সূরা ইখলাস বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
নামাজ শিখতে গিয়ে শিশুরা সূরা ফাতিহার পর যে সূরাটি সবার আগে মুখস্থ করে, সেটি সাধারণত "কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ"। মাত্র চার আয়াত, পনেরো সেকেন্ডেই পড়া হয়ে যায়। অথচ মহানবী (সা.) এই ছোট্ট সূরাকে কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান বলেছেন।
বিজ্ঞাপন
সূরা ইখলাস কোরআনের ১১২তম সূরা, ৩০তম পারায়। অধিকাংশ আলেমের মতে মক্কায় অবতীর্ণ। ইখলাস শব্দের অর্থ বিশুদ্ধতা বা একনিষ্ঠতা। সূরার কোথাও এই শব্দ নেই, কিন্তু পুরো সূরা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসকে সব ধরনের শিরক ও ভ্রান্ত ধারণা থেকে বিশুদ্ধ করে, তাই এই নাম।
চার আয়াতে চারটি মৌলিক সত্য: আল্লাহ এক; তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী; তাঁর কোনো সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন; আর তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।
সূরা ইখলাস আরবি
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
১. কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ: বলুন, তিনি আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়।
২. আল্লাহুস সামাদ: আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী।
৩. লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ: তিনি কাউকে জন্ম দেননি, তাঁকেও কেউ জন্ম দেয়নি।
বিজ্ঞাপন
৪. ওয়ালাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ: আর তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।
উচ্চারণে "আহাদ" শব্দের শুরুর "হা" গলার গভীর থেকে আসে, আর "সামাদ" শব্দের "সোয়াদ" মোটা উচ্চারণের। বাংলায় এগুলো আলাদা করে লেখা যায় না, তাই শিশুকে শেখানোর সময় কোনো কারির তিলাওয়াত শুনিয়ে নিন। প্রথম আয়াত শেষে "আহাদ" এবং দ্বিতীয় আয়াতের "আল্লাহুস" মিলিয়ে টানা পড়লে "আহাদুনিল্লাহুস সামাদ" উচ্চারণ হয়, এটি তাজবিদের নিয়ম।
নাজিলের প্রেক্ষাপট
তিরমিজিতে বর্ণিত হয়েছে, মক্কার মুশরিকরা মহানবী (সা.)-কে বলেছিল, আপনার রবের বংশপরিচয় আমাদের বলুন। তখন এই সূরা নাজিল হয়। অন্য কিছু বর্ণনায় ইহুদি বা খ্রিস্টানদের প্রশ্নের কথাও আছে। তাফসিরকারকেরা বলেন, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে একই ধরনের প্রশ্ন এসেছে, আর সবার উত্তর এই চার আয়াত।
বিজ্ঞাপন
সেই সময়ের আরব সমাজে দেবদেবীর বংশতালিকা ছিল, ফেরেশতাদের আল্লাহর কন্যা বলা হতো। অন্য ধর্মেও স্রষ্টার সন্তান বা স্রষ্টার সমকক্ষ সত্তার ধারণা ছিল। সূরা ইখলাস এক বাক্যে সব ধারণার জবাব দিয়েছে।
লক্ষ করার মতো বিষয়, প্রশ্নকারীরা আল্লাহর বংশপরিচয় জানতে চেয়েছিল, অথচ উত্তরে আল্লাহর কোনো আকৃতি, রং বা উপাদানের বর্ণনা দেওয়া হয়নি। দেওয়া হয়েছে তাঁর গুণ। কারণ সৃষ্টিকে দিয়ে স্রষ্টাকে মাপা যায় না। সূরা শুরার ১১ নম্বর আয়াতেও একই কথা: কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। আল্লাহকে চেনার পথ তাই তাঁর নাম ও গুণাবলি, কল্পনা নয়।
"সামাদ" শব্দের গভীরতা
দ্বিতীয় আয়াতের "সামাদ" শব্দটি নিয়ে তাফসিরকারকেরা অনেক কথা বলেছেন। এর কয়েকটি অর্থ:
বিজ্ঞাপন
যাঁর কাছে সবাই প্রয়োজনে ছুটে যায়: মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা, সবাই অস্তিত্ব ও রিজিকের জন্য তাঁর ওপর নির্ভরশীল।
যিনি কারও মুখাপেক্ষী নন: তাঁর খাবার, ঘুম, সাহায্যকারী বা উত্তরাধিকারী কিছুরই প্রয়োজন নেই।
যিনি পূর্ণাঙ্গ: যাঁর গুণাবলিতে কোনো ঘাটতি নেই।
এই এক শব্দ মানুষকে শেখায়, বিপদে-প্রয়োজনে প্রকৃত আশ্রয় কোথায়। যিনি নিজেই সবার আশ্রয়, তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কারও কাছে অলৌকিক সাহায্য চাওয়ার সুযোগ নেই।
বিজ্ঞাপন
কেন কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান
