কম খরচে সুন্দরবন ভ্রমণ: শেয়ার ট্যুর, ডে ট্যুর ও বাজেট পরিকল্পনা
ট্রাভেল ডেস্ক · খুলনা
প্রকাশ:
সুন্দরবন ভ্রমণ মানেই বিলাসবহুল লঞ্চ আর বড় অঙ্কের প্যাকেজ, এমন নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনের স্বাদ নেওয়া যায় এক দিনের নৌকাভ্রমণেও, আবার কয়েকজন অপরিচিত ভ্রমণকারীর সঙ্গে লঞ্চের কেবিন ভাগ করে দুই রাতের শেয়ার ট্যুরেও। দুটোরই খরচ নাগালের মধ্যে।
বিজ্ঞাপন
কম খরচে সুন্দরবন ভ্রমণের মূল কথা তিনটি: পরিবহন হিসেবে বাস বা ট্রেন বেছে নেওয়া, একা বা ছোট দলে না গিয়ে শেয়ার প্যাকেজে যোগ দেওয়া, আর যাঁদের সময় কম তাঁদের জন্য করমজল বা কলাগাছিয়ার মতো কাছের স্পটে ডে ট্যুর। পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা থেকে খুলনা ও মোংলা যাওয়ার সময় অনেক কমে গেছে, এতে খরচও কমেছে।
সুন্দরবন সংরক্ষিত বন, বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া ভেতরে ঢোকা যায় না। প্যাকেজ ট্যুরে এই অনুমতি ট্যুর পরিচালকই নেন, ডে ট্যুরের নির্দিষ্ট স্পটগুলোতে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়।
কখন যাবেন, কখন যাবেন না
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন ভ্রমণের সেরা সময়। নদী শান্ত থাকে, আবহাওয়া আরামদায়ক, পাখি ও হরিণ দেখার সম্ভাবনাও বেশি। মার্চ থেকে মে গরম বাড়ে, তবু অনেকে যান, খরচও কিছুটা কম পড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুমের কারণে বন বিভাগ প্রতিবছর সাধারণত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশ বন্ধ রাখে। এই সময় প্যাকেজ ট্যুরও চলে না। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে নদী তুলনামূলক উত্তাল থাকে, ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কসংকেতও আসতে পারে।
সুন্দরবনের দরজা: কোথা থেকে যাবেন
১. খুলনা: শেয়ার ও প্রাইভেট লঞ্চ প্যাকেজের মূল কেন্দ্র। বেশির ভাগ প্যাকেজ খুলনা থেকে ছাড়ে, কটকা, কচিখালী, হিরণ পয়েন্টের মতো গভীর এলাকায় যায়।
২. মোংলা, বাগেরহাট: ডে ট্যুরের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয়। মোংলা ঘাট থেকে নৌকায় করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে যাওয়া যায়, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। হাড়বাড়িয়া ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রও এই দিক থেকে যাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
৩. শ্যামনগর, সাতক্ষীরা: মুন্সীগঞ্জ এলাকা থেকে কলাগাছিয়া ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রসহ পশ্চিম সুন্দরবনের কিছু স্পটে নৌকায় যাওয়া যায়।
ঢাকা থেকে কম খরচে যাতায়াত
