্নের পর সূরাটি পাঠককে মহান রবের নামে তাসবিহ পাঠ করতে বলে।
কোরআনের মর্যাদা ও মৃত্যুর মুহূর্ত
আয়াত ৭৫ থেকে ৮২-তে নক্ষত্রের অবস্থানস্থলের শপথ করে বলা হয়েছে, এটি সম্মানিত কোরআন, সুরক্ষিত কিতাবে সংরক্ষিত, পবিত্রগণ ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করে না। মুসহাফ স্পর্শের জন্য ওজুর বিধান নিয়ে আলোচনায় ফকিহরা এ আয়াত উল্লেখ করেন।
এরপর আয়াত ৮৩ থেকে ৮৭-তে মৃত্যুর দৃশ্য: প্রাণ যখন কণ্ঠনালিতে পৌঁছে যায়, তোমরা তখন তাকিয়ে থাকো, অথচ আমি তোমাদের চেয়েও তার বেশি কাছে, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমরা যদি কারও কর্তৃত্বাধীন না হও, তাহলে প্রাণটিকে ফিরিয়ে আনো না কেন?
বিজ্ঞাপন
শেষ অংশে আবার তিন দলের প্রসঙ্গ, তবে এবার মৃত্যুর মুহূর্ত থেকে। নিকটবর্তীদের জন্য আরাম, রিজিক ও নেয়ামতের জান্নাত; ডান দিকের দলের জন্য শান্তির সালাম; আর অস্বীকারকারীদের জন্য ফুটন্ত পানির আপ্যায়ন। শেষ আয়াত: "ফাসাব্বিহ বিসমি রাব্বিকাল আজিম", অতএব তোমার মহান রবের নামের পবিত্রতা ঘোষণা করো। আবু দাউদের এক বর্ণনায় আছে, এ আয়াত নাজিল হলে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, এটি তোমাদের রুকুতে রাখো। তাই রুকুতে "সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম" পড়া হয়।
সূরা ওয়াকিয়ার ফজিলত: কোনটি নির্ভরযোগ্য
"যে প্রতি রাতে সূরা ওয়াকিয়া পড়বে, সে কখনো অভাবে পড়বে না", এই বর্ণনাটি বাংলাদেশে খুব প্রচলিত। এটি বায়হাকিসহ কিছু গ্রন্থে এসেছে, কিন্তু অধিকাংশ মুহাদ্দিস এর সনদকে দুর্বল বলেছেন। তাই একে নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়। কেউ চাইলে তিলাওয়াতের সাধারণ সওয়াবের নিয়তে প্রতি রাতে পড়তে পারেন, তবে রিজিকের জন্য হালাল উপার্জন ও পরিশ্রমের বিকল্প হিসেবে নয়।
তিরমিজিতে বর্ণিত একটি হাদিসে আছে, হজরত আবু বকর (রা.) মহানবী (সা.)-কে বলেছিলেন, আপনার চুল তো পেকে গেছে। তিনি বলেছিলেন, সূরা হুদ, ওয়াকিয়া, মুরসালাত, আম্মা ইয়াতাসাআলুন ও ইজাশ শামসু কুওভিরাত আমাকে বুড়ো করে দিয়েছে। কিয়ামতের ভয়াবহ বর্ণনা মহানবী (সা.)-কে কতটা ভাবিয়েছিল, এ হাদিস তারই প্রমাণ। সূরাটির আসল ফজিলত এখানেই, এটি আখিরাতকে চোখের সামনে এনে দেয়।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সূরা ওয়াকিয়া কখন পড়া ভালো?
নির্দিষ্ট সময়ের নির্ভরযোগ্য কোনো বিধান নেই। অনেকে মাগরিব বা এশার পর পড়েন। যে সময়ে মনোযোগ বেশি থাকে, সেটিই ভালো।
সূরা ওয়াকিয়া পড়লে কি রিজিক বাড়ে?
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ের প্রচলিত বর্ণনাটি দুর্বল। তবে কোরআন তিলাওয়াত, ইস্তেগফার ও তাকওয়ার মাধ্যমে রিজিকে বরকতের কথা কোরআনের অন্য আয়াতে এসেছে।
সূরা ওয়াকিয়ায় কয়টি আয়াত?
প্রচলিত গণনায় ৯৬টি আয়াত। আয়াত গণনার বিভিন্ন পদ্ধতিতে সংখ্যায় সামান্য পার্থক্য দেখা যায়, তবে সূরার শব্দে কোনো পার্থক্য নেই।
অর্থ না বুঝে পড়লে কি সওয়াব হবে?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ, তিলাওয়াতের প্রতিটি হরফে সওয়াব আছে। তবে মাঝে মাঝে অনুবাদসহ পড়লে সূরার বার্তা হৃদয়ে গেঁথে যায়।