সূরা কিয়ামাহ বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: কিয়ামত দিবসের বর্ণনা
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
"মানুষ কি মনে করে, আমি তার হাড়গুলো একত্র করতে পারব না? অবশ্যই পারব, আমি তার আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত নিখুঁতভাবে আবার গড়ে দিতে সক্ষম।" সূরা কিয়ামাহর তৃতীয় ও চতুর্থ আয়াতের এই কথাগুলো মৃত্যুর পর পুনরুত্থান নিয়ে সংশয়ের সবচেয়ে সরাসরি জবাব।
বিজ্ঞাপন
সূরা কিয়ামাহ কোরআনের ৭৫তম সূরা, ২৯তম পারায় অবস্থিত। এটি মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত সংখ্যা ৪০। কিয়ামাহ অর্থ পুনরুত্থান বা মহাপ্রলয়ের দিন। সূরার শুরুতেই এই দিনের শপথ করা হয়েছে, সেখান থেকে নাম।
চল্লিশ আয়াতের এই সূরায় চারটি অংশ স্পষ্টভাবে আলাদা করা যায়: পুনরুত্থানের প্রমাণ ও কিয়ামতের দৃশ্য, ওহি গ্রহণের আদব নিয়ে মহানবী (সা.)-কে নির্দেশনা, কিয়ামতের দিন মানুষের দুই রকম চেহারা, এবং মৃত্যুর মুহূর্তের বর্ণনা ও শেষ প্রশ্ন।
শুরুর আয়াত: বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
আয়াত ১-২: লা উকসিমু বিইয়াওমিল কিয়ামাহ। ওয়ালা উকসিমু বিন নাফসিল লাওয়ামাহ।
বিজ্ঞাপন
অর্থ: আমি শপথ করছি কিয়ামত দিবসের। আর শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।
আয়াত ৩-৪: আইয়াহসাবুল ইনসানু আল্লান নাজমাআ ইজামাহ। বালা কাদিরিনা আলা আন নুসাওয়িয়া বানানাহ।
অর্থ: মানুষ কি মনে করে, আমি তার হাড়গুলো একত্র করব না? অবশ্যই, আমি তার আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম।
আয়াত ৫-৬: বাল ইউরিদুল ইনসানু লিইয়াফজুরা আমামাহ। ইয়াসআলু আইয়ানা ইয়াওমুল কিয়ামাহ।
বিজ্ঞাপন
অর্থ: বরং মানুষ সামনেও পাপাচার চালিয়ে যেতে চায়। সে জিজ্ঞেস করে, কিয়ামতের দিন কবে?
প্রথম আয়াতের শুরুতে "লা" থাকায় অনেকে ভাবেন অর্থ "শপথ করছি না"। তাফসিরকারকেরা ব্যাখ্যা করেছেন, আরবি অলংকারে শপথের আগে "লা" ব্যবহার করে বক্তব্যে জোর দেওয়া হয়, অর্থাৎ বিষয়টি এতই স্পষ্ট যে শপথের প্রয়োজনই নেই, তবু শপথ করছি। বাংলা উচ্চারণ কেবল সহায়ক, শুদ্ধ তিলাওয়াত মুসহাফ দেখে শিক্ষকের কাছে শিখুন।
নফসে লাওয়ামা: তিরস্কারকারী আত্মা
দ্বিতীয় আয়াতে যে আত্মার শপথ করা হয়েছে, তাকে বলা হয় "নফসে লাওয়ামা"। এটি সেই বিবেক, যা ভুল করলে মানুষকে খোঁচায়, ভালো কাজে কমতি থাকলেও তিরস্কার করে। তাফসিরকারকেরা বলেন, কিয়ামতের শপথের সঙ্গে এর শপথ করার কারণ হলো, মানুষের ভেতরের এই আদালতই প্রমাণ যে বাইরে একটি চূড়ান্ত আদালত আসবে।
বিজ্ঞাপন
আলেমরা মানুষের নফসের তিনটি অবস্থার কথা বলেন, যার নাম কোরআন থেকে নেওয়া: মন্দের দিকে প্ররোচনাদাতা নফস (সূরা ইউসুফ), তিরস্কারকারী নফস (সূরা কিয়ামাহ) এবং প্রশান্ত নফস (সূরা ফাজর)। ভুলের পর অনুশোচনা জাগা ভালো লক্ষণ, এর অর্থ বিবেক এখনো জীবিত।
কিয়ামতের দৃশ্য ও মানুষের অজুহাত
আয়াত ৭ থেকে ১৫ পর্যন্ত কিয়ামতের দিনের ছবি: দৃষ্টি যখন চমকে স্থির হয়ে যাবে, চাঁদ আলোহীন হবে, সূর্য ও চাঁদকে একত্র করা হবে। সেদিন মানুষ বলবে, পালানোর জায়গা কোথায়? কিন্তু কোনো আশ্রয় থাকবে না, সেদিন ঠাঁই কেবল তোমার রবের কাছে।
মানুষকে জানানো হবে, সে কী আগে পাঠিয়েছে আর কী পেছনে রেখে গেছে। তাফসিরকারকেরা বলেন, "পেছনে রেখে যাওয়া" বলতে এমন কাজও বোঝায়, যার প্রভাব মৃত্যুর পরও চলতে থাকে, ভালো হোক বা মন্দ।
বিজ্ঞাপন
১৪ ও ১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ নিজেই নিজের সম্পর্কে ভালো জানে, যদিও সে নানা অজুহাত পেশ করে। অর্থাৎ নিজেকে ফাঁকি দেওয়া যায় না। অন্যের সামনে আমরা নিজের ভুলের নানা ব্যাখ্যা দিই, পরিস্থিতিকে দোষ দিই, কিন্তু রাতে একা হলে মন ঠিকই জানে কোথায় ভুল হয়েছে। সেদিন এই ভেতরের সাক্ষ্যই প্রকাশ্য হয়ে যাবে।
ওহি মুখস্থের আদব: আয়াত ১৬-১৯
হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে মহানবী (সা.)-কে বলা হয়েছে, ওহি তাড়াতাড়ি মুখস্থ করার জন্য আপনার জিহ্বা নাড়াবেন না। এটি একত্র করা ও পাঠ করানোর দায়িত্ব আমার। সহিহ বুখারিতে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, জিবরাইল (আ.) ওহি নিয়ে এলে ভুলে যাওয়ার ভয়ে মহানবী (সা.) সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট নাড়াতেন। তখন এই আয়াতগুলো নাজিল হয়। এরপর তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, আর জিবরাইল (আ.) চলে গেলে পড়তেন।
এখানে কোরআনের সংরক্ষণের নিশ্চয়তা আছে, আবার আছে শেখার আদব: আগে মনোযোগ দিয়ে শোনা, তারপর পড়া। কোরআন শেখার ক্ষেত্রে আজও এ শিক্ষা প্রযোজ্য।
বিজ্ঞাপন
সূরা কিয়ামাহ আয়াত ২২: আল্লাহর দর্শন
আয়াত ২০-২১-এ মানুষের আরেকটি দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে: তোমরা নগদ দুনিয়াকে ভালোবাসো আর আখিরাতকে উপেক্ষা করো। এরপর আসে সূরার সবচেয়ে আশাজাগানিয়া দুটি আয়াত:
আয়াত ২২-২৩: উজুহুই ইয়াওমাইজিন নাদিরাহ। ইলা রাব্বিহা নাজিরাহ।
অর্থ: সেদিন কিছু মুখমণ্ডল উজ্জ্বল ও প্রফুল্ল হবে। তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।
বিজ্ঞাপন
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা অনুযায়ী জান্নাতে মুমিনেরা আল্লাহকে দেখবেন, আর এ আয়াত তার অন্যতম দলিল। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে আছে, তোমরা তোমাদের রবকে দেখবে, যেভাবে পূর্ণিমার রাতে চাঁদ দেখো, তা দেখতে তোমাদের কোনো ভিড় বা কষ্ট হবে না। তবে সেই দর্শনের ধরন কেমন হবে, তা মানুষের কল্পনার বাইরে।
বিপরীতে ২৪-২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আর কিছু মুখমণ্ডল সেদিন বিবর্ণ হবে, তারা আশঙ্কা করবে যে তাদের সঙ্গে কোমর ভাঙা আচরণ করা হবে।
মৃত্যুর মুহূর্ত ও শেষ প্রশ্ন
আয়াত ২৬ থেকে ৩০-এ মৃত্যুর এক জীবন্ত দৃশ্য: প্রাণ যখন কণ্ঠার হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন বলা হয়, কে আছে ঝাড়ফুঁক বা চিকিৎসা করার? সে বুঝে যায়, এটি বিদায়ের সময়। পায়ের গোছা গোছার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। সেদিন যাত্রা তোমার রবের দিকে।
বিজ্ঞাপন
এরপর এমন ব্যক্তির পরিচয়: সে সত্য মানেনি, নামাজ পড়েনি, বরং অস্বীকার করেছে ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তারপর দম্ভভরে পরিবারের কাছে ফিরে গেছে।
শেষ অংশে তিনটি প্রশ্ন: মানুষ কি মনে করে, তাকে এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে, কোনো দায়িত্ব ছাড়া? সে কি এক ফোঁটা শুক্রবিন্দু ছিল না? তারপর রক্তপিণ্ড থেকে আল্লাহ তাকে গড়ে সুঠাম করেছেন, নর-নারী জোড়া বানিয়েছেন। শেষ আয়াত: "আলাইসা জালিকা বিকাদিরিন আলা আই ইউহইয়াল মাওতা", অর্থাৎ তবু কি তিনি মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম নন?
আবু দাউদের এক বর্ণনায় আছে, মহানবী (সা.) এই শেষ আয়াত পড়ে বলতেন, "সুবহানাকা ফাবালা", অর্থাৎ তুমি পবিত্র, অবশ্যই তুমি সক্ষম। আলেমরা বলেছেন, নামাজের বাইরে বা একা নফল নামাজে এটি বলা যায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
সূরা কিয়ামাহর বিষয়বস্তু সংক্ষেপে কী?
মৃত্যুর পর পুনরুত্থান সত্য, কিয়ামতের দিন মানুষ নিজের কাজের মুখোমুখি হবে, মুমিনেরা আল্লাহর দর্শন পাবেন, আর মানুষকে উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি করা হয়নি।
সূরা কিয়ামাহর ২২ নম্বর আয়াত কী নিয়ে?
২২ ও ২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সেদিন কিছু মুখ উজ্জ্বল হবে এবং তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে। এটি জান্নাতে আল্লাহর দর্শনের দলিল।
বিজ্ঞাপন
সূরা কিয়ামাহ পড়ার বিশেষ কোনো ফজিলত আছে?
এ সূরার আলাদা কোনো ফজিলত সহিহ হাদিসে নির্দিষ্টভাবে বর্ণিত হয়নি। তবে তিলাওয়াতের সাধারণ সওয়াব আছে, আর আখিরাতের স্মরণে এটি খুব কার্যকর।
নামাজে সূরা কিয়ামাহ পড়া যায়?
হ্যাঁ। এটি মাঝারি দৈর্ঘ্যের সূরা, ফরজ বা নফল যেকোনো নামাজে পড়া যায়। দুই রাকাতে ভাগ করেও পড়া যায়।