১. বাসে খুলনা বা মোংলা: পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকার সায়েদাবাদ, গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে খুলনা, বাগেরহাট ও মোংলার বাস চলে। খুলনা পর্যন্ত মোটামুটি পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা লাগে। নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা।
২. ট্রেনে খুলনা: কমলাপুর থেকে পদ্মা সেতু হয়ে এবং যমুনা সেতু হয়ে খুলনার আন্তনগর ট্রেন চলে। শোভন চেয়ারের ভাড়া বাসের কাছাকাছি, তবে আরাম বেশি। টিকিট অনলাইনে আগে কাটতে হয়।
বিজ্ঞাপন
৩. খুলনা থেকে মোংলা: খুলনা শহর থেকে মোংলার বাস বা মাইক্রো চলে, এক ঘণ্টার মতো লাগে।
শেয়ার প্যাকেজ ট্যুর: কীভাবে কাজ করে
শেয়ার ট্যুর মানে একটি লঞ্চে বিভিন্ন দলের মানুষ একসঙ্গে যাত্রা করেন, প্রত্যেকে নিজের আসন বা কেবিনের ভাড়া দেন। সাধারণত দুই রাত-তিন দিনের প্যাকেজ হয়, খুলনা থেকে সকালে ছেড়ে তৃতীয় দিন বিকেলে ফেরে।
প্যাকেজে সাধারণত যা থাকে: লঞ্চে থাকা, তিন বেলা খাবার ও নাশতা, বন বিভাগের অনুমতি ও প্রবেশ ফি, সশস্ত্র বনরক্ষী, গাইড, আর ছোট নৌকায় খাল ঘোরা। কটকা সৈকত, জামতলা ওয়াচ টাওয়ার, কচিখালী, করমজলের মতো স্পট ঘোরানো হয়। কোন কোন স্পট যাবে, তা প্যাকেজভেদে আলাদা।
বিজ্ঞাপন
শেয়ার ট্যুরের খরচ জনপ্রতি আনুমানিক ৭০০০ থেকে ১৫০০০ টাকা, লঞ্চের মান, কেবিনের ধরন আর মৌসুমভেদে। ডরমিটরি বা কমন বার্থ নিলে খরচ সবচেয়ে কম, এসি কেবিনে বেশি।
সুন্দরবন ডে ট্যুর: সবচেয়ে সাশ্রয়ী উপায়
যাঁদের সময় বা বাজেট কম, তাঁদের জন্য ডে ট্যুর সবচেয়ে সহজ।
১. করমজল: মোংলা ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে যাওয়া যায়। এখানে কাঠের ট্রেইল ধরে বনের ভেতর হাঁটা, হরিণ ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র, ওয়াচ টাওয়ার আছে। প্রবেশে টিকিট লাগে।
বিজ্ঞাপন
২. হাড়বাড়িয়া: মোংলা থেকে আরও কিছুটা দূরে, বনের ভেতর কাঠের পথ ও পুকুর। সময় বেশি লাগে, নৌকাভাড়াও বেশি।
৩. কলাগাছিয়া: শ্যামনগরের দিক থেকে, পশ্চিম সুন্দরবনের স্বাদ পেতে।
মোংলা থেকে করমজল আসা-যাওয়ায় নৌকাভাড়া আকারভেদে আনুমানিক ১০০০ থেকে ২৫০০ টাকা, দলে ভাগ করলে জনপ্রতি অল্প। ঘাটে অনেক সময় শেয়ার ট্রলারও পাওয়া যায়, জনপ্রতি ভাড়ায়।
সুন্দরবন ভ্রমণ খরচ: দুই ধরনের নমুনা হিসাব
বিজ্ঞাপন
ডে ট্যুর, ঢাকা থেকে মোংলা হয়ে করমজল, জনপ্রতি আনুমানিক: বাসে আসা-যাওয়া ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকা, নৌকা ভাগে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা, টিকিট অল্প, খাওয়া ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। মোট আনুমানিক ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকা। রাতে মোংলা বা খুলনায় থাকলে হোটেলের খরচ যোগ হবে।
শেয়ার প্যাকেজ, জনপ্রতি আনুমানিক: ঢাকা-খুলনা আসা-যাওয়া ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকা, প্যাকেজ ৭০০০ থেকে ১৫০০০ টাকা। মোট আনুমানিক ৮৫০০ থেকে ১৭০০০ টাকা।
