সূরা ফালাক বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: অনিষ্ট থেকে আশ্রয়ের সূরা
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
অন্ধকার রাতে একা পথ চলতে ভয় লাগে, কারও চোখে হিংসার ঝিলিক দেখলে অস্বস্তি হয়, অজানা অনিষ্টের আশঙ্কা মনে চেপে বসে। এসব ভয়ের মুহূর্তে কোরআন মানুষকে একটি ছোট সূরা দিয়েছে, যার প্রতিটি আয়াত শুরু হয় আশ্রয় চাওয়া দিয়ে। সেটি সূরা ফালাক।
বিজ্ঞাপন
সূরা ফালাক কোরআনের ১১৩তম সূরা, আয়াত পাঁচটি। এটি মক্কায় না মদিনায় নাজিল হয়েছে, এ নিয়ে আলেমদের মতভেদ আছে। "ফালাক" অর্থ ভোর, রাতের অন্ধকার চিরে আলো বের হয়ে আসা। পরের সূরা নাসের সঙ্গে মিলিয়ে এ দুটিকে বলা হয় "মুআওয়িজাতাইন", অর্থাৎ আশ্রয় প্রার্থনার দুই সূরা।
সহিহ মুসলিমে হজরত উকবা ইবনে আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, তুমি কি দেখোনি, আজ রাতে এমন কিছু আয়াত নাজিল হয়েছে, যার মতো আর কখনো দেখা যায়নি: "কুল আউজু বিরাব্বিল ফালাক" ও "কুল আউজু বিরাব্বিন নাস"।
সূরা ফালাক আরবি
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ مِن شَرِّ مَا خَلَقَ وَمِن شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ وَمِن شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
১. কুল আউজু বিরাব্বিল ফালাক: বলুন, আমি আশ্রয় চাই ভোরের রবের কাছে।
২. মিন শাররি মা খালাক: তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে।
৩. ওয়া মিন শাররি গাসিকিন ইজা ওয়াকাব: আর অন্ধকার রাতের অনিষ্ট থেকে, যখন তা ছেয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
৪. ওয়া মিন শাররিন নাফফাসাতি ফিল উকাদ: আর গিঁটে ফুঁ দেওয়া নারীদের (জাদুকরদের) অনিষ্ট থেকে।
৫. ওয়া মিন শাররি হাসিদিন ইজা হাসাদ: আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।
"আউজু" শব্দের "আইন" ও "জাল" এবং "হাসিদিন" শব্দের "হা" বাংলায় ঠিকমতো ধরা পড়ে না। শিশুদের শেখানোর সময় শুদ্ধ তিলাওয়াত শুনিয়ে নিন।
কেন "ভোরের রব"
বিজ্ঞাপন
প্রথম আয়াতে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে "রাব্বুল ফালাক", অর্থাৎ ভোরের রবের কাছে। তাফসিরকারকেরা এর সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে: রাতের অন্ধকার যত গভীরই হোক, প্রতিদিন নিয়ম করে তা চিরে আলো বেরিয়ে আসে, আর এটি ঘটে আল্লাহর নির্দেশে। যিনি প্রতিদিন অন্ধকারকে আলোয় বদলে দেন, বিপদ, ভয় ও অনিষ্টের অন্ধকার থেকে বের করে আনার ক্ষমতাও তাঁরই। কেউ কেউ "ফালাক" শব্দের অর্থ আরও বিস্তৃত করে বলেছেন, বীজ ফেটে চারা বের হওয়া, মাটি ফেটে ঝরনা বের হওয়া, সবই ফালাক। অর্থাৎ যিনি আবদ্ধ জিনিসকে মুক্ত করেন, তাঁর কাছেই মুক্তি চাওয়া।
চার অনিষ্টের ব্যাখ্যা
সৃষ্টির অনিষ্ট: প্রথমে সাধারণভাবে সব সৃষ্টির ক্ষতি থেকে আশ্রয়। মানুষ, জিন, হিংস্র প্রাণী, বিষাক্ত পোকা, রোগজীবাণু, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবই এর মধ্যে পড়ে। লক্ষ করার মতো, অনিষ্ট সৃষ্টির ভেতরে, স্রষ্টার দিকে তা সম্পর্কিত করা হয়নি।
রাতের অন্ধকার: "গাসিক" অর্থ অন্ধকার রাত। রাতে অপরাধ বাড়ে, হিংস্র প্রাণী বের হয়, মানুষ অসহায় বোধ করে। আবার ভোরের রবের কাছে অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার মধ্যে একটি আশার বার্তাও আছে: যিনি প্রতিদিন অন্ধকার চিরে ভোর আনেন, তিনিই বিপদের অন্ধকার দূর করতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
জাদুর অনিষ্ট: গিঁটে ফুঁ দেওয়া ছিল আরবের জাদুকরদের পরিচিত পদ্ধতি। জাদুর অস্তিত্ব কোরআন স্বীকার করে, সূরা বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতেও এর আলোচনা আছে, তবে এটাও বলা হয়েছে যে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া জাদু কারও ক্ষতি করতে পারে না।
হিংসার অনিষ্ট: হিংসা হলো অন্যের নেয়ামত দেখে তা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কামনা। আয়াতে বলা হয়েছে "যখন সে হিংসা করে", অর্থাৎ হিংসা যখন মনের ভেতর থেকে কাজে বা দৃষ্টিতে প্রকাশ পায়। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে আছে, বদনজর সত্য। আলেমরা বদনজরকে হিংসার একটি রূপ হিসেবে দেখেছেন।
