চাকরি হারিয়ে কৃষিতে সফল নূর শাহানা কলি
কোভিডকালে কর্মহীন হওয়ার পর ইনডোর প্ল্যান্টের ব্যবসায় বছরে চার-পাঁচ লাখ টাকা আয় করছেন এই নারী উদ্যোক্তা
যশোর জেলা প্রতিনিধি · যশোর
প্রকাশ:
শরতের এক রোদঝলমলে সকালে যশোরের পুরাতন কসবার বাসিন্দা নূর শাহানা কলি নিজের বাগানের আঙিনায় নিবিড় মমতায় টবের গাছের যত্ন নিচ্ছিলেন। বৃক্ষপ্রেমী এই নারী কর্মীদের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন গাছের পরিচর্যা ও ছাঁটাইয়ের বিষয়ে। মূলত একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া কলির জীবনের পথচলা ছিল নানা অপমান, বঞ্চনা ও প্রতিকূলতায় ভরা।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘ ২৫ বছর একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করার পর কোভিড মহামারির সময় চাকরি হারান তিনি। অলস সময় কাটানোর এক পর্যায়ে ছোটবেলার শখ থেকে ইনডোর প্ল্যান্ট বা ঘরের ভেতরের গাছের চারা তৈরি করে টবে বিক্রি শুরু করেন। বর্তমানে এই উদ্যোগটি বেশ লাভজনক হয়ে উঠেছে, যেখানে বছরে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার গাছ বেচাকেনা হয় এবং তাঁর বাগান ও শোরুমে পাঁচজন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
নূর শাহানা কলির সফলতার পথটি সহজ ছিল না, কারণ যশোরে নিজস্ব জমি না থাকায় ভাড়া করা জমিতে বাগান করতে গিয়ে তাঁকে চারবার জায়গা বদলাতে হয়েছে। শহরের অনেকে বাড়ির বারান্দা বা ছাদে গাছ রাখার কারণে তাঁকে বাসা ভাড়া দিতে অস্বীকার করেছেন। ব্যবসার প্রসারের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের দ্বারে ঘুরেও ঋণ পেতে ব্যর্থ হন তিনি, তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তার সহায়তায় একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ পেলেও শর্ত ও জিম্মাদারের অপমানজনক মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ছয় মাসের মাথায় তিনি সেই টাকা ফিরিয়ে দেন। পরবর্তীতে কৃষি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা তাঁকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ মঞ্জুর করেছিলেন, যা তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
বর্তমানে নিজস্ব শোরুমে ১৫০ থেকে ২০০ জাতের গাছ সংগ্রহে রেখেছেন কলি। এর মধ্যে রয়েছে এরিকা পাম, র্যাপিস পাম, ৩০ ধরনের কাঠগোলাপ, গ্রিন ও রেড জিজি, থাইল্যান্ডের বাঁশ, বার্ড অব প্যারাডাইসসহ ৩০-৩৫ প্রজাতির ক্যাকটাস ও ঔষধি চারা। সবজির খোসা, কোকোপিট, ডিমের খোসা ও হাড়ের গুঁড়ো ব্যবহার করে সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে এসব চারা প্রস্তুত করা হয়।
তাঁর ব্যবসার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো গাছ ভাড়ার সেবা, যার আওতায় যশোরের সাতটি ব্যাংকের অফিসকে তিনি নিয়মিত গাছ সরবরাহ করেন। তাঁর কর্মীরা মাসে দু-এক দিন গিয়ে পুরোনো গাছ বদলে নতুন গাছ দিয়ে আসেন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মঞ্চ সাজাতেও তাঁর গাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দুই সন্তানকে বিয়ে দেওয়ার পর এখন তাঁর সময় কাটে গাছের পরিচর্যায়, যার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি তিনবার বৃক্ষমেলা পুরস্কার ও একটি ব্যাংক থেকে প্রশিক্ষণসহ অর্থ অনুদান পেয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
মানুষের ঈর্ষা ও শখের গাছ নষ্ট করার মতো কুৎসিত মানসিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। নূর শাহানা কলি বলেন, ‘এই সবুজ উদ্যোগ না নিলে আমি হয়তো চারপাশের মানুষগুলোকে এত ভালোভাবে চিনতে পারতাম না। আমি দেখেছি, মানুষের সাফল্যে আশপাশের মানুষ কতটা ঈর্ষাপরায়ণ হতে পারে। অনেকে আমার গাছ নষ্ট করে দিয়েছে। একবার বিষ দিয়ে সব গাছ মেরে ফেলেছিল। সে কারণে আমার ছোট্ট এই বাগানটির জায়গা বদল করতে হয়েছে চারবার। কিন্তু যখন আমার গাছগুলোর সজীব–সতেজ হয়ে ওঠা দেখি, ফুল ফুটতে দেখি তখন সব কষ্ট ম্লান হয়ে যায়। আমি এখন মানুষকে বলি, সবুজ গাছকে বন্ধু বানান। এতে মন অনেক ভালো থাকবে।’