সূরা আর রহমান বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: বিষয়বস্তু ও শিক্ষা
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
যে সূরা শুরু হয় আল্লাহর একটি নাম দিয়ে, আর যার মাঝে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে, সেটি সূরা আর রহমান। "ফাবিআইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান", অর্থাৎ অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? সুরেলা কণ্ঠে এই আয়াতের পুনরাবৃত্তি শুনে অনেকেই সূরাটির প্রেমে পড়েন।
বিজ্ঞাপন
সূরা আর রহমান কোরআনের ৫৫তম সূরা, ২৭তম পারায় অবস্থিত। আয়াত সংখ্যা ৭৮। এটি মক্কায় না মদিনায় অবতীর্ণ, তা নিয়ে আলেমদের দুই মত আছে, অধিকাংশ একে মক্কি বলেছেন। "আর রহমান" অর্থ পরম দয়াময়, আল্লাহর একটি বিশেষ নাম, যা কেবল তাঁর জন্যই ব্যবহৃত হয়।
পুরো সূরাটি আল্লাহর নেয়ামতের এক দীর্ঘ তালিকা: কোরআন শিক্ষা, ভাষা, সূর্য-চাঁদের হিসাব, ফল-ফসল, সাগর, মুক্তা-প্রবাল, জাহাজ, আর শেষে জান্নাতের বর্ণনা। মাঝে মাঝে সতর্কবাণীও আছে। প্রতিটি অংশের পর সেই প্রশ্ন, যা মোট ৩১ বার এসেছে।
শুরুর আয়াত: বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
আয়াত ১-৪: আর রাহমান। আল্লামাল কুরআন। খালাকাল ইনসান। আল্লামাহুল বায়ান।
বিজ্ঞাপন
অর্থ: পরম দয়াময়। তিনি কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাকে মনের ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন।
আয়াত ৫-৬: আশশামসু ওয়াল কামারু বিহুসবান। ওয়ান নাজমু ওয়াশ শাজারু ইয়াসজুদান।
অর্থ: সূর্য ও চাঁদ নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী চলে। আর তৃণলতা ও বৃক্ষ তাঁকে সিজদা করে।
আয়াত ১৩ (পুনরাবৃত্ত আয়াত): ফাবিআইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান।
বিজ্ঞাপন
অর্থ: অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?
লক্ষ করুন, সৃষ্টির তালিকায় মানুষ সৃষ্টির কথা আসার আগেই এসেছে কোরআন শিক্ষার কথা। তাফসিরকারকেরা বলেন, মানুষের জন্য আল্লাহর সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ হলো হেদায়েত, তাই এটিকে আগে রাখা হয়েছে। আর "বায়ান", অর্থাৎ কথা বলা ও ভাব প্রকাশের ক্ষমতা মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করেছে।
এখানে "নাজম" শব্দের অর্থ নিয়ে দুই মত আছে, কেউ বলেছেন নক্ষত্র, কেউ বলেছেন কাণ্ডহীন লতাগুল্ম। পাশে গাছের কথা থাকায় অনেকে দ্বিতীয় অর্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। পুরো সূরা শুদ্ধভাবে পড়তে আরবি মুসহাফ দেখে কোনো শিক্ষকের সাহায্য নিন।
"আর রহমান" নামের অর্থ
বিজ্ঞাপন
রহমান ও রহিম দুটি শব্দই এসেছে "রহমত" বা দয়া থেকে। আলেমরা পার্থক্য করেছেন এভাবে: রহমান অর্থ যাঁর দয়া অসীম ও সর্বব্যাপী, দুনিয়ায় মুমিন-অমুমিন সবাই যে দয়া পায়। রহিম অর্থ যিনি বিশেষভাবে দয়া করেন, বিশেষ করে আখিরাতে মুমিনদের প্রতি। "রহিম" গুণে মানুষকেও বিশেষিত করা যায়, কিন্তু "আর রহমান" নামটি কেবল আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট।
