শক্তিশালী পাসওয়ার্ড তৈরির নিয়ম ও তা সুরক্ষিত রাখার উপায়
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
"১২৩৪৫৬", "password", নিজের নাম আর জন্মসাল, কিংবা মোবাইল নম্বর। এগুলো এখনো অসংখ্য মানুষের পাসওয়ার্ড। আর ঠিক এ কারণেই প্রতিদিন অসংখ্য ফেসবুক আইডি, ইমেইল আর অনলাইন একাউন্ট অন্যের হাতে চলে যায়। দুর্বল পাসওয়ার্ড আসলে দরজা খোলা রেখে তালা ঝুলিয়ে রাখার মতো।
বিজ্ঞাপন
শক্তিশালী পাসওয়ার্ড হলো এমন পাসওয়ার্ড, যা অনুমান করা কঠিন এবং কম্পিউটার দিয়ে বারবার চেষ্টা করেও সহজে ভাঙা যায় না। এর তিনটি মূল বৈশিষ্ট্য: লম্বা, অনুমানের অযোগ্য এবং প্রতিটি একাউন্টের জন্য আলাদা। সাধারণভাবে অন্তত বারো অক্ষর, ভালো হয় ষোলো বা তার বেশি, আর তাতে বড় হাতের ও ছোট হাতের ইংরেজি অক্ষর, সংখ্যা এবং চিহ্ন মেশানো থাকলে সেটি শক্তিশালী ধরা হয়।
কিন্তু এত জটিল পাসওয়ার্ড মনে রাখব কীভাবে? এখানেই আসে কয়েকটি সহজ কৌশল, যা জটিলতা না বাড়িয়েও পাসওয়ার্ডকে শক্ত করে। নিচে সেগুলোই ধাপে ধাপে দেখানো হলো।
পাসওয়ার্ড কেন গুরুত্বপূর্ণ
আপনার ইমেইল একাউন্ট হলো অন্য সব একাউন্টের চাবি। ফেসবুক, মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ, অনলাইন শপিং, অফিসের পোর্টাল, প্রায় সবখানে পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে রিসেট লিংক যায় ইমেইলে। তাই কেউ ইমেইলের পাসওয়ার্ড পেয়ে গেলে একে একে বাকি সব দখল করতে পারে।
বিজ্ঞাপন
পাসওয়ার্ড ভাঙার জন্য হ্যাকাররা সাধারণত তিনটি পথ নেয়। এক, অনুমান: নাম, জন্মতারিখ, প্রিয় দলের নাম। দুই, স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম দিয়ে প্রচলিত লাখো পাসওয়ার্ডের তালিকা একের পর এক চেষ্টা। তিন, কোনো ওয়েবসাইট থেকে ফাঁস হওয়া পাসওয়ার্ড অন্য সাইটে চেষ্টা করা। শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড এই তিনটি পথই বন্ধ করে দেয়।
শক্তিশালী পাসওয়ার্ড তৈরির নিয়ম
১. দৈর্ঘ্যই সবচেয়ে বড় শক্তি: প্রতিটি বাড়তি অক্ষর পাসওয়ার্ড ভাঙার সময় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আট অক্ষরের জটিল পাসওয়ার্ডের চেয়ে ষোলো অক্ষরের সাধারণ শব্দের মিশ্রণও অনেক বেশি নিরাপদ।
২. চার ধরনের অক্ষর মেশান: বড় হাতের অক্ষর, ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা ও চিহ্ন, যেমন @, #, !, %। তবে শুধু শেষে একটা ! যোগ করে দিলেই পাসওয়ার্ড শক্ত হয় না।
বিজ্ঞাপন
৩. ব্যক্তিগত তথ্য বাদ দিন: নিজের বা পরিবারের নাম, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর, এলাকার নাম, প্রিয় খেলোয়াড়। এসব তথ্য আপনার ফেসবুক প্রোফাইল ঘাঁটলেই পাওয়া যায়।
৪. প্রচলিত ধরন এড়িয়ে চলুন: ১২৩৪৫৬, qwerty, abc123, password123 অথবা কি-বোর্ডের পাশাপাশি অক্ষর। এগুলো ভাঙার তালিকার একেবারে শুরুতে থাকে।
