কম্পিউটার কাকে বলে এবং কিভাবে কাজ করে: প্রাথমিক ধারণা
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
"কম্পিউটার" শব্দটি এসেছে ইংরেজি "কম্পিউট" থেকে, যার অর্থ গণনা করা। শুরুতে এই যন্ত্র বানানোই হয়েছিল বড় বড় হিসাব দ্রুত ও নির্ভুলভাবে করার জন্য। আজ সেই গণনাযন্ত্র দিয়ে আমরা চিঠি লিখি, ছবি সম্পাদনা করি, গান শুনি, ব্যাংকের হিসাব রাখি, এমনকি রকেট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনাও করি।
বিজ্ঞাপন
কম্পিউটার হলো এমন একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র, যা ব্যবহারকারীর দেওয়া তথ্য বা ডেটা গ্রহণ করে, আগে থেকে দেওয়া নির্দেশনা বা প্রোগ্রাম অনুযায়ী সেই তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে, প্রয়োজনমতো সংরক্ষণ করে এবং ফলাফল প্রদর্শন করে। পাঠ্যবইয়ের ভাষায় সংক্ষেপে বললে, কম্পিউটার একটি স্বয়ংক্রিয়, প্রোগ্রামযোগ্য তথ্য প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্র।
কম্পিউটার কি ধরনের যন্ত্র, এ প্রশ্নের উত্তরে তিনটি বৈশিষ্ট্য মনে রাখলেই চলে। এটি ইলেকট্রনিক, অর্থাৎ বিদ্যুৎপ্রবাহে চলে। এটি প্রোগ্রামযোগ্য, অর্থাৎ নির্দেশনা বদলালে একই যন্ত্র ভিন্ন কাজ করতে পারে। আর এটি স্বয়ংক্রিয়, অর্থাৎ একবার নির্দেশ পেলে প্রতিটি ধাপে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই কাজ শেষ করে।
কম্পিউটার কিভাবে কাজ করে
কম্পিউটারের কাজের মূল চক্রটি চার ধাপের। একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে দেখা যাক: আপনি ক্যালকুলেটর প্রোগ্রামে ২৫ আর ১৭ যোগ করতে চান।
বিজ্ঞাপন
১. ইনপুট: কি-বোর্ড বা মাউস দিয়ে আপনি সংখ্যা দুটি আর যোগের নির্দেশ দিলেন। এটাই ইনপুট।
২. প্রক্রিয়াকরণ: কম্পিউটারের মস্তিষ্ক, যাকে বলে সিপিইউ বা সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট, সংখ্যা দুটি যোগ করল।
৩. সংরক্ষণ: কাজের সময় সংখ্যা ও ফলাফল সাময়িকভাবে থাকে র্যাম নামের মেমোরিতে। আপনি চাইলে ফলাফল স্থায়ীভাবে হার্ডডিস্ক বা এসএসডিতে সেভ করতে পারেন।
৪. আউটপুট: মনিটরে ভেসে উঠল ৪২। এটাই আউটপুট। প্রিন্টারে ছাপা কাগজ বা স্পিকারের শব্দও আউটপুট।
বিজ্ঞাপন
কম্পিউটার ভেতরে সব তথ্য রাখে শুধু দুটি সংকেতে, শূন্য আর এক। একে বলে বাইনারি পদ্ধতি। লেখা, ছবি, গান, ভিডিও, সবকিছুই শেষ পর্যন্ত কোটি কোটি শূন্য আর একের সমষ্টি। বিদ্যুৎ আছে মানে এক, নেই মানে শূন্য, এই সরল নীতির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে পুরো ডিজিটাল জগৎ।
হার্ডওয়্যার: যা চোখে দেখা যায়
কম্পিউটারের যেসব অংশ ছোঁয়া যায়, সেগুলোকে বলে হার্ডওয়্যার। কাজ অনুযায়ী এদের ভাগ করা যায়।
ইনপুট যন্ত্র: কি-বোর্ড, মাউস, স্ক্যানার, ওয়েবক্যাম, মাইক্রোফোন। এগুলো দিয়ে কম্পিউটারে তথ্য ঢোকানো হয়।
বিজ্ঞাপন
