এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক টাকা জরিমানা, ব্যাংকে জমা দিতে হয়
বিজ্ঞান পাঠাগারে ৮-৯ দিন দেরি হলে এক টাকা জরিমানা, অনলাইন পদ্ধতি না
ঢাকা জেলা প্রতিনিধি · ঢাকা
প্রকাশ:
জরিমানা মাত্র এক টাকা, তবে সেই টাকা জমা দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীকে ব্যাংকে যেতে হয় এবং লাইনে দাঁড়াতে হয়। বই ফেরত দিতে আট-নয় দিন দেরি করলে এ ধরনের পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হয়।
বিজ্ঞাপন
প্রযুক্তিনির্ভর সেবার যুগে এক টাকা জরিমানা ব্যাংকে দিতে হয়—এটি অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য শোনায়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও তার অধীন বিজ্ঞান পাঠাগারে বছরের পর বছর এই পদ্ধতি বজায় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য সেবাগুলি অনলাইনে চালু হলেও গ্রন্থাগারের জরিমানা পরিশোধের পদ্ধতি এখনো বদলায়নি।
বিষয়টি নতুন আলোচনায় উঠে আসে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাবিলা হক তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট শেয়ার করেন। তিনি আজ বৃহস্পতিবার তার পোস্টে উল্লেখ করেন যে তিনি বিজ্ঞান পাঠাগার থেকে বই ফেরত দিতে আট-নয় দিন দেরি করার ফলে এক টাকা জরিমানা পেয়েছেন।
বিজ্ঞান পাঠাগার থেকে এক টাকা জরিমানা পেয়েছে নাবিলা হককে, এবং তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকার জনতা ব্যাংকে জমা দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সূত্র জানায় বিজ্ঞান পাঠাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের অধীন পরিচালিত, তবে অন্যান্য হল ও বিভাগের গ্রন্থাগারগুলো নিজস্ব নিয়মে কাজ করে।
নাবিলা হকের পোস্টের সঙ্গে গ্রন্থাগার জরিমানা আদায়ের ফরমের একটি ছবি যুক্ত ছিল, যেখানে তার নাম, বিভাগ, হল ও গ্রন্থাগার কার্ড সম্পর্কিত তথ্য, পাশাপাশি ‘এক টাকা’ অর্থে জরিমানার পরিমাণ উল্লেখ রয়েছে। ফরমে ৩ নভেম্বর তারিখে একটি গ্রন্থাগার কর্মকর্তার স্বাক্ষরও দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
এক টাকার কাগুজের নোট সাধারণ লেনদেনে এখন বেশি দেখা যায় না; বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ২৯ মে নতুন নকশার নোটের তালিকায় এক টাকার নোট ছিল না, তবে এক টাকার ধাতব মুদ্রা বা কয়েন এখনো প্রচলিত রয়েছে।
‘এক টাকার জন্য ব্যাংকের দিকে যাওয়াটাই বিরক্তিকর’ বলে নাবিলা হক প্রথম আলোকে তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি জানান পূজার ছুটির মধ্যে বই ফেরত দেওয়ার নির্ধারিত তারিখ পড়ার কারণে সময়মতো বইটি জমা দিতে পারেননি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মোস্তাকিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে জরিমানা পরিশোধের এই প্রক্রিয়াটি অনলাইন সেবার আওতায় নিয়ে আসতে পারে। মাত্র এক টাকা জরিমানা জমা দিতে ব্যাংক পর্যন্ত যাওয়া এবং লাইনে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীদের জন্য একধরনের ভোগান্তি’।
মোস্তাকিম আরও যোগ করেন, ‘জরিমানার টাকাও অনলাইনে পরিশোধের ব্যবস্থা করা হলে শিক্ষার্থীদের সময় ও ভোগান্তি—দুটিই কমবে’। তিনি উল্লেখ করেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সেবা এখন অনলাইনে প্রদান করা সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ওয়েবসাইটে জরিমানা হার দুটি রূপে উল্লেখ আছে। ‘ফাইন ডিটেইলস’ বিভাগে বলা হয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে ৫০ পয়সা, তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহে এক টাকা, এবং পঞ্চম সপ্তাহ থেকে তিন টাকা জরিমানা ধার্য হবে। তবে এই হার প্রতি সপ্তাহের জন্য নাকি উল্লিখিত সময়ের মোট জরিমানা তা স্পষ্ট নয়।
একই ওয়েবসাইটে গ্রন্থাগারের অধ্যাদেশভিত্তিক নীতিমালার ১৪ নম্বর বিধানে বলা হয়েছে যে শিক্ষার্থীদের প্রতি বইয়ে প্রতি সপ্তাহ বা সপ্তাহের অংশবিশেষে ২৫ পয়সা জরিমানা দিতে হবে, এবং তা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব দপ্তরে নগদে আদায় করা হবে। তবে বর্তমানে জরিমানা পরিশোধের একমাত্র পদ্ধতি ব্যাংকে যাওয়া।
অর্থাৎ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অধ্যাদেশভিত্তিক নীতিমালা এবং অন্য অংশে দেওয়া জরিমানার হার ও আদায় পদ্ধতির মধ্যে পারস্পরিক বৈরিতা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে এসব নিয়ম পরিবর্তন করা হয়েছে কি না বা কোন নিয়ম বর্তমানে কার্যকর, তা সম্পর্কে ওয়েবসাইটে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
একই সময়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব উদ্যোগের ফলে এক টাকার জরিমানা পরিশোধের পদ্ধতি আরও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ২০২৫ সালের ১৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও হলের জামানতসহ বিভিন্ন ফি অনলাইনে অথবা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে জমা দিতে পারবেন।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি হ্রাস করা, ফলে তারা আর ব্যাংকের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ফি জমা দিতে হবে না। তবে গ্রন্থাগারের এক টাকা জরিমানা পরিশোধের ক্ষেত্রে এখনো ব্যাংকই একমাত্র ভরসা।
কাজী মোস্তাক গাউসুল হক, গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক, প্রথম আলোকে বলেন, ‘এক টাকা জরিমানা ব্যাংকের মাধ্যমে জমা দেওয়ার বিষয়টি অযৌক্তিক। এ নিয়ম দীর্ঘদিন ধরে, প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছর বা তারও আগে থেকে প্রচলিত’। তিনি উল্লেখ করেন যে বর্তমান সময়ে একমাত্র পদ্ধতি ব্যাংকের মাধ্যমে জমা দেওয়া।
গ্রন্থাগারিক আরও বলেন, অল্প পরিমাণ জরিমানা জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা চালু করা যায় কি না, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানান, জরিমানা পরিশোধের এই প্রক্রিয়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করার বিষয়টিও রয়েছে এবং এটিকে একধরনের ‘শাস্তি’ হিসেবে বিবেচনা করেন।