৫. অক্ষর বদলের পুরোনো কৌশলে ভরসা নয়: password-কে p@ssw0rd লিখলে মানুষের চোখে জটিল দেখায়, কিন্তু ভাঙার প্রোগ্রাম এমন বদল আগে থেকেই চেনে।
৬. প্রতিটি একাউন্টে আলাদা পাসওয়ার্ড: এটিই সবচেয়ে উপেক্ষিত নিয়ম। একটি সাইট থেকে পাসওয়ার্ড ফাঁস হলে, একই পাসওয়ার্ড থাকা সব একাউন্ট একসঙ্গে বিপদে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
মনে রাখার মতো শক্ত পাসওয়ার্ড বানানোর কৌশল
পাসফ্রেজ পদ্ধতি: একটি শব্দের বদলে কয়েকটি এলোমেলো শব্দ জুড়ে দিন। যেমন চারটি সম্পর্কহীন শব্দ বেছে নিন, যেগুলো একসঙ্গে একটি মজার ছবি তৈরি করে মাথায়, যেমন একটি বেগুনি সাইকেলে চড়ে চাঁদে যাওয়া ইলিশ। শব্দগুলোকে ইংরেজি হরফে লিখে মাঝে সংখ্যা বা চিহ্ন বসান। এমন পাসফ্রেজ লম্বা হয়, তাই শক্ত, আবার ছবির মতো মনে থাকে।
বাক্যের প্রথম অক্ষর পদ্ধতি: একটি ব্যক্তিগত বাক্য ভাবুন, যা শুধু আপনিই জানেন। যেমন "আমি ক্লাস সেভেনে প্রথম সাইকেল চালিয়ে দুবার পড়ে গিয়েছিলাম"। প্রতিটি শব্দের প্রথম অক্ষর ইংরেজি হরফে নিয়ে মাঝে সংখ্যা ও চিহ্ন যোগ করুন। বাক্য মনে থাকলেই পাসওয়ার্ড মনে থাকবে। তবে এখানে দেওয়া উদাহরণ হুবহু ব্যবহার করবেন না, নিজের বাক্য বানান।
গানের লাইন বা প্রবাদ নয়, নিজের গল্প: জনপ্রিয় গানের লাইন, কবিতা বা প্রবাদ দিয়ে পাসওয়ার্ড বানালে তা প্রচলিত শব্দতালিকায় থাকার ঝুঁকি থাকে। এমন কিছু বেছে নিন যা কোথাও ছাপা হয়নি, শুধু আপনার জীবনের কোনো ছোট ঘটনা।
বিজ্ঞাপন
একাউন্টভেদে আলাদা অংশ: কেউ কেউ একটি শক্ত মূল অংশের সঙ্গে প্রতিটি সাইটের জন্য আলাদা কিছু যোগ করেন। এটি পুরোপুরি এক পাসওয়ার্ডের চেয়ে ভালো, কিন্তু ধরন বুঝে গেলে অন্যরা অনুমান করতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ একাউন্টের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা পাসওয়ার্ডই নিরাপদ।
পাসওয়ার্ড সুরক্ষিত রাখার উপায়
শক্ত পাসওয়ার্ড বানানো অর্ধেক কাজ। বাকি অর্ধেক হলো সেটিকে সুরক্ষিত রাখা।
১. পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করুন: ফোন বা ব্রাউজারের নিজস্ব পাসওয়ার্ড ম্যানেজার, কিংবা নির্ভরযোগ্য পাসওয়ার্ড ম্যানেজার অ্যাপ প্রতিটি সাইটের জন্য আলাদা জটিল পাসওয়ার্ড তৈরি ও সংরক্ষণ করতে পারে। আপনাকে শুধু একটি মূল পাসওয়ার্ড মনে রাখতে হয়।
বিজ্ঞাপন
২. টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন চালু রাখুন: পাসওয়ার্ডের পাশাপাশি ফোনে আসা কোড বা অথেনটিকেটর অ্যাপের কোড লাগলে পাসওয়ার্ড ফাঁস হলেও একাউন্ট নিরাপদ থাকে। ইমেইল, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে এটি এখনই চালু করুন।
৩. কাউকে বলবেন না: বন্ধু, সহকর্মী, এমনকি "কাস্টমার কেয়ার" পরিচয় দেওয়া কাউকেও নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান ফোনে পাসওয়ার্ড চায় না।
