তেলাপোকা তাড়ানোর উপায়: রান্নাঘর তেলাপোকামুক্ত রাখার ঘরোয়া কৌশল
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
রাতে রান্নাঘরের বাতি জ্বালালেই সিংকের কোণ থেকে কয়েকটা তেলাপোকা ছুটে পালায়, এই দৃশ্য অনেক বাসার চেনা। তেলাপোকা শুধু বিরক্তিকর নয়, এরা নোংরা জায়গা থেকে খাবারে জীবাণু বয়ে আনতে পারে। এদের মল ও খোলস থেকে অনেকের অ্যালার্জি আর হাঁপানির সমস্যা বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
তেলাপোকা তাড়ানোর উপায় খুঁজতে গিয়ে বেশির ভাগ মানুষ সরাসরি স্প্রে কেনেন। কিন্তু স্প্রেতে চোখের সামনের কয়েকটি মরে, দেয়ালের ফাঁকে লুকানো বাকিগুলো থেকে যায়। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান তিন ধাপে: প্রথমে খাবার, পানি আর লুকানোর জায়গা বন্ধ করা; তারপর টোপ দিয়ে লুকিয়ে থাকা তেলাপোকা মারা; আর শেষে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ধরে রাখা।
ঘরোয়া উপায়ের মধ্যে বোরিক পাউডারের টোপ সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে পরিচিত। তবে এটি বিষ, তাই নিরাপদে ব্যবহার করার নিয়মও জানা দরকার।
তেলাপোকা কেন আসে
তেলাপোকার টিকে থাকতে দরকার তিনটি জিনিস: খাবার, পানি আর অন্ধকার উষ্ণ লুকানোর জায়গা। রান্নাঘরে এই তিনটিই সহজে মেলে। রাতে সিংকে পড়ে থাকা এঁটো বাসন, চুলার পাশে তেল-মসলার দাগ, খোলা ডাস্টবিন, ফ্রিজের নিচের পানি, সিংকের নিচে চুইয়ে পড়া পাইপ আর ক্যাবিনেটের ফাটল তাদের জন্য আদর্শ।
বিজ্ঞাপন
এরা মূলত নিশাচর। দিনের বেলা একটি-দুটি দেখা গেলে বুঝতে হবে ভেতরে সংখ্যা অনেক বেশি। বাজারের ব্যাগ, কার্টন বা পুরোনো খবরের কাগজের সঙ্গেও তেলাপোকা আর তার ডিমের খোল ঘরে ঢোকে। বহুতল ভবনে পাইপ আর নালা দিয়ে এক ফ্ল্যাট থেকে আরেক ফ্ল্যাটে চলে আসে।
প্রথম কাজ: খাবার, পানি আর আশ্রয় বন্ধ করুন
১. রাতে রান্নাঘর পরিষ্কার: ঘুমানোর আগে এঁটো বাসন ধুয়ে ফেলুন, চুলা ও তাক মুছে দিন, মেঝেতে পড়ে থাকা ভাত-রুটির টুকরা ঝাড়ু দিন।
২. খাবার ঢেকে রাখা: চাল, ডাল, চিনি, বিস্কুট মুখবন্ধ কৌটায় রাখুন। খোলা প্যাকেট ক্লিপ দিয়ে আটকে দিন। পোষা প্রাণীর খাবারও রাতে বাইরে ফেলে রাখবেন না।
বিজ্ঞাপন
৩. ডাস্টবিন: ঢাকনাওয়ালা ডাস্টবিন ব্যবহার করুন এবং প্রতিদিন ময়লা ফেলুন।
৪. পানির উৎস বন্ধ: সিংক ও বাথরুমের পাইপের লিকেজ সারান। রাতে সিংক শুকনো করে মুছে রাখুন। ফ্রিজের নিচের পানির ট্রে মাঝে মাঝে পরিষ্কার করুন।
