সূরা কদর বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: নাজিলের প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
"ইন্না আনজালনাহু ফি লাইলাতিল কাদর", নামাজে ছোট সূরা হিসেবে এটি পড়েন না এমন মুসল্লি কম। পাঁচ আয়াতের এই সূরাটি কোরআনের ৯৭তম সূরা, ৩০তম পারায় অবস্থিত। প্রথম আয়াতের শব্দ থেকে অনেকে একে "ইন্না আনজালনাহু" নামেও চেনেন।
বিজ্ঞাপন
সূরাটির বিষয় একটি রাত, লাইলাতুল কদর। কদর শব্দের অর্থ মর্যাদা, আবার পরিমাপ বা ভাগ্য নির্ধারণও। এই রাতে কোরআন নাজিল হয়েছে, এই রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম, এ রাতে ফেরেশতা ও জিবরাইল (আ.) অবতরণ করেন, আর ফজর পর্যন্ত পুরো রাত শান্তিময়। মাত্র পাঁচ আয়াতে এই চারটি কথা বলা হয়েছে।
অধিকাংশ তাফসিরকারকের মতে সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ, কেউ কেউ মদিনায় অবতীর্ণ বলেছেন।
সূরা কদর আরবি
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ الْفَجْرِ
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
১. ইন্না আনজালনাহু ফি লাইলাতিল কাদর: নিশ্চয়ই আমি একে (কোরআনকে) নাজিল করেছি কদরের রাতে।
২. ওয়ামা আদরাকা মা লাইলাতুল কাদর: আর আপনি কি জানেন, কদরের রাত কী?
৩. লাইলাতুল কাদরি খাইরুম মিন আলফি শাহর: কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
বিজ্ঞাপন
৪. তানাজ্জালুল মালাইকাতু ওয়াররুহু ফিহা বিইজনি রাব্বিহিম মিন কুল্লি আমর: সে রাতে ফেরেশতারা ও রুহ তাদের রবের অনুমতিক্রমে প্রত্যেক বিষয় নিয়ে অবতরণ করে।
৫. সালামুন হিয়া হাত্তা মাতলাইল ফাজর: শান্তিময় সেই রাত, ফজরের উদয় পর্যন্ত।
"ইন্না আনজালনাহু" অর্থ "নিশ্চয়ই আমি তা নাজিল করেছি"। এখানে "তা" বলতে কোরআন বোঝানো হয়েছে, যদিও নাম উল্লেখ করা হয়নি। আরবি অলংকারে এভাবে নাম না নিয়ে বলা বিষয়টির মহত্ত্ব বোঝায়, যেন এটি এতই পরিচিত যে নাম বলার দরকার নেই।
নাজিলের প্রেক্ষাপট
বিজ্ঞাপন
সূরা কদর নাজিলের নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে তাফসিরের কিতাবে কয়েকটি বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন, বনি ইসরাইলের এক ব্যক্তি হাজার মাস আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছিলেন শুনে সাহাবিরা বিস্মিত হন, তখন এ সূরা নাজিল হয়। আবার কোনো বর্ণনায় আছে, মহানবী (সা.) পূর্ববর্তী উম্মতের দীর্ঘ আয়ুর তুলনায় নিজের উম্মতের আয়ু কম দেখে চিন্তিত হলে আল্লাহ এই রাত দান করেন। এসব বর্ণনার সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের আলোচনা আছে, তাই এগুলোকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে বলা যায় না।
যা নিশ্চিত, তা হলো কোরআন নাজিলের সময়। সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, রমজান মাসেই কোরআন নাজিল হয়েছে। সূরা দুখানের ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আমি একে এক বরকতময় রাতে নাজিল করেছি। আর সূরা কদর জানাচ্ছে, সেই রাতটিই লাইলাতুল কদর।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এ রাতে পুরো কোরআন লাওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে একসঙ্গে নাজিল হয়, তারপর প্রায় তেইশ বছর ধরে প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প অল্প করে মহানবী (সা.)-এর কাছে আসে। অনেক আলেম বলেছেন, হেরা গুহায় প্রথম ওহি, অর্থাৎ সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াতও রমজানের এক রাতেই নাজিল হয়েছিল।
হাজার মাসের চেয়ে উত্তম মানে কী
বিজ্ঞাপন
হাজার মাস প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস, অর্থাৎ একজন মানুষের পুরো জীবনের চেয়েও বেশি সময়। আয়াতে বলা হয়নি "হাজার মাসের সমান", বলা হয়েছে "হাজার মাসের চেয়ে উত্তম"। কতটা উত্তম, তা আল্লাহই জানেন।
এর বাস্তব অর্থ হলো, এই এক রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদর নেই এমন হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদতে দাঁড়ায়, তার আগের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।
