ইমেইল লেখার নিয়ম: অফিস ও চাকরির জন্য আনুষ্ঠানিক মেইল লিখুন
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
চাকরির বিজ্ঞাপনে লেখা থাকে, "সিভি পাঠান এই ঠিকানায়।" অনেকে শুধু সিভি সংযুক্ত করে বিষয় আর মূল অংশ ফাঁকা রেখেই পাঠিয়ে দেন। নিয়োগকর্তার কাছে সেই মেইল প্রায়ই অন্য শত মেইলের ভিড়ে হারিয়ে যায়। অথচ দুই মিনিট বাড়তি খরচ করে গুছিয়ে লেখা একটি ইমেইল প্রথম পরিচয়েই পেশাদার ভাবমূর্তি তৈরি করে।
বিজ্ঞাপন
আনুষ্ঠানিক ইমেইলের কাঠামো আসলে খুব সাধারণ। একটি স্পষ্ট বিষয় বা সাবজেক্ট, প্রাপকের প্রতি যথাযথ সম্বোধন, কেন লিখছেন তা প্রথম বাক্যেই জানানো, সংক্ষিপ্ত মূল বক্তব্য, পরবর্তী করণীয় বা অনুরোধ, ভদ্র সমাপ্তি এবং আপনার নাম, পদবি ও যোগাযোগের তথ্যসহ স্বাক্ষর। এই সাতটি অংশ ঠিক থাকলে অফিসের দৈনন্দিন মেইল থেকে চাকরির আবেদন, সবই মানানসই হয়।
বাংলাদেশে বেশির ভাগ অফিসিয়াল মেইল ইংরেজিতে লেখা হয়, তবে সরকারি দপ্তর বা দেশীয় প্রতিষ্ঠানে বাংলাতেও লেখা চলে। ভাষা যা-ই হোক, নিয়মগুলো একই।
ইমেইলের বিষয় লেখার নিয়ম
বিষয় হলো ইমেইলের শিরোনাম। প্রাপক প্রথমে এটাই দেখে ঠিক করেন মেইলটি এখন খুলবেন নাকি পরে। ভালো বিষয় লেখার কয়েকটি সূত্র:
বিজ্ঞাপন
১. নির্দিষ্ট হোন: "আবেদন" নয়, বরং "সহকারী হিসাবরক্ষক পদে আবেদন, বিজ্ঞাপন নম্বর অমুক"। পড়েই যেন বোঝা যায় মেইলটি কী নিয়ে।
২. সংক্ষিপ্ত রাখুন: মোবাইলের পর্দায় যেন পুরোটা দেখা যায়। মোটামুটি ছয় থেকে দশ শব্দ যথেষ্ট।
৩. বিজ্ঞাপনের নির্দেশনা মানুন: চাকরির বিজ্ঞাপনে যদি বলা থাকে বিষয়ে পদের নাম ও কোড লিখতে, হুবহু সেভাবে লিখুন। অনেক প্রতিষ্ঠান বিষয় দেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেইল বাছাই করে।
৪. বিষয় ফাঁকা নয়: বিষয়হীন মেইল অনেক সময় স্প্যাম ফোল্ডারে চলে যায়।
বিজ্ঞাপন
৫. সব বড় হাতের অক্ষর বা "জরুরি!!!" নয়: এতে চিৎকারের মতো শোনায় এবং অপেশাদার দেখায়।
মূল অংশ সাজানোর নিয়ম
সম্বোধন: নাম জানা থাকলে "প্রিয় জনাব রহমান" বা ইংরেজিতে "Dear Mr. Rahman"। নাম না জানলে "Dear Hiring Manager" বা "মাননীয় মহোদয়"। পরিচিত সহকর্মীকে লিখলে একটু কম আনুষ্ঠানিক হলেও চলে, তবে শুরুতে সম্বোধন বাদ দেবেন না।
প্রথম অনুচ্ছেদ: এক-দুই বাক্যে জানান আপনি কে এবং কেন লিখছেন। যেমন, "আমি অমুক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছি এবং আপনাদের প্রতিষ্ঠানের সহকারী হিসাবরক্ষক পদে আবেদন করছি।"
বিজ্ঞাপন
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ: প্রয়োজনীয় বিস্তারিত। চাকরির ক্ষেত্রে আপনার মূল যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা দুই-তিন বাক্যে। অফিসের মেইলে সমস্যার বিবরণ বা প্রস্তাব। লম্বা অনুচ্ছেদ না লিখে ছোট ছোট অনুচ্ছেদে ভাগ করুন।