সহিহ বুখারিতে হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাতে বারবার শুধু সূরা ইখলাস পড়ছিলেন। সকালে আরেকজন বিষয়টি মহানবী (সা.)-কে জানালেন, যেন এটি কম মনে হচ্ছিল। মহানবী (সা.) বললেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ, এটি কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান। সহিহ মুসলিমেও একই অর্থের হাদিস আছে।
আলেমরা এর ব্যাখ্যায় বলেন, কোরআনের আলোচনা মোটা দাগে তিন ভাগে ভাগ করা যায়: আল্লাহর পরিচয় ও তাওহিদ, বিধিবিধান, এবং অতীতের ঘটনা ও আখিরাতের সংবাদ। সূরা ইখলাস প্রথম ভাগের পূর্ণ সারসংক্ষেপ।
তবে একটি ভুল ধারণা সংশোধন জরুরি। তিনবার সূরা ইখলাস পড়লে সওয়াবের দিক থেকে মর্যাদা বোঝানো হয়েছে, এর মানে এই নয় যে পুরো কোরআন খতমের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল। আলেমরা স্পষ্ট বলেছেন, সূরা ফাতিহার বদলে নামাজে তিনবার ইখলাস পড়লে চলবে না, কোরআন খতমের বদলেও নয়।
বিজ্ঞাপন
সূরা ইখলাসের আরও ফজিলত ও আমল
আল্লাহর ভালোবাসা: বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত, এক সাহাবি নামাজে প্রতিটি কিরাত শেষ করতেন সূরা ইখলাস দিয়ে। কারণ জানতে চাইলে বললেন, এতে দয়াময়ের গুণাবলি আছে, তাই আমি এটি পড়তে ভালোবাসি। মহানবী (সা.) বললেন, তাকে জানিয়ে দাও, আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন।
ঘুমের আগে: সহিহ বুখারিতে হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) প্রতি রাতে বিছানায় যাওয়ার সময় দুই হাত একত্র করে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে তাতে ফুঁ দিতেন, তারপর মাথা, মুখ ও শরীরের সামনের অংশ থেকে শুরু করে যতটুকু সম্ভব হাত বুলিয়ে নিতেন। এভাবে তিনবার করতেন।
সকাল-সন্ধ্যা: আবু দাউদ ও তিরমিজির হাদিসে আছে, সকাল ও সন্ধ্যায় সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস তিনবার করে পড়লে তা সবকিছুর জন্য যথেষ্ট হবে।
বিজ্ঞাপন
সুন্নত নামাজে: ফজর ও মাগরিবের সুন্নতের দ্বিতীয় রাকাতে এবং বিতরের শেষ রাকাতে সূরা ইখলাস পড়া মহানবী (সা.)-এর আমল ছিল।
কোনো কোনো বইয়ে দশবার বা নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়লে বিশেষ পুরস্কারের কথা পাওয়া যায়। এসবের কিছু বর্ণনার সনদ দুর্বল, তাই সহিহ হাদিসে যা আছে, তার ওপর নির্ভর করাই ভালো।
দৈনন্দিন জীবনে সূরা ইখলাসের শিক্ষা
চার আয়াতের এই সূরা কেবল আকিদার পাঠ নয়, প্রতিদিনের আচরণেও এর প্রভাব আছে।
বিজ্ঞাপন
ভরসার ঠিকানা এক: যিনি "সামাদ", সবার আশ্রয়, তাঁর ওপর ভরসা থাকলে চাকরি হারানো, অসুস্থতা বা আর্থিক সংকটে মানুষ ভেঙে পড়ে না। মানুষের সাহায্য চাওয়া যায়, কিন্তু চূড়ান্ত নির্ভরতা থাকে আল্লাহর ওপর।
মানুষকে দেবতা না বানানো: "তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই" এই বিশ্বাস কোনো পীর, নেতা বা ক্ষমতাবান মানুষকে অলৌকিক ক্ষমতার মালিক ভাবা থেকে রক্ষা করে। সম্মান করা আর আল্লাহর আসনে বসানো এক নয়।
ইবাদতে একনিষ্ঠতা: সূরার নাম ইখলাস, যার আরেক অর্থ কাজ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা। নামাজ, দান বা সমাজসেবা লোক দেখানোর জন্য হলে তা ইখলাসের পরিপন্থী।
ভয়ের মুক্তি: যাঁর কোনো সন্তান, অংশীদার বা প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, তাঁর সিদ্ধান্ত কেউ বদলাতে পারে না। তাই তাঁকে খুশি রাখলে আর কাউকে ভয় পাওয়ার কারণ থাকে না। এই উপলব্ধিই মুমিনকে সাহসী করে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
এক রাকাতে কি দুবার সূরা ইখলাস পড়া যায়?
নফল নামাজে একই সূরা বারবার পড়া যায়, সাহাবির ঘটনাও এর প্রমাণ। ফরজ নামাজে এক রাকাতে একই সূরা দুবার না পড়াই হানাফি মতে উত্তম।
মৃতের জন্য কি সূরা ইখলাস পড়া যায়?
বিজ্ঞাপন
হানাফি আলেমদের মতে কোরআন তিলাওয়াত করে মৃতের জন্য সওয়াব পাঠানোর দোয়া করা বৈধ। সূরা ইখলাসও পড়া যায়।
সূরা ইখলাসের আরেক নাম কী?
একে সূরা তাওহিদ এবং প্রথম আয়াতের শব্দে "কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ" নামেও ডাকা হয়।
শিশুকে সূরা ইখলাস কীভাবে শেখাব?
বিজ্ঞাপন
প্রতিদিন ঘুমের আগে নিজে তিনবার পড়ে শোনান এবং শিশুকে সঙ্গে বলতে দিন। পাশাপাশি সহজ ভাষায় অর্থ বলুন: আল্লাহ এক, তাঁর কাউকে দরকার নেই, সবার তাঁকে দরকার।