৪. লিংকে সাবধান: ইমেইল বা মেসেজের লিংকে ক্লিক করে খোলা পাতায় পাসওয়ার্ড দেবেন না। সরাসরি অফিশিয়াল অ্যাপ বা ঠিকানায় গিয়ে লগইন করুন।
৫. অন্যের যন্ত্রে সাবধানে: সাইবার ক্যাফে বা অন্যের কম্পিউটারে লগইন করলে পাসওয়ার্ড সেভ করবেন না, কাজ শেষে লগআউট করুন।
বিজ্ঞাপন
৬. কাগজে লিখলে নিরাপদ জায়গায়: বয়স্কদের জন্য কাগজে লিখে রাখা দোষের নয়, যদি তা ঘরের নিরাপদ জায়গায় থাকে। ফোনের কভার বা মানিব্যাগে নয়।
৭. সন্দেহ হলেই বদলান: কোনো সেবা থেকে তথ্য ফাঁসের খবর পেলে বা একাউন্টে অচেনা লগইনের সতর্কবার্তা এলে সঙ্গে সঙ্গে পাসওয়ার্ড বদলান। তবে কোনো কারণ ছাড়া ঘন ঘন বদলানোর চেয়ে একবার শক্ত ও আলাদা পাসওয়ার্ড রাখা বেশি কার্যকর।
পরিবারের সবাইকে শেখান
পরিবারের একজনের দুর্বল পাসওয়ার্ড অনেক সময় পুরো পরিবারকে বিপদে ফেলে। বাবা-মায়ের ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়ে আত্মীয়দের কাছে টাকা চাওয়া হয়, কিশোর সন্তানের গেমিং একাউন্ট দিয়ে প্রতারণা হয়। তাই বাড়ির বয়স্ক ও ছোট সদস্যদের ফোনে বসে একসঙ্গে পাসওয়ার্ড বদলে দিন এবং টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন চালু করে দিন। কাজটি আধা ঘণ্টার, কিন্তু সুরক্ষা দীর্ঘদিনের।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাংলায় পাসওয়ার্ড দেওয়া যায় কি?
কিছু সেবায় যায়, কিন্তু অনেক যন্ত্রে বা সাইটে বাংলা অক্ষর ঠিকমতো কাজ না-ও করতে পারে, আর অন্য কি-বোর্ড থেকে লগইনে ঝামেলা হয়। তাই ইংরেজি অক্ষর, সংখ্যা ও চিহ্নই নিরাপদ পছন্দ।
পাসওয়ার্ড কত দিন পরপর বদলানো উচিত?
বিজ্ঞাপন
নিয়মিত সময় ধরে বদলানোর চেয়ে শক্ত ও আলাদা পাসওয়ার্ড রাখা বেশি জরুরি। তবে ফাঁস বা অচেনা লগইনের সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে বদলান।
পাসওয়ার্ড শক্ত কি না কীভাবে বুঝব?
অনেক সাইট পাসওয়ার্ড লেখার সময় দুর্বল, মাঝারি বা শক্তিশালী দেখায়। এ ছাড়া ব্রাউজারের পাসওয়ার্ড ম্যানেজারের চেকআপ সুবিধায় দুর্বল ও একাধিক জায়গায় ব্যবহৃত পাসওয়ার্ড চিহ্নিত হয়।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পিনেও কি একই নিয়ম?
বিজ্ঞাপন
পিন সংখ্যায় সীমিত, তাই সেখানে মূল নিয়ম হলো জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বরের অংশ বা ১২৩৪৫ ধরনের সহজ সংখ্যা এড়ানো এবং কাউকে না বলা।
পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে কী হবে, এই ভয়ে সহজ পাসওয়ার্ড রাখা কি ঠিক?
না। ভুলে যাওয়ার সমাধান হলো একাউন্টে সচল রিকভারি ফোন নম্বর ও ইমেইল যুক্ত রাখা, পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করা অথবা মনে রাখার মতো পাসফ্রেজ বানানো। সহজ পাসওয়ার্ড রাখলে ভুলে যাওয়ার ঝুঁকি কমে ঠিকই, কিন্তু একাউন্ট হারানোর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।