নাজিলের প্রেক্ষাপট
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, মদিনায় লাবিদ ইবনে আসাম নামের এক ব্যক্তি মহানবী (সা.)-এর ওপর জাদু করেছিল, যার প্রভাবে তিনি কিছু সময় অস্বস্তিতে ছিলেন। পরে আল্লাহ তাঁকে বিষয়টি জানিয়ে দেন এবং তিনি সুস্থ হন। তাফসিরের কিছু বর্ণনায় আছে, এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে সূরা ফালাক ও নাস নাজিল হয় এবং এর আয়াত পড়ে জাদুর গিঁট খোলা হয়। এ কারণে অনেক আলেম এ দুই সূরাকে মাদানি বলেছেন। অন্যরা মক্কি বলেছেন। মূল ঘটনা সহিহ হাদিসে প্রমাণিত, আর নাজিলের সময় নিয়ে মতভেদ থাকলেও সূরার শিক্ষায় কোনো পার্থক্য নেই।
বিজ্ঞাপন
সূরা ফালাকের ফজিলত ও সুন্নাহসম্মত আমল
অন্য সব আশ্রয়বাক্যের চেয়ে উত্তম: তিরমিজির হাদিসে আছে, মহানবী (সা.) জিন ও মানুষের বদনজর থেকে বিভিন্নভাবে আশ্রয় চাইতেন। মুআওয়িজাতাইন নাজিল হওয়ার পর তিনি এ দুটি গ্রহণ করেন এবং বাকিগুলো ছেড়ে দেন।
প্রতি নামাজের পর: আবু দাউদ, তিরমিজি ও নাসাঈর বর্ণনায় আছে, মহানবী (সা.) উকবা ইবনে আমির (রা.)-কে প্রতিটি নামাজের পর মুআওয়িজাত পড়তে বলেছিলেন।
সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগে: সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস সকালে-সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়া (আবু দাউদ, তিরমিজি) এবং ঘুমের আগে তিনবার পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে বুলিয়ে নেওয়া (বুখারি) সুন্নাহ।
বিজ্ঞাপন
অসুস্থতায়: বুখারি ও মুসলিমে হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) অসুস্থ হলে মুআওয়িজাত পড়ে নিজের গায়ে ফুঁ দিতেন। শেষ অসুস্থতায় যখন তিনি নিজে পারতেন না, তখন হজরত আয়েশা (রা.) এগুলো পড়ে মহানবী (সা.)-এর হাত দিয়েই তাঁর শরীরে বুলিয়ে দিতেন।
বদনজর ও হিংসা থেকে বাঁচার বাস্তব পথ
১. নিজে হিংসা থেকে দূরে থাকা: অন্যের সুখ দেখে "মাশাআল্লাহ" বা "বারাকাল্লাহ" বলুন। মুয়াত্তা ইমাম মালেকের বর্ণনায় আছে, কারও কিছু ভালো লাগলে বরকতের দোয়া করতে বলা হয়েছে।
২. অহেতুক প্রদর্শন না করা: নতুন গাড়ি, বাড়ি, গয়না বা সন্তানের সাফল্য সামাজিক মাধ্যমে বারবার প্রদর্শন না করাও একধরনের সাবধানতা।
বিজ্ঞাপন
৩. নিয়মিত আমল: সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগের তিন কুল নিয়মিত পড়া।
৪. কুসংস্কার এড়ানো: কালো সুতা বাঁধা, কপালে কালি দেওয়া বা অজ্ঞাত কিছু লেখা তাবিজের ওপর নির্ভর করা ইসলামি শিক্ষা নয়। কোরআন ও মাসনুন দোয়াই নিরাপদ পথ।
৫. চিকিৎসা নেওয়া: শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতাকে কেবল বদনজর ভেবে চিকিৎসা ফেলে রাখা ঠিক নয়। দোয়া ও চিকিৎসা দুটোই চালিয়ে যান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
সূরা ফালাক ও নাসকে একসঙ্গে কেন পড়া হয়?
দুটিই আশ্রয় প্রার্থনার সূরা এবং হাদিসে প্রায় সব সময় একসঙ্গে উল্লেখ হয়েছে। সূরা ফালাকে বাইরের অনিষ্ট, আর সূরা নাসে ভেতরের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।
শিশুর গায়ে সূরা পড়ে ফুঁ দেওয়া কি সুন্নাহ?
হ্যাঁ। মহানবী (সা.) হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য আশ্রয় চাইতেন বলে বুখারিতে আছে। সূরা ফালাক-নাস পড়ে শিশুর গায়ে ফুঁ দেওয়া বৈধ ও উত্তম।
বিজ্ঞাপন
ঋতুস্রাবের সময় সুরক্ষার জন্য সূরা ফালাক পড়া যাবে?
হানাফি মতে এ সময় তিলাওয়াতের নিয়তে কোরআন পড়া যায় না। তবে অনেক আলেম বলেছেন, দোয়া ও আশ্রয় প্রার্থনার নিয়তে এমন আয়াত পড়া যায়, যেগুলোর বিষয়বস্তুই দোয়া। মতভেদ থাকায় নিজের অনুসৃত আলেমের পরামর্শ নিন। সন্দেহ এড়াতে চাইলে এ সময় মাসনুন আশ্রয়ের দোয়া পড়তে পারেন, যেমন সহিহ মুসলিমে বর্ণিত "আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক", অর্থাৎ আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।
সূরা ফালাক কয়বার পড়তে হয়?
সকাল-সন্ধ্যায় ও ঘুমের আগে তিনবার করে, আর প্রতি ফরজ নামাজের পর একবার পড়ার কথা হাদিসে এসেছে।