"রুহ" বলতে অধিকাংশ তাফসিরকারকের মতে জিবরাইল (আ.)-কে বোঝানো হয়েছে। ফেরেশতাদের মধ্যে আলাদা করে তাঁর নাম নেওয়া তাঁর বিশেষ মর্যাদার প্রকাশ।
লাইলাতুল কদর কবে এবং কী আমল করবেন
বিজ্ঞাপন
বুখারির হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ করো। অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ রমজানের রাত, যা আগের সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়। বাংলাদেশে ২৬ রমজান দিবাগত রাত, অর্থাৎ ২৭তম রাতকে শবে কদর হিসেবে পালন করা হয়। ২৭তম রাতে হওয়ার সম্ভাবনার পক্ষে কিছু সাহাবির মত আছে, তবে নিশ্চিতভাবে নির্দিষ্ট নয়। তাই শেষ দশকের সব বেজোড় রাতে ইবাদত করাই নিরাপদ।
নামাজ: তারাবি, তাহাজ্জুদ ও নফল নামাজ। নির্দিষ্ট রাকাত বা নির্দিষ্ট সূরা দিয়ে "শবে কদরের নামাজ" পড়ার কোনো বিশেষ পদ্ধতি সহিহ হাদিসে নেই।
কোরআন তিলাওয়াত: যেহেতু এটি কোরআন নাজিলের রাত, তাই তিলাওয়াত ও অর্থ নিয়ে চিন্তা এ রাতের উপযুক্ত আমল।
দোয়া: তিরমিজিতে বর্ণিত, হজরত আয়েশা (রা.) জানতে চেয়েছিলেন, কদরের রাত পেলে কী দোয়া করবেন। মহানবী (সা.) শিখিয়েছিলেন: "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্নি", অর্থাৎ হে আল্লাহ, তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসো, অতএব আমাকে ক্ষমা করো।
বিজ্ঞাপন
ইতিকাফ: মহানবী (সা.) রমজানের শেষ দশকে মসজিদে ইতিকাফ করতেন বলে বুখারি ও মুসলিমে আছে।
লাইলাতুল কদরের আলামত ও প্রচলিত ভুল ধারণা
সহিহ মুসলিমে হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, লাইলাতুল কদরের পরের সকালে সূর্য উদিত হয় সাদা, তেজহীন অবস্থায়, তখন তার আলোয় তীব্র রশ্মি থাকে না। কিছু বর্ণনায় রাতটি নাতিশীতোষ্ণ ও প্রশান্ত হওয়ার কথাও এসেছে। তবে আলেমরা মনে করিয়ে দেন, এসব আলামত রাত পার হওয়ার পর বোঝা যায় এবং অনেক সময় সবার কাছে স্পষ্ট হয় না। আলামত খোঁজার চেয়ে ইবাদতে রাত কাটানোই আসল কাজ।
সমাজে কিছু কথা প্রচলিত, যেগুলোর নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। যেমন, এ রাতে গাছপালা সিজদা করে, সাগরের লোনা পানি মিষ্টি হয়ে যায়, কিংবা নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাতে নির্দিষ্ট সূরা পড়লে বিশেষ পুরস্কার মেলে। আবার কেউ কেউ পুরো রাত আলোকসজ্জা, আতশবাজি বা খাবারের আয়োজনে কাটান, যা এ রাতের মূল চেতনার সঙ্গে মেলে না। নীরবে, একাগ্রতায় নামাজ, তিলাওয়াত ও দোয়াই সুন্নাহর পথ।
বিজ্ঞাপন
পুরো রাত জাগতে না পারলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। সহিহ মুসলিমের হাদিসে আছে, যে এশা জামাতে পড়ল, সে যেন অর্ধরাত নামাজ পড়ল, আর যে ফজরও জামাতে পড়ল, সে যেন পুরো রাত নামাজ পড়ল। তাই শেষ দশকের রাতগুলোতে অন্তত এশা ও ফজর জামাতে পড়ার চেষ্টা করুন, মাঝে সাধ্যমতো নফল ও দোয়া।
সূরা কদরের শিক্ষা
সময়ের মূল্য সবার সমান নয়। আল্লাহ কিছু সময়কে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন, বুদ্ধিমান মানুষ সেই সুযোগ কাজে লাগায়। আবার কোরআনের কারণেই রাতটির এত মর্যাদা। তাই যে জীবনে কোরআন প্রবেশ করে, সে জীবনও মর্যাদাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
সূরা কদর পড়ার নির্দিষ্ট কোনো ফজিলত আছে কি?
সূরা কদর পড়ার আলাদা কোনো ফজিলত সহিহ হাদিসে নির্দিষ্টভাবে পাওয়া যায় না। তবে কোরআন তিলাওয়াতের সাধারণ সওয়াব আছে, এবং নামাজে ছোট সূরা হিসেবে এটি বহুল পঠিত।
শবে কদর কি শুধু ২৭ রমজানে?
না, নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। শেষ দশকের বেজোড় রাতে খুঁজতে বলা হয়েছে। ২৭তম রাতে হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কিছু বর্ণনা আছে।
বিজ্ঞাপন
নারীরা কি ঋতুস্রাবের সময় শবে কদরের ইবাদত করতে পারবেন?
নামাজ ও কোরআন তিলাওয়াত ছাড়া দোয়া, জিকির, ইস্তেগফার ও দরুদ পড়তে পারবেন। এগুলোতেও কদরের রাতের বরকত পাওয়ার আশা করা যায়।
সূরা কদর কি মক্কি না মাদানি?
অধিকাংশ তাফসিরকারক একে মক্কি বলেছেন, কিছু আলেম মাদানি বলেছেন।