কম খরচে দার্জিলিং ভ্রমণ: বাস-ট্রেনের রুট, থাকা ও বাজেট
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফচূড়ায় ভোরের প্রথম আলো, পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে চা-বাগান, ধোঁয়া উড়িয়ে চলা খেলনার মতো ছোট ট্রেন। দার্জিলিং বহু বাংলাদেশির কাছে প্রথম বিদেশ ভ্রমণের নাম। ভালো খবর হলো, ঠিকমতো পথ বেছে নিলে এটি বিদেশ ভ্রমণের মধ্যে সবচেয়ে সাশ্রয়ীগুলোর একটি।
বিজ্ঞাপন
কম খরচে দার্জিলিং ভ্রমণের মূল কৌশল হলো কলকাতা ঘুরে না গিয়ে উত্তরবঙ্গের স্থলবন্দর দিয়ে সরাসরি শিলিগুড়ি পৌঁছানো। পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা বা লালমনিরহাটের বুড়িমারী সীমান্ত পার হলেই শিলিগুড়ি খুব কাছে, আর শিলিগুড়ি থেকে শেয়ার জিপে দার্জিলিং মাত্র তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টা। এতে সময় আর টাকা দুটোই বাঁচে।
শুরুর আগে একটা বিষয় নিশ্চিত হোন। দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসা আবার চালু হয়েছে, তবে চাহিদা বেশি থাকায় আবেদনের তারিখ পেতে সময় লাগতে পারে। পরিকল্পনা তাই ভিসা হাতে পাওয়ার পর পাকা করুন।
ভিসা ও কাগজপত্রের প্রস্তুতি
১. পাসপোর্ট: অন্তত ছয় মাস মেয়াদ থাকতে হবে।
বিজ্ঞাপন
২. ভারতীয় ভিসা: ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করে নির্ধারিত দিনে পাসপোর্ট জমা দিতে হয়। আবেদনের সময় প্রবেশ ও বহির্গমনের পথ হিসেবে সড়কপথ এবং নির্দিষ্ট স্থলবন্দর, যেমন বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ী বা বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা, উল্লেখ করুন। ভিসায় যে বন্দরের নাম থাকবে না, সেই বন্দর দিয়ে সাধারণত পার হওয়া যায় না।
৩. ডলার এনডোর্সমেন্ট: ব্যাংক বা অনুমোদিত মানি চেঞ্জার থেকে ডলার কিনে পাসপোর্টে এনডোর্স করিয়ে নিন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মে ভ্রমণের জন্য বছরে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা নেওয়া যায়।
৪. ভ্রমণ কর: স্থলপথে বিদেশ যেতে ভ্রমণ কর দিতে হয়, সাম্প্রতিক নিয়মে যা প্রায় এক হাজার টাকা। সঙ্গে স্থলবন্দরের সামান্য সেবা ফি। সোনালী ব্যাংকের বুথে বা অনলাইনে পরিশোধ করা যায়।
৫. কাগজের কপি: পাসপোর্ট, ভিসা, হোটেল বুকিং আর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি সঙ্গে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
বাংলাবান্ধা দিয়ে দার্জিলিং: ধাপে ধাপে
১. ঢাকা থেকে বাংলাবান্ধা বা পঞ্চগড়: গাবতলী, কল্যাণপুর ও মহাখালী এলাকা থেকে পঞ্চগড় ও বাংলাবান্ধার রাতের বাস ছাড়ে, দশ-বারো ঘণ্টা লাগে। নন-এসি ভাড়া আনুমানিক ৯০০ থেকে ১৩০০ টাকা। ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর থেকে পঞ্চগড়গামী আন্তনগর ট্রেনে পঞ্চগড় নেমে বাস বা সিএনজিতে বাংলাবান্ধা, ঘণ্টাখানেকের পথ।
২. সীমান্ত পার: বাংলাবান্ধায় বাংলাদেশ অংশে ভ্রমণ কর, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন শেষ করে হেঁটে ভারতের ফুলবাড়ী অংশে যান। সেখানে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস। সকালে পৌঁছালে ভিড় কম থাকে। সীমান্তের খোলার সময় নির্দিষ্ট, তাই রাতের বাসে গিয়ে সকালে পৌঁছানো আদর্শ।