৫. ফাটল সিল করা: ক্যাবিনেটের ফাঁক, দেয়াল আর টাইলসের ফাটল, পাইপ যেখানে দেয়াল দিয়ে ঢুকেছে সেই জায়গা পুটি বা সিলিকন দিয়ে বন্ধ করুন। নালার মুখে জালি লাগান।
৬. জঞ্জাল কমানো: পুরোনো কার্টন, কাগজের স্তূপ আর অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে ফেলুন। এগুলো তেলাপোকার প্রিয় আস্তানা।
বিজ্ঞাপন
এই কাজগুলো ছাড়া কোনো ওষুধই দীর্ঘমেয়াদে কাজ করে না, কারণ খাবার-পানি পেলে নতুন তেলাপোকা আসতেই থাকবে।
বোরিক পাউডার দিয়ে তেলাপোকা মারার ঘরোয়া উপায়
বোরিক পাউডার বা বোরিক অ্যাসিড ফার্মেসি বা হার্ডওয়্যারের দোকানে পাওয়া যায়। তেলাপোকা এটি খেলে বা এর গুঁড়া গায়ে লাগিয়ে পরিষ্কার করার সময় পেটে গেলে ধীরে ধীরে মারা যায়। ধীরে কাজ করে বলে আক্রান্ত তেলাপোকা বাসায় ফিরে যায়, এতে অন্যরাও প্রভাবিত হতে পারে।
টোপ বানানোর পদ্ধতি: দুই টেবিল-চামচ বোরিক পাউডার, দুই টেবিল-চামচ ময়দা বা আটা আর এক টেবিল-চামচ চিনি একসঙ্গে মেশান। অল্প পানি বা দুধ দিয়ে মেখে মার্বেলের মতো ছোট ছোট বড়ি বানান। চিনি তেলাপোকাকে টানে, ময়দা বড়িকে আটকে রাখে।
বিজ্ঞাপন
কোথায় রাখবেন: সিংকের নিচে, ফ্রিজ ও চুলার পেছনে, ক্যাবিনেটের কোণে, ডাস্টবিনের আশপাশে, যেখানে তেলাপোকার মল বা চলাচল চোখে পড়ে। বড়িগুলো ছোট ঢাকনা বা কাগজের টুকরার ওপর রাখুন।
কতদিন পরপর: বড়ি শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেলে বা ছত্রাক ধরলে এক-দুই সপ্তাহ পর নতুন বড়ি দিন। ফল পেতে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ লাগে।
শুকনো বোরিক পাউডার পাতলা করে ক্যাবিনেটের ফাঁক বা ফ্রিজের নিচে ছিটিয়েও দেওয়া যায়। মোটা স্তূপ করলে তেলাপোকা তা এড়িয়ে যায়, তাই খুব পাতলা ধুলার মতো স্তর রাখুন।
অন্যান্য ঘরোয়া কৌশল: কোনটা কতটা কাজের
বিজ্ঞাপন
বেকিং সোডা ও চিনি: সমান পরিমাণে মিশিয়ে রাখার কথা প্রচলিত। এর কার্যকারিতা নিয়ে শক্ত প্রমাণ কম, বোরিক পাউডারের তুলনায় দুর্বল।
তেজপাতা, নিমপাতা, লবঙ্গ বা পুদিনা: এগুলোর গন্ধে তেলাপোকা কিছুটা দূরে থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। তবে এগুলো তেলাপোকা মারে না এবং বড় উপদ্রবে কাজ করে না। পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
সাবান-পানি: চোখের সামনে থাকা তেলাপোকায় ঘন সাবান-পানি স্প্রে করলে তা মারা যায়। এটি তাৎক্ষণিক সমাধান, লুকানো তেলাপোকার জন্য নয়।
আঠালো ফাঁদ: বাজারে আঠালো কার্ডবোর্ড ফাঁদ পাওয়া যায়। এগুলো দিয়ে কোথায় তেলাপোকা বেশি, তা বোঝা যায়, ফলে টোপ কোথায় রাখবেন সেটিও ঠিক করা সহজ হয়।
