কম খরচে বিদেশ ভ্রমণ: বাংলাদেশিদের জন্য সাশ্রয়ী দেশগুলোর তালিকা
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
প্রথম বিদেশ ভ্রমণের কথা ভাবলেই অনেকে ধরে নেন, এর জন্য লাখ টাকা লাগবে। বাস্তবে বাংলাদেশের আশপাশে এমন কয়েকটি দেশ আছে, যেখানে কক্সবাজারে এক সপ্তাহ বিলাসী হোটেলে থাকার খরচের কাছাকাছি টাকায় ঘুরে আসা যায়। শর্ত একটাই, ঠিক দেশ বাছাই আর আগেভাগে পরিকল্পনা।
বিজ্ঞাপন
কম খরচে বিদেশ ভ্রমণের তালিকায় সবচেয়ে ওপরে থাকে প্রতিবেশী দেশগুলো: নেপাল, ভুটান আর ভারত, যেখানে সড়কপথেও যাওয়া যায়। এরপর আসে শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ, আর একটু বেশি বাজেটে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম। খরচ কমানোর মূল জায়গা তিনটি: বিমানভাড়া, থাকা আর দেশের ভেতরের যাতায়াত।
ভিসার নিয়ম দেশভেদে এবং সময়ভেদে বদলায়। নিচের তথ্য সাধারণ ধারণা দেওয়ার জন্য। আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস বা সরকারি ভিসা ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ নিয়ম মিলিয়ে নিন।
ভিসার ধরন বুঝে নিন আগে
১. অন অ্যারাইভাল ভিসা: গন্তব্যে নেমে বিমানবন্দর বা সীমান্তেই ভিসা দেওয়া হয়। কাগজপত্র ঠিক থাকলে আগে কিছু করতে হয় না, তবে শর্ত পূরণ না হলে প্রবেশ নাকচও হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
২. ই-ভিসা বা ইলেকট্রনিক অনুমোদন: অনলাইনে আবেদন করে ইমেইলে অনুমোদন পাওয়া যায়, পাসপোর্ট জমা দিতে হয় না।
৩. স্টিকার ভিসা: দূতাবাস বা ভিসা আবেদন কেন্দ্রে পাসপোর্ট জমা দিয়ে নিতে হয়, সময় বেশি লাগে।
অন অ্যারাইভাল বা ই-ভিসা থাকলে খরচ ও ঝামেলা দুটোই কমে। তাই বাজেট ভ্রমণে এই দেশগুলো বেশি জনপ্রিয়।
সাশ্রয়ী দেশগুলোর তালিকা
বিজ্ঞাপন
১. নেপাল: সার্কভুক্ত দেশের নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশিরা বছরে প্রথম সফরে বিনা ফিতে অন অ্যারাইভাল ভিসা পান। ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু সোয়া এক ঘণ্টার ফ্লাইট, ভারতের ভিসা থাকলে সড়কপথেও যাওয়া যায়। কাঠমান্ডু ও পোখারার বাজেট গেস্টহাউস আর স্থানীয় খাবার সস্তা। এক সপ্তাহের সফরে আকাশপথে জনপ্রতি আনুমানিক ৪৫০০০ থেকে ৭০০০০ টাকা।
২. ভুটান: বাংলাদেশিরা অনলাইনে বা প্রবেশের সময় ভিসা নিতে পারেন। ভুটান পর্যটকদের কাছ থেকে টেকসই উন্নয়ন ফি নেয়, যা বাংলাদেশিদের জন্য একটি নির্দিষ্ট কোটা পর্যন্ত অনেক কম হারে নির্ধারিত হয়েছে। সড়কপথে বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা হয়ে গেলে খরচ কমে, তবে ভারতের ভিসা লাগে।
৩. ভারত: দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশিদের পর্যটন ভিসা আবার চালু হয়েছে, ভিসা আবেদন কেন্দ্রের মাধ্যমে স্টিকার ভিসা নিতে হয়। বাসে বা ট্রেনে কলকাতা, উত্তরবঙ্গ দিয়ে দার্জিলিং, সিলেটের তামাবিল দিয়ে শিলং যাওয়া যায়। যাতায়াত ও থাকার খরচ তুলনামূলক কম।
৪. শ্রীলঙ্কা: অনলাইনে ইলেকট্রনিক ভ্রমণ অনুমোদন নিয়ে যেতে হয়। সমুদ্রসৈকত, চা-বাগান, প্রাচীন নগরী মিলিয়ে বৈচিত্র্য অনেক। ঢাকা থেকে কলম্বোর ফ্লাইটের দাম মৌসুমভেদে ওঠানামা করে, তবে দেশের ভেতরে ট্রেন ও বাস সস্তা।
বিজ্ঞাপন
৫. মালদ্বীপ: সব দেশের পর্যটকের মতো বাংলাদেশিরাও শর্তসাপেক্ষে ত্রিশ দিনের অন অ্যারাইভাল ভিসা