৩. ফুলবাড়ী থেকে শিলিগুড়ি: অটো বা ট্যাক্সিতে আধা ঘণ্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। শেয়ার অটোতে খরচ সবচেয়ে কম।
বিজ্ঞাপন
৪. শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং: শিলিগুড়ির জংশন এলাকা বা সেবক মোড়ের দিক থেকে দার্জিলিংয়ের শেয়ার জিপ ছাড়ে। পাহাড়ি পথে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা। শেয়ার জিপে জনপ্রতি ভাড়া আনুমানিক কয়েকশ রুপি, পুরো জিপ রিজার্ভ নিলে কয়েক হাজার রুপি। সামনের আসন বা জানালার পাশের আসন চাইলে আগে বলে রাখুন।
এভাবে ঢাকা থেকে রাতে রওনা দিলে পরদিন সন্ধ্যার আগেই দার্জিলিং পৌঁছানো সম্ভব, যদি সীমান্তে বেশি দেরি না হয়।
বিকল্প পথ: বুড়িমারী ও বেনাপোল
বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা: ঢাকা থেকে লালমনিরহাটের বুড়িমারীর সরাসরি বাস আছে। সীমান্ত পার হয়ে চ্যাংড়াবান্ধা থেকে বাসে বা শেয়ার গাড়িতে শিলিগুড়ি, আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। রংপুর অঞ্চলের ভ্রমণকারীদের জন্য এটি সুবিধাজনক।
বিজ্ঞাপন
বেনাপোল-পেট্রাপোল হয়ে কলকাতা: কলকাতা ঘুরে শিয়ালদহ বা হাওড়া থেকে রাতের ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি, তারপর দার্জিলিং। কলকাতাও দেখতে চাইলে এই পথ ভালো, কিন্তু সময় ও খরচ দুটোই বেশি।
দার্জিলিংয়ে কম খরচে থাকা ও খাওয়া
দার্জিলিংয়ে ম্যাল বা চৌরাস্তার আশপাশে আর পাহাড়ের ঢালে অসংখ্য বাজেট হোটেল, হোমস্টে ও গেস্টহাউস আছে। মৌসুমভেদে সাধারণ কক্ষের ভাড়া রাতপ্রতি আনুমানিক ১০০০ থেকে ২৫০০ রুপি। দুই-তিনজনে একটি কক্ষ নিলে জনপ্রতি খরচ অনেক কমে। পাহাড়ের অনেক নিচে হোটেল নিলে সস্তা পাওয়া যায়, কিন্তু প্রতিদিন খাড়া পথ বেয়ে ওঠা-নামায় কষ্ট হয়, সেটাও হিসাবে রাখুন। শীতে কক্ষে হিটার বা পর্যাপ্ত কম্বল আছে কি না জেনে নিন।
খাওয়ায় সাশ্রয়ের উপায় হলো স্থানীয় ছোট রেস্তোরাঁ। মোমো, থুকপা, ম্যাগি, ভাত-ডাল-সবজির থালি তুলনামূলক সস্তা। ম্যালের বড় রেস্তোরাঁ আর ক্যাফেতে দাম অনেক বেশি। বাঙালি খাবারের দোকানও আছে।
বিজ্ঞাপন
কী দেখবেন, কোনটা সস্তায়
১. টাইগার হিল: কাঞ্চনজঙ্ঘায় সূর্যোদয় দেখার জন্য বিখ্যাত। ভোররাতে শেয়ার জিপে যেতে হয়, ভাড়া ভাগ করলে কম পড়ে। সঙ্গে ঘুম মনাস্ট্রি আর বাতাসিয়া লুপ দেখানো হয়।
২. ম্যাল ও চৌরাস্তা: হাঁটার জায়গা, প্রবেশে খরচ নেই। সন্ধ্যায় বসে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে থাকাই আনন্দ।
৩. টয় ট্রেন: দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। পুরো নিউ জলপাইগুড়ি-দার্জিলিং যাত্রা সময়সাপেক্ষ। দার্জিলিং থেকে ঘুম পর্যন্ত ছোট জয়রাইড জনপ্রিয়, তবে টিকিটের দাম তুলনামূলক বেশি এবং আগে বুকিং লাগে। বাজেট টানাটানি হলে ট্রেন চলতে দেখাই যথেষ্ট।
বিজ্ঞাপন
৪. চা-বাগান: শহরের কাছের চা-বাগানে হেঁটে ঘোরা যায়।