বিজ্ঞাপন
বাজারের জেল টোপ, স্প্রে আর পেস্ট কন্ট্রোল
বাজারে সিরিঞ্জের মতো টিউবে তেলাপোকা মারার জেল টোপ পাওয়া যায়। ক্যাবিনেটের কোণে, কবজার পাশে আর ফাটলের মুখে ছোট ছোট ফোঁটা দিলে তেলাপোকা খেয়ে মারা যায়। রান্নাঘরে স্প্রের চেয়ে জেল টোপ বেশি নিরাপদ ও কার্যকর বলে ধরা হয়, কারণ বাতাসে ছড়ায় না। প্যাকেটের নির্দেশনা মেনে ব্যবহার করুন।
স্প্রে ব্যবহার করলে খাবার, বাসন আর পানির পাত্র সরিয়ে বা ঢেকে নিন, স্প্রের পর ঘর কিছুক্ষণ বন্ধ রেখে পরে জানালা খুলে বাতাস চলাচল করান। একই জায়গায় টোপ আর স্প্রে একসঙ্গে দেবেন না; স্প্রের গন্ধে তেলাপোকা টোপ এড়িয়ে যেতে পারে।
কয়েক সপ্তাহ চেষ্টার পরও যদি দিনের বেলা তেলাপোকা দেখা যায়, বা পুরো ভবনে উপদ্রব থাকে, তাহলে পেশাদার পেস্ট কন্ট্রোল সেবা নেওয়া ভালো। ফ্ল্যাট বাড়িতে একসঙ্গে সব ফ্ল্যাটে চিকিৎসা করালে ফল বেশি টেকসই হয়।
বিজ্ঞাপন
নিরাপত্তা সতর্কতা
বোরিক পাউডার আর তেলাপোকার টোপ বিষাক্ত। শিশু বা পোষা প্রাণী যেন কোনোভাবে মুখে দিতে না পারে, এমন জায়গায় রাখুন। আসবাবের পেছনে বা উঁচু তাকের কোণে রাখা নিরাপদ। টোপ বানানোর পর হাত ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন এবং টোপ বানানোর বাটি-চামচ রান্নার কাজে ব্যবহার করবেন না। খাবারের পাত্র বা খাবার রাখার তাকে বোরিক পাউডার ছিটাবেন না।
কোনো শিশু ভুলে টোপ বা বোরিক পাউডার খেয়ে ফেললে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যান এবং প্যাকেটটি সঙ্গে নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
তেলাপোকা একেবারে চলে যেতে কত দিন লাগে?
পরিচ্ছন্নতা আর টোপ একসঙ্গে চালালে সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংখ্যা চোখে পড়ার মতো কমে। ডিমের খোল থেকে নতুন বাচ্চা বের হয়, তাই অন্তত এক-দুই মাস নিয়মিত চালিয়ে যান।
তেলাপোকা কি রোগ ছড়ায়?
তেলাপোকা নোংরা জায়গা থেকে খাবারে জীবাণু বয়ে আনতে পারে এবং অনেকের অ্যালার্জি ও হাঁপানির সমস্যা বাড়ায়। তাই খোলা খাবারে তেলাপোকা বসলে তা না খাওয়াই ভালো।
বিজ্ঞাপন
ন্যাপথলিন দিয়ে কি তেলাপোকা তাড়ানো যায়?
ন্যাপথলিন মূলত কাপড়ের পোকার জন্য, এর গ্যাস মানুষের জন্যও ক্ষতিকর। রান্নাঘরে বা খাবারের কাছে ন্যাপথলিন ব্যবহার করবেন না।
টোপ দেওয়ার পর তেলাপোকা বেশি দেখা যাচ্ছে কেন?
টোপের প্রভাবে অসুস্থ তেলাপোকা লুকানোর জায়গা থেকে বেরিয়ে আসে, তাই প্রথম কয়েক দিন বেশি চোখে পড়তে পারে। এটি সাধারণত টোপ কাজ করার লক্ষণ।