অনুরোধ বা পরবর্তী ধাপ: আপনি প্রাপকের কাছে কী চান, তা স্পষ্ট বলুন। "সংযুক্ত প্রতিবেদনটি বৃহস্পতিবারের মধ্যে অনুমোদন দিলে কৃতজ্ঞ থাকব" বা "সাক্ষাৎকারের সুযোগ পেলে বিস্তারিত জানাতে পারব।"
সমাপ্তি: "ধন্যবাদান্তে", "শুভেচ্ছান্তে", ইংরেজিতে "Best regards", "Sincerely" বা "Thank you"।
স্বাক্ষর: পুরো নাম, পদবি (চাকরিপ্রার্থী হলে দরকার নেই), মোবাইল নম্বর। প্রতিষ্ঠানের মেইলে প্রতিষ্ঠানের নামও দিন।
বিজ্ঞাপন
চাকরির আবেদনের ইমেইল কেমন হবে
চাকরির আবেদনের ইমেইল আসলে একটি সংক্ষিপ্ত কভার লেটার। এর একটি নমুনা কাঠামো:
১. বিষয়: পদের নাম, প্রয়োজনে বিজ্ঞাপনের কোড ও আপনার নাম।
২. সম্বোধন: নিয়োগকর্তা বা মানবসম্পদ বিভাগের প্রতি।
বিজ্ঞাপন
৩. পরিচয় ও উদ্দেশ্য: কোন পদে আবেদন এবং বিজ্ঞাপনটি কোথায় দেখেছেন।
৪. যোগ্যতার সারকথা: পদের চাহিদার সঙ্গে মেলে এমন দুই-তিনটি যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা।
৫. সংযুক্তির উল্লেখ: "আমার জীবনবৃত্তান্ত ও সনদের কপি সংযুক্ত করলাম।"
৬. সমাপ্তি ও স্বাক্ষর: ধন্যবাদ, নাম, মোবাইল নম্বর।
বিজ্ঞাপন
পুরো মেইল যেন এক পর্দার বেশি না হয়। বিস্তারিত তথ্য সিভিতে থাকবে, মেইলে শুধু আগ্রহ জাগানো সারকথা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য মেইলটি একটু বদলে নিন, একই মেইল সবাইকে কপি করে পাঠালে তা ধরা পড়ে।
সংযুক্তি, সিসি ও বিসিসির নিয়ম
সংযুক্তির নাম: "scan001.pdf" বা "new doc final final.docx" নয়। ফাইলের নাম দিন "Rahim_Uddin_CV.pdf" ধরনের, যাতে প্রাপক নাম দেখেই বোঝেন।
ফাইলের ধরন: সিভি ও সনদ সাধারণত পিডিএফে পাঠানো নিরাপদ, কারণ যেকোনো যন্ত্রে একই রকম দেখায়। বিজ্ঞাপনে অন্য ধরন চাইলে সেটিই দিন।
বিজ্ঞাপন
আকার: অনেকগুলো বড় ছবি না পাঠিয়ে একটি পিডিএফে একত্র করুন। খুব বড় ফাইল অনেক সময় পৌঁছায় না।
সংযুক্তি ভুলবেন না: "সংযুক্ত করলাম" লিখে ফাইল দিতে ভুলে যাওয়া খুব সাধারণ ভুল। পাঠানোর আগে দেখে নিন।
সিসি: যাঁদের বিষয়টি জানা দরকার, কিন্তু সরাসরি কাজ তাঁদের নয়, তাঁদের সিসিতে রাখুন, যেমন আপনার বিভাগীয় প্রধান।
বিসিসি: অনেককে একসঙ্গে পাঠাতে হলে এবং প্রাপকেরা একে অপরের ঠিকানা না দেখুক চাইলে বিসিসি ব্যবহার করুন।
বিজ্ঞাপন
অফিসের দৈনন্দিন মেইলের কিছু ধরন
সব অফিসিয়াল ইমেইল এক রকম নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী সুর ও দৈর্ঘ্য বদলাতে হয়।
ছুটির আবেদন: বিষয়ে তারিখসহ ছুটির ধরন লিখুন। মূল অংশে কত দিন, কোন তারিখ থেকে কোন তারিখ, কারণ সংক্ষেপে, আর আপনার অনুপস্থিতিতে কাজ কে দেখবেন তা জানান।
কাজের অগ্রগতি জানানো: শুরুতেই মূল খবর দিন, যেমন কাজ শেষ হয়েছে নাকি দেরি হবে। তারপর কারণ ও পরবর্তী সময়সীমা।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ বা সমস্যা জানানো: আবেগ নয়, তথ্য দিন। কী ঘটেছে, কবে, কী প্রভাব পড়ছে এবং আপনি কী সমাধান চান, এই চারটি বিষয় স্পষ্ট রাখুন।
ধন্যবাদ জানানো: সাক্ষাৎকার বা মিটিংয়ের পর ছোট একটি ধন্যবাদ মেইল পেশাদারিত্বের পরিচয় দেয়। দুই-তিন বাক্যই যথেষ্ট।
যে ভুলগুলো ভাবমূর্তি নষ্ট করে
অপেশাদার ইমেইল ঠিকানা, যেমন ডাকনাম বা মজার শব্দ দিয়ে বানানো ঠিকানা থেকে চাকরির আবেদন না করে নিজের নামে একটি ঠিকানা খুলুন। মেসেঞ্জারের মতো সংক্ষিপ্ত রূপ, যেমন "plz", "u", "thnx", আনুষ্ঠানিক মেইলে চলে না। ইমোজি এড়িয়ে চলুন। রাগ বা বিরক্তি নিয়ে মেইল লিখলে সঙ্গে সঙ্গে না পাঠিয়ে কিছুক্ষণ পর আবার পড়ুন। আর "রিপ্লাই অল" চাপার আগে ভাবুন, সবার কি সত্যিই এই উত্তর জানা দরকার।
বিজ্ঞাপন
পাঠানোর আগে শেষবার তিনটি জিনিস মিলিয়ে নিন: প্রাপকের ঠিকানা সঠিক কি না, সংযুক্তি আছে কি না, আর বানান ও নামের বানান ঠিক আছে কি না। বিশেষ করে প্রাপকের নামের বানান ভুল হলে খারাপ ধারণা তৈরি হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ইমেইলের উত্তর কত সময়ের মধ্যে দেওয়া উচিত?
অফিসের কাজের মেইলে সাধারণত এক কার্যদিবসের মধ্যে উত্তর দেওয়া ভালো চর্চা। পুরো উত্তর দিতে সময় লাগলে অন্তত জানিয়ে দিন যে মেইলটি পেয়েছেন এবং কবে বিস্তারিত জানাবেন।
বিজ্ঞাপন
চাকরির আবেদনে মূল অংশ ফাঁকা রেখে শুধু সিভি পাঠালে কি চলে?
না চলারই সম্ভাবনা বেশি। অন্তত তিন-চার বাক্যের পরিচয় ও আবেদনের উদ্দেশ্য লিখুন। বিজ্ঞাপনে বিশেষ নির্দেশনা থাকলে সেটিই মানুন।
বাংলায় অফিসিয়াল মেইল লেখা যায় কি?
যায়, বিশেষ করে সরকারি দপ্তর ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানে। প্রতিষ্ঠান সাধারণত কোন ভাষায় যোগাযোগ করে, তা দেখে সেই ভাষায় লেখাই ভালো। এক মেইলে দুই ভাষা মিশিয়ে লিখবেন না।
বিজ্ঞাপন
আবেদনের পর ফলো-আপ মেইল কখন পাঠাব?
আবেদনের শেষ তারিখের পর এক-দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করে একটি ভদ্র, সংক্ষিপ্ত ফলো-আপ মেইল পাঠানো যায়। বারবার পাঠানো এড়িয়ে চলুন।
মোবাইল থেকে আনুষ্ঠানিক মেইল পাঠালে কী খেয়াল রাখব?
মোবাইলের মেইল অ্যাপে অনেক সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে "সেন্ট ফ্রম মাই ফোন" ধরনের লেখা যুক্ত হয়, আনুষ্ঠানিক মেইলে তা মুছে নিজের স্বাক্ষর বসান। সংযুক্তি ঠিক ফাইল কি না খুলে দেখে নিন, আর ছোট পর্দায় লেখার কারণে বানান ভুল বেশি হয় বলে পাঠানোর আগে একবার পুরোটা পড়ুন।