৫. পিস প্যাগোডা, চিড়িয়াখানা ও পর্বতারোহণ ইনস্টিটিউট: এগুলোতে প্রবেশ টিকিট লাগে, তবে দাম সাধারণত নাগালের মধ্যে।
৬. রক গার্ডেন ও আশপাশ: শেয়ার গাড়িতে গেলে কম খরচ।
দার্জিলিং ভ্রমণ খরচ: নমুনা বাজেট
বিজ্ঞাপন
চার রাত পাঁচ দিনের, বাংলাবান্ধা দিয়ে যাওয়া-আসার জনপ্রতি আনুমানিক হিসাব:
১. ঢাকা-বাংলাবান্ধা আসা-যাওয়া: আনুমানিক ২০০০ থেকে ২৬০০ টাকা।
২. ভ্রমণ কর ও বন্দর ফি: আনুমানিক ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা।
৩. ফুলবাড়ী-শিলিগুড়ি-দার্জিলিং আসা-যাওয়া, শেয়ারে: আনুমানিক ১০০০ থেকে ১৮০০ রুপি।
বিজ্ঞাপন
৪. থাকা, তিন রাত, দুজনে এক কক্ষ: জনপ্রতি আনুমানিক ২০০০ থেকে ৪০০০ রুপি।
৫. খাওয়া: দিনে আনুমানিক ৫০০ থেকে ৮০০ রুপি।
৬. ঘোরাঘুরি ও টিকিট: আনুমানিক ১০০০ থেকে ২০০০ রুপি।
এর সঙ্গে ভিসা আবেদন কেন্দ্রের প্রসেসিং ফি যোগ হবে। সব মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ১৫০০০ থেকে ২২০০০ টাকার মধ্যে একটি সাধারণ মানের সফর সম্ভব। মুদ্রার বিনিময় হার আর মৌসুমভেদে এই হিসাব বদলায়।
বিজ্ঞাপন
কখন যাবেন
মার্চ থেকে মে এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর দার্জিলিং ভ্রমণের জনপ্রিয় সময়। অক্টোবর-নভেম্বরে আকাশ সবচেয়ে পরিষ্কার, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সম্ভাবনা বেশি। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে প্রচণ্ড ঠান্ডা, তবে হোটেল তুলনামূলক সস্তা। বর্ষায়, জুন থেকে সেপ্টেম্বর, পাহাড়ি রাস্তায় ধস নামে, কাঞ্চনজঙ্ঘা প্রায় দেখাই যায় না, যদিও খরচ কম। পূজা ও বড় ছুটির সময় ভারতীয় পর্যটকের ভিড়ে হোটেলের দাম বেড়ে যায়।
সাশ্রয়ের সঙ্গে সতর্কতা
সীমান্তে দালালের সাহায্য নেবেন না, সব কাজ নিজে কাউন্টারে করুন। টাকা ভাঙাতে শিলিগুড়ি বা দার্জিলিংয়ের অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করুন। ভারতে মোবাইল সিম কিনতে পাসপোর্ট-ভিসার কপি ও ছবি লাগে। পাহাড়ি জিপে বমিভাব হলে আগে থেকে হালকা খাবার খান। ভিসার মেয়াদ ও অনুমোদিত বন্দর ভালো করে দেখে নিন, ফেরার পথও সেই বন্দর দিয়েই হতে হবে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ঢাকা থেকে দার্জিলিং যেতে কত সময় লাগে?
বাংলাবান্ধা দিয়ে গেলে সব ঠিক থাকলে মোটামুটি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানো যায়, যার মধ্যে রাতের বাসযাত্রা, সীমান্তের সময় আর পাহাড়ি পথ আছে।
ভিসায় বাংলাবান্ধা না থাকলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
ভিসায় যে স্থলবন্দরের নাম আছে, সেটি দিয়েই যেতে হবে, অথবা বিমানপথে যেতে হবে। আবেদনের সময়ই সঠিক বন্দর বেছে নিন।
সিকিমও কি একই সফরে যাওয়া যায়?
সিকিমে ঢুকতে বিদেশিদের আলাদা অনুমতির নিয়ম আছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে বর্তমান নিয়ম কী, তা যাওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন।
দার্জিলিংয়ে কি বাংলাদেশি টাকা চলে?
বিজ্ঞাপন
না। ভারতীয় রুপিতে লেনদেন করতে হয়। ডলার বা টাকা অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জে ভাঙিয়ে নিন।