সব অঙ্ক সময়ের সঙ্গে বদলায়, বিশেষ করে জ্বালানির দাম বাড়লে প্যাকেজের দামও বাড়ে।
প্যাকেজ বাছাইয়ের সময় যা যাচাই করবেন
বিজ্ঞাপন
১. লাইসেন্স ও অভিজ্ঞতা: ট্যুর পরিচালকের বৈধ নিবন্ধন আছে কি না, আগের যাত্রীদের অভিজ্ঞতা কেমন।
২. লঞ্চের নিরাপত্তা: পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা।
৩. কী অন্তর্ভুক্ত: অনুমতি ফি, বনরক্ষী, খাবার, পানীয় জল, ছোট নৌকা, সব প্যাকেজে আছে কি না।
৪. বাতিলের নিয়ম: খারাপ আবহাওয়ায় যাত্রা বাতিল হলে টাকা ফেরত বা তারিখ বদলের সুযোগ।
বিজ্ঞাপন
শুধু সামাজিক মাধ্যমের বিজ্ঞাপন দেখে পুরো টাকা অগ্রিম পাঠাবেন না। সম্ভব হলে পরিচিত কারও মাধ্যমে বা অফিসে গিয়ে বুকিং দিন।
ব্যাগ গোছানোর বাজেট টিপস
লঞ্চে জায়গা সীমিত, তাই একটি মাঝারি ব্যাকপ্যাকই যথেষ্ট। শীতের মৌসুমে নদীর ওপর ভোর ও রাতে বেশ ঠান্ডা লাগে, তাই একটি গরম জ্যাকেট, মাফলার আর মোজা নিন। দিনের বেলা রোদ কড়া, টুপি ও সানগ্লাস কাজে আসে।
বনের ভেতর কাদা আর কাঠের পিচ্ছিল পথে হাঁটতে হয়, তাই গ্রিপওয়ালা জুতা নিন। মোবাইলের চার্জের জন্য পাওয়ার ব্যাংক রাখুন, কারণ লঞ্চে চার্জের সুযোগ নির্দিষ্ট সময়ে থাকে এবং বনের ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায় থাকে না। দূরের পাখি বা হরিণ দেখার জন্য ছোট একটি দূরবিন থাকলে অভিজ্ঞতা অনেক ভালো হয়। নিয়মিত ওষুধ, বমিভাবের ওষুধ আর প্রাথমিক চিকিৎসার জিনিস সঙ্গে রাখুন। শুকনো খাবার নিলে মোড়ক ফেরত আনবেন।
বিজ্ঞাপন
বনের নিয়ম ও সতর্কতা
বনরক্ষী ও গাইডের নির্দেশ ছাড়া লঞ্চ বা নৌকা থেকে নামবেন না। বনের ভেতর দল ছেড়ে একা হাঁটবেন না, এটি বাঘ ও কুমিরের এলাকা। উচ্চ শব্দে গান বাজানো, প্লাস্টিক ফেলা বা প্রাণীদের খাবার দেওয়া নিষেধ। নদীতে সাঁতার কাটবেন না। মশা ও রোদ থেকে বাঁচতে লম্বা হাতার জামা, টুপি আর মশা তাড়ানোর ক্রিম রাখুন। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কসংকেত থাকলে যাত্রা পিছিয়ে দিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
একা গেলে কি শেয়ার ট্যুরে যোগ দেওয়া যায়?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ। শেয়ার ট্যুরের সুবিধাই এটি। একা বা দুজনে গেলেও আসন বা বার্থ ভাড়া নিয়ে অন্যদের সঙ্গে যাওয়া যায়।
ডে ট্যুরে কি বাঘ দেখা যায়?
করমজলের মতো কাছের স্পটে বাঘ দেখার সম্ভাবনা খুবই কম। হরিণ, বানর, কুমির আর পাখি দেখা যায়। গভীর বনের প্যাকেজেও বাঘ দেখা ভাগ্যের ব্যাপার।
নিজের নৌকা নিয়ে কি গভীর বনে যাওয়া যায়?
বিজ্ঞাপন
বন বিভাগের অনুমতি, বনরক্ষী ও নির্ধারিত ফি ছাড়া গভীর বনে যাওয়া যায় না। তাই সাধারণ পর্যটকদের জন্য প্যাকেজ ট্যুরই ব্যবহারিক উপায়।
শিশুদের নিয়ে কোন ট্যুর ভালো?
শিশুদের নিয়ে করমজলের মতো ছোট ডে ট্যুর সহজ। লঞ্চের প্যাকেজে গেলে শিশুর জন্য আলাদা লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করুন।