সূরা ফুরকানের ৬০ নম্বর আয়াতে আছে, মক্কার মুশরিকদের যখন রহমানকে সিজদা করতে বলা হতো, তারা বলত, রহমান আবার কী? আর সূরা বনি ইসরাইলের ১১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, বলুন, তোমরা আল্লাহ নামে ডাকো বা রহমান নামে ডাকো, যে নামেই ডাকো, সব সুন্দর নাম তো তাঁরই। এই প্রেক্ষাপটে একটি পুরো সূরা "আর রহমান" নাম দিয়ে শুরু হওয়া এবং তাঁর দয়ার নিদর্শনে ভরা থাকা আলাদা তাৎপর্য বহন করে।
"তোমরা উভয়ে" কারা
পুনরাবৃত্ত আয়াতে দ্বিবচন ব্যবহার করা হয়েছে: "রাব্বিকুমা", তোমাদের দুজনের রব। এখানে দুই জাতি বলতে মানুষ ও জিন বোঝানো হয়েছে। সূরার ১৪ ও ১৫ নম্বর আয়াতেই দুই সৃষ্টির উল্লেখ আছে: মানুষকে পোড়ামাটির মতো শুকনো মাটি থেকে, আর জিনকে ধোঁয়াহীন আগুনের শিখা থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ৩৩ নম্বর আয়াতেও সরাসরি "হে জিন ও মানবজাতি" বলে সম্বোধন এসেছে।
বিজ্ঞাপন
তিরমিজির এক বর্ণনায় আছে, মহানবী (সা.) সাহাবিদের সামনে সূরা আর রহমান পড়লেন, তাঁরা চুপ করে শুনলেন। তিনি বললেন, জিনদের রাতে আমি তাদের কাছে এ সূরা পড়েছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে ভালো সাড়া দিয়েছিল। যখনই আমি "ফাবিআইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান" পর্যন্ত পৌঁছাতাম, তারা বলত, "লা বিশাইয়িম মিন নিআমিকা রাব্বানা নুকাজ্জিবু, ফালাকাল হামদ", অর্থাৎ হে আমাদের রব, তোমার কোনো অনুগ্রহই আমরা অস্বীকার করি না, সব প্রশংসা তোমারই। এ কারণে অনেকে তিলাওয়াত শুনে এ বাক্যটি বলেন। নামাজের বাইরে বা নফল নামাজে একা পড়লে এটি বলা যায়।
সূরা আর রহমানের বিষয়বস্তু
সৃষ্টির ভারসাম্য (আয়াত ১-১৩): আকাশকে উঁচু করা হয়েছে, স্থাপন করা হয়েছে মিজান বা ভারসাম্য। সঙ্গে নির্দেশ: ওজনে সীমালঙ্ঘন করো না, ন্যায্যভাবে ওজন করো, মাপে কম দিয়ো না। জমিনে ফল, খোসাযুক্ত শস্য আর সুগন্ধি উদ্ভিদ।
মানুষ, জিন ও দুই দিগন্ত (আয়াত ১৪-২৫): দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের রব। পাশাপাশি দুই সাগর, যাদের মাঝে এক অন্তরাল, তারা একে অপরকে অতিক্রম করে না। সেখান থেকে মুক্তা ও প্রবাল। পাহাড়ের মতো উঁচু পাল তোলা জাহাজ।
বিজ্ঞাপন
সবকিছু নশ্বর (আয়াত ২৬-৩০): পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই ধ্বংসশীল, স্থায়ী শুধু তোমার মহিমান্বিত ও মহানুভব রবের সত্তা। আসমান ও জমিনের সবাই তাঁর কাছে চায়, আর তিনি প্রতিদিন নতুন নতুন কাজে আছেন।
হিসাব ও শাস্তি (আয়াত ৩১-৪৫): আসমান-জমিনের সীমানা পেরিয়ে পালানোর চ্যালেঞ্জ, যা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সম্ভব নয়। কিয়ামতের দিন আকাশ লাল চামড়ার মতো বিদীর্ণ হবে। অপরাধীরা চেনা যাবে তাদের চেহারা দেখে।
দুই জান্নাত, তারপর আরও দুই (আয়াত ৪৬-৭৮): যে তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় রাখে, তার জন্য দুটি জান্নাত। সেখানে প্রবহমান ঝরনা, জোড়ায় জোড়ায় ফল, রেশমের আস্তরণ। এরপর আরও দুটি জান্নাতের বর্ণনা, ঘন সবুজ, খেজুর ও আনার। ৬০ নম্বর আয়াতে প্রশ্ন: উত্তম কাজের প্রতিদান উত্তম ছাড়া আর কী হতে পারে? শেষ আয়াত: বরকতময় তোমার রবের নাম, যিনি মহিমান্বিত ও মহানুভব।
সূরা আর রহমানের শিক্ষা
বিজ্ঞাপন
১. কৃতজ্ঞতার অভ্যাস: পুনরাবৃত্ত প্রশ্নটি আসলে একটি আয়না। প্রতিটি নেয়ামতের পর থেমে ভাবতে বলা হচ্ছে, আমি কি এর কৃতজ্ঞতা আদায় করছি?
