সূরা কাফিরুন বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: নাজিলের প্রেক্ষাপট ও ফজিলত
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
মক্কায় ইসলামের দাওয়াত তখন কয়েক বছর পেরিয়েছে। নির্যাতন, বয়কট, ঠাট্টা কোনো কিছুতেই মহানবী (সা.)-কে থামানো যাচ্ছে না। কুরাইশ নেতারা তখন নতুন কৌশল নিলেন, আপসের প্রস্তাব। এই প্রস্তাবের জবাবেই নাজিল হয় সূরা কাফিরুন, যার প্রথম বাক্য "কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফিরুন" অনেকেরই মুখস্থ।
বিজ্ঞাপন
সূরা কাফিরুন কোরআনের ১০৯তম সূরা, ৩০তম পারায়। এটি মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত ছয়টি। কাফিরুন অর্থ অবিশ্বাসীরা। সূরাটির মূল কথা একটাই: ইবাদতের প্রশ্নে তাওহিদ ও শিরকের মধ্যে কোনো মিশ্রণ বা ভাগাভাগি সম্ভব নয়।
আকারে ছোট হলেও এর গুরুত্ব অনেক বড়। মহানবী (সা.) সূরাটি নিয়মিত পড়তেন, বিশেষ করে ফজরের সুন্নতে, মাগরিবের সুন্নতে ও বিতরে। আর ঘুমের আগে পড়ার জন্য সাহাবিদের বিশেষভাবে শিখিয়েছেন।
সূরা কাফিরুন আরবি
قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ وَلَا أَنتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ وَلَا أَنَا عَابِدٌ مَّا عَبَدتُّمْ وَلَا أَنتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
১. কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফিরুন: বলুন, হে অবিশ্বাসীরা।
২. লা আ'বুদু মা তা'বুদুন: তোমরা যার ইবাদত করো, আমি তার ইবাদত করি না।
৩. ওয়ালা আনতুম আবিদুনা মা আ'বুদ: আর আমি যাঁর ইবাদত করি, তোমরা তাঁর ইবাদতকারী নও।
বিজ্ঞাপন
৪. ওয়ালা আনা আবিদুম মা আবাদতুম: আর তোমরা যার ইবাদত করে আসছ, আমি তার ইবাদতকারী হব না।
৫. ওয়ালা আনতুম আবিদুনা মা আ'বুদ: আর আমি যাঁর ইবাদত করি, তোমরা তাঁর ইবাদতকারী হবে না।
৬. লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়া দিন: তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন, আর আমার জন্য আমার দ্বীন।
তিলাওয়াতে "আ'বুদু" ও "আবিদুনা" শব্দের আইন হরফ এবং শেষ আয়াতের "দিন" শব্দটি ঠিকভাবে উচ্চারণ করা জরুরি। বাংলা উচ্চারণ সহায়ক মাত্র, শুদ্ধ তিলাওয়াত কারির কাছে শিখে নিন।
বিজ্ঞাপন
নাজিলের প্রেক্ষাপট
সিরাত ও তাফসিরের কিতাবে, যেমন ইবনে ইসহাক ও ইমাম তাবারির বর্ণনায় এসেছে, কুরাইশের কয়েকজন নেতা মহানবী (সা.)-এর কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসেন। প্রস্তাবটি ছিল এমন: এক বছর আপনি আমাদের উপাস্যদের পূজা করবেন, আর এক বছর আমরা আপনার রবের ইবাদত করব। এভাবে দুই পক্ষই সত্যের অংশ পাবে, বিরোধও মিটে যাবে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিতে প্রস্তাবটি আকর্ষণীয় মনে হতে পারত। নির্যাতন বন্ধ হবে, মুসলমানরা স্বস্তি পাবে। কিন্তু ইবাদতের প্রশ্নে এটি ছিল তাওহিদের মূলে আঘাত। তখনই আল্লাহ এই সূরা নাজিল করে মহানবী (সা.)-কে ঘোষণা দিতে বলেন, তোমাদের উপাস্যের ইবাদত আমি করি না, করবও না।
বর্ণনাগুলোর সনদে কিছু দুর্বলতা থাকলেও তাফসিরকারকেরা মোটামুটি একমত যে, এ ধরনের আপস প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটেই সূরাটি নাজিল হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
একই কথা দুবার কেন
সূরাটি পড়লে মনে হয়, দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম আয়াতে একই কথা ফিরে ফিরে এসেছে। তাফসিরকারকেরা এর কয়েকটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ: প্রথম জোড়া আয়াত বর্তমানের কথা বলছে, আমি এখন তোমাদের উপাস্যের ইবাদত করি না। দ্বিতীয় জোড়া ভবিষ্যতের, ভবিষ্যতেও করব না। অর্থাৎ এক বছর পরের পালার প্রস্তাবও নাকচ।
জোর দেওয়া: আরবি ভাষায় কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত দৃঢ়তা বোঝাতে পুনরাবৃত্তি করা হয়। আপসের প্রস্তাব বারবার এসেছিল, তাই উত্তরও দ্ব্যর্থহীন ও পুনরাবৃত্ত।
বিজ্ঞাপন
ইবাদতের ধরন: কেউ কেউ বলেছেন, এক জোড়া আয়াতে উপাস্যের পার্থক্য, আরেক জোড়ায় ইবাদতের পদ্ধতির পার্থক্য বোঝানো হয়েছে। তাওহিদপন্থীর ইবাদত আর মূর্তিপূজার পদ্ধতি এক হতে পারে না।