প্রক্রিয়াকরণ অংশ: সিপিইউ সব হিসাব ও সিদ্ধান্তের কাজ করে। এর ভেতরে গাণিতিক ও যুক্তিভিত্তিক কাজের অংশ এবং পুরো কাজ নিয়ন্ত্রণের অংশ থাকে। গ্রাফিকসের ভারী কাজের জন্য আলাদা জিপিইউ বা গ্রাফিকস কার্ডও থাকতে পারে।
মেমোরি: র্যাম হলো অস্থায়ী মেমোরি, বিদ্যুৎ চলে গেলে এর তথ্য মুছে যায়। আর হার্ডডিস্ক বা এসএসডি হলো স্থায়ী স্টোরেজ, যেখানে ফাইল, ছবি ও প্রোগ্রাম জমা থাকে।
আউটপুট যন্ত্র: মনিটর, প্রিন্টার, স্পিকার, প্রজেক্টর।
মাদারবোর্ড: বড় একটি সার্কিট বোর্ড, যার ওপর সিপিইউ, র্যাম ও অন্য অংশগুলো বসানো থাকে এবং পরস্পর যুক্ত হয়।
বিজ্ঞাপন
পাওয়ার সাপ্লাই: বাসার বিদ্যুৎকে কম্পিউটারের উপযোগী করে সব অংশে সরবরাহ করে। ল্যাপটপে এর সঙ্গে থাকে ব্যাটারি।
সফটওয়্যার: যা কাজ করায়
হার্ডওয়্যার যদি শরীর হয়, সফটওয়্যার তার প্রাণ। সফটওয়্যার হলো নির্দেশনার সমষ্টি, যা হার্ডওয়্যারকে বলে দেয় কী করতে হবে।
অপারেটিং সিস্টেম: কম্পিউটার চালু হলে প্রথমে এটিই চলে এবং হার্ডওয়্যার ও ব্যবহারকারীর মধ্যে সেতু তৈরি করে। উইন্ডোজ, ম্যাকওএস ও লিনাক্স পরিচিত উদাহরণ। মোবাইলে অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএসও একই ধরনের কাজ করে।
বিজ্ঞাপন
অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার: নির্দিষ্ট কাজের প্রোগ্রাম, যেমন ওয়ার্ড প্রসেসর, স্প্রেডশিট, ব্রাউজার, ছবি সম্পাদনার সফটওয়্যার, গেম।
এর বাইরে আছে ইউটিলিটি সফটওয়্যার, যেমন অ্যান্টিভাইরাস, ফাইল সংকোচন বা ব্যাকআপের প্রোগ্রাম, যা কম্পিউটারকে সুস্থ ও গোছানো রাখতে সাহায্য করে। আর প্রোগ্রামাররা যে ভাষায় সফটওয়্যার লেখেন, যেমন পাইথন, জাভা বা সি, সেগুলোকে বলে প্রোগ্রামিং ভাষা।
হার্ডওয়্যার আর সফটওয়্যার একে অপরকে ছাড়া অচল। সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পিউটারও সফটওয়্যার ছাড়া শুধু ধাতু আর প্লাস্টিকের বাক্স।
কম্পিউটারের প্রকারভেদ
বিজ্ঞাপন
কাজের ধরন অনুযায়ী কম্পিউটার তিন রকম। এনালগ কম্পিউটার অবিরাম পরিবর্তনশীল মান, যেমন তাপমাত্রা বা চাপ মাপে। ডিজিটাল কম্পিউটার সংখ্যা বা বাইনারি সংকেতে কাজ করে, আমাদের ব্যবহারের প্রায় সব কম্পিউটারই এই ধরনের। আর হাইব্রিড কম্পিউটার দুই পদ্ধতিই ব্যবহার করে, যেমন হাসপাতালের কিছু যন্ত্রে।
আকার ও ক্ষমতা অনুযায়ী আছে সুপার কম্পিউটার, যা আবহাওয়ার পূর্বাভাস বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতো বিশাল হিসাব করে; মেইনফ্রেম, যা বড় ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে হাজারো ব্যবহারকারীর কাজ সামলায়; মিনি কম্পিউটার; আর মাইক্রো কম্পিউটার, যার মধ্যে পড়ে ডেস্কটপ, ল্যাপটপ ও ট্যাবলেট। প্রযুক্তিগতভাবে আপনার স্মার্টফোনও একটি ছোট কম্পিউটার।
কোথায় কোথায় কম্পিউটার ব্যবহার হয়
চোখ মেললেই চারপাশে কম্পিউটারের ছড়াছড়ি, যদিও সব সময় তা বাক্সের মতো দেখতে নয়। ব্যাংকের এটিএম বুথ, সুপারশপের বিলিং কাউন্টার, ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থা, হাসপাতালের এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম যন্ত্র, এমনকি আধুনিক গাড়ি ও ওয়াশিং মেশিনের ভেতরেও ছোট কম্পিউটার কাজ করে।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষায় কম্পিউটার দিয়ে পাঠ তৈরি, অনলাইন ক্লাস ও ফল প্রকাশ হয়। অফিসে চিঠি লেখা, হিসাব রাখা ও তথ্য সংরক্ষণ চলে এর মাধ্যমে। সরকারি সেবার আবেদন, ভূমির রেকর্ড, জন্ম নিবন্ধন সবই এখন কম্পিউটারভিত্তিক। কৃষক আবহাওয়ার পূর্বাভাস পান, চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ে সাহায্য পান, ফ্রিল্যান্সার ঘরে বসে বিদেশি ক্রেতার কাজ করেন। তাই কম্পিউটারের প্রাথমিক জ্ঞান এখন যেকোনো পেশার জন্যই কাজে লাগে। নতুন শিখতে চাইলে টাইপিং, ফাইল সংরক্ষণ, ইন্টারনেট ব্যবহার আর অফিস সফটওয়্যারের মৌলিক কাজ দিয়ে শুরু করাই সবচেয়ে ভালো।
কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা
কম্পিউটার দ্রুত কাজ করে, এক সেকেন্ডে কোটি কোটি হিসাব। সঠিক নির্দেশনা পেলে নির্ভুল থাকে, ক্লান্ত হয় না, একই কাজ হাজারবার একইভাবে করে। বিপুল তথ্য অল্প জায়গায় সংরক্ষণ করতে পারে।
কিন্তু কম্পিউটারের নিজস্ব বিচারবুদ্ধি নেই। ভুল তথ্য দিলে ভুল ফলই দেবে, যাকে প্রোগ্রামাররা বলেন "গারবেজ ইন, গারবেজ আউট"। কোন কাজ করা উচিত, কোনটি নৈতিক, সে সিদ্ধান্ত নিতে হয় মানুষকেই। চার্লস ব্যাবেজকে আধুনিক কম্পিউটারের জনক বলা হয়, কারণ উনিশ শতকে তিনিই প্রথম প্রোগ্রামযোগ্য যান্ত্রিক গণনাযন্ত্রের নকশা করেছিলেন। তাঁর সময় থেকে আজ পর্যন্ত যন্ত্র বদলেছে বিস্তর, কিন্তু মূল সত্য একই: কম্পিউটার মানুষের দেওয়া নির্দেশনাই পালন করে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কম্পিউটারের মস্তিষ্ক কাকে বলে?
সিপিইউ বা সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিটকে কম্পিউটারের মস্তিষ্ক বলা হয়, কারণ সব হিসাব ও নিয়ন্ত্রণের কাজ এখানেই হয়।
র্যাম আর রমের পার্থক্য কী?
বিজ্ঞাপন
র্যাম অস্থায়ী মেমোরি, কাজ চলার সময় তথ্য রাখে এবং বিদ্যুৎ বন্ধ হলে মুছে যায়। রম স্থায়ী মেমোরি, যেখানে কম্পিউটার চালু হওয়ার জরুরি নির্দেশনা আগে থেকে লেখা থাকে।
ল্যাপটপ আর ডেস্কটপের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
দুটিই মাইক্রো কম্পিউটার। ল্যাপটপে সব অংশ একটি বহনযোগ্য কাঠামোয় ব্যাটারিসহ থাকে, আর ডেস্কটপের অংশগুলো আলাদা ও বড় হওয়ায় সহজে বদলানো ও উন্নত করা যায়।
মোবাইল ফোন কি কম্পিউটার?
বিজ্ঞাপন
কাজের ধরনে হ্যাঁ। স্মার্টফোনে প্রসেসর, মেমোরি, স্টোরেজ, অপারেটিং সিস্টেম ও ইনপুট-আউটপুট ব্যবস্থা সবই আছে, তাই একে হাতের মুঠোর কম্পিউটার বলা যায়।