২. ন্যায্য ওজন ও লেনদেন: মহাবিশ্বের ভারসাম্যের কথা বলার পরপরই বাজারের দাঁড়িপাল্লার কথা এসেছে। ব্যবসা, অফিস বা সংসারে ন্যায্যতা রক্ষা মহাজাগতিক নিয়মেরই অংশ।
৩. নশ্বরতার স্মরণ: পদ, সম্পদ, সৌন্দর্য সবই ফুরিয়ে যাবে, থাকবে শুধু আল্লাহ। এ উপলব্ধি অহংকার কমায়।
৪. আল্লাহর ভয় ও আশা: সতর্কবাণী ও জান্নাতের বর্ণনা পাশাপাশি এসেছে, ভয় ও আশার ভারসাম্য রাখতে।
বিজ্ঞাপন
সূরা আর রহমানের ফজিলত নিয়ে কিছু কথা
বায়হাকির একটি বর্ণনায় সূরা আর রহমানকে "কোরআনের সৌন্দর্য" বা "উরুসুল কোরআন" বলা হয়েছে। মুহাদ্দিসরা এ বর্ণনার সনদকে দুর্বল বলেছেন। সূরা আর রহমান শুনে রোগ সারার নির্দিষ্ট দাবিরও নির্ভরযোগ্য কোনো ভিত্তি নেই, যদিও কোরআন তিলাওয়াতের সাধারণ বরকত ও প্রশান্তির কথা স্বীকৃত।
নির্ভরযোগ্যভাবে যা বলা যায়, তা হলো সূরাটি তিলাওয়াতে প্রতি হরফে সওয়াব আছে, আর অর্থ বুঝে পড়লে এর ছন্দ ও বক্তব্য হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা জাগায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
সূরা আর রহমানে "ফাবিআইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান" কতবার এসেছে?
মোট ৩১ বার। প্রথমবার এসেছে ১৩ নম্বর আয়াতে।
তিলাওয়াত শুনে কি জবাব দিতে হয়?
বাধ্যতামূলক নয়। তিরমিজির বর্ণনার আলোকে কেউ নামাজের বাইরে শুনে "লা বিশাইয়িম মিন নিআমিকা রাব্বানা নুকাজ্জিবু, ফালাকাল হামদ" বললে তা ভালো। ফরজ নামাজে মুক্তাদি চুপ থাকবেন।
বিজ্ঞাপন
সূরা আর রহমান কোন পারায়?
২৭তম পারায়, সূরা কামারের পরে এবং সূরা ওয়াকিয়ার আগে।
শিশুদের কি এ সূরা শেখানো সহজ?
হ্যাঁ, আয়াতগুলো ছোট এবং একটি আয়াত বারবার ফিরে আসায় শিশুরা শুনে শুনেই দ্রুত শিখে ফেলে।