সূরা কাফিরুনের ফজিলত
ঘুমের আগে শিরক থেকে মুক্তির ঘোষণা: আবু দাউদ ও তিরমিজিতে নাওফাল আল-আশজায়ি (রা.)-এর বর্ণনায় আছে, মহানবী (সা.) তাঁকে বলেছিলেন, ঘুমানোর সময় "কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফিরুন" পড়ো, তারপর এটি শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ো, কারণ এটি শিরক থেকে মুক্তির ঘোষণা।
ফজর ও মাগরিবের সুন্নতে: সহিহ মুসলিমে আছে, মহানবী (সা.) ফজরের দুই রাকাত সুন্নতে সূরা কাফিরুন ও সূরা ইখলাস পড়তেন। তিরমিজির বর্ণনায় মাগরিবের পরের দুই রাকাত সুন্নতেও এই দুই সূরা পড়ার কথা এসেছে।
বিজ্ঞাপন
বিতরে: আবু দাউদ, তিরমিজি ও নাসাঈর বর্ণনায় আছে, বিতরের দ্বিতীয় রাকাতে তিনি সূরা কাফিরুন পড়তেন।
কোরআনের এক-চতুর্থাংশ: তিরমিজির এক বর্ণনায় সূরা কাফিরুনকে কোরআনের এক-চতুর্থাংশের সমান বলা হয়েছে। এর সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের আলোচনা আছে। যেসব আলেম গ্রহণ করেছেন, তাঁরা ব্যাখ্যা দেন, কোরআনের বড় একটি অংশ তাওহিদ ও শিরক বর্জনের আলোচনা, আর এই সূরা তার সারকথা।
সূরা কাফিরুন ও সূরা ইখলাসের জুটি
হাদিসে বারবার দেখা যায়, মহানবী (সা.) সূরা কাফিরুন ও সূরা ইখলাস একসঙ্গে পড়তেন: ফজরের সুন্নতে, মাগরিবের সুন্নতে, বিতরে। এর পেছনে আলেমরা সুন্দর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
তাওহিদের দুটি দিক আছে। একটি হলো বিশ্বাসের দিক, আল্লাহ কে, কেমন, তাঁর গুণাবলি কী। সূরা ইখলাস এই দিকের ঘোষণা: তিনি এক, অমুখাপেক্ষী, তাঁর জনক-সন্তান বা সমকক্ষ নেই। আরেকটি হলো কাজের দিক, অর্থাৎ ইবাদত কার জন্য। সূরা কাফিরুন এই দিকের ঘোষণা: আমার ইবাদত কেবল আল্লাহর জন্য, অন্য কারও জন্য নয়।
এ কারণে দুই সূরাকে একসঙ্গে "ইখলাসের দুই সূরা" বলা হয়। দিনের শুরুতে ফজরের সুন্নতে আর দিনের শেষে মাগরিবের সুন্নত ও বিতরে এ দুটি পড়ার মধ্য দিয়ে একজন মুমিন যেন প্রতিদিন নিজের তাওহিদের অঙ্গীকার নবায়ন করেন। চাইলে আপনিও সপ্তাহে কয়েক দিন এ দুই সূরা দিয়ে সুন্নত নামাজ পড়ার অভ্যাস করতে পারেন।
"লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়া দিন": সঠিক বোঝাপড়া
শেষ আয়াতটি প্রায়ই উদ্ধৃত হয়, কখনো ভুল অর্থেও। এর মানে এই নয় যে সব বিশ্বাসই সমান সত্য, কিংবা ইসলামের দাওয়াত দেওয়া যাবে না। আয়াতটি বলছে, বিশ্বাস ও ইবাদতের প্রশ্নে আমার পথ আলাদা, এখানে কোনো মিশ্রণ চলবে না।
বিজ্ঞাপন
আবার এর মানে অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি অবিচার বা দুর্ব্যবহারও নয়। সূরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। সূরা মুমতাহিনার ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যারা দ্বীনের কারণে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ নিষেধ করেন না।
অর্থাৎ বিশ্বাসে দৃঢ়তা আর আচরণে ন্যায় ও সৌজন্য, দুটি একসঙ্গে চলে। প্রতিবেশী, সহকর্মী বা সহপাঠী ভিন্ন ধর্মের হলে তাঁর সঙ্গে সুসম্পর্ক, লেনদেনে সততা ও বিপদে সহযোগিতা ইসলামেরই শিক্ষা। কিন্তু অন্য ধর্মের উপাসনায় অংশ নেওয়া বা ইবাদতের আচার মিশিয়ে ফেলা এই সূরার শিক্ষার পরিপন্থী।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সূরা কাফিরুন ঘুমের আগে কীভাবে পড়ব?
বিজ্ঞাপন
বিছানায় শুয়ে বা শোয়ার আগে একবার পড়ে নিন। হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী সূরাটি শেষ করে আর কথাবার্তা না বলে ঘুমিয়ে পড়া উত্তম।
ফজরের সুন্নতে কি সব সময় এই সূরা পড়তে হবে?
না, এটি সুন্নাহসম্মত পছন্দ, বাধ্যতামূলক নয়। মাঝেমধ্যে এই দুই সূরা পড়লে সুন্নাহর অনুসরণ হয়, অন্য সূরা পড়লেও নামাজ শুদ্ধ।
সূরা কাফিরুন কি মক্কি সূরা?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ, অধিকাংশ আলেমের মতে এটি মক্কায় অবতীর্ণ।
এই সূরা পড়ে কি অমুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ শেখানো হয়?
না। সূরাটি ইবাদতের প্রশ্নে আপসহীনতার ঘোষণা, মানুষের প্রতি বিদ্বেষের নয়। কোরআন অন্যত্র ন্যায়বিচার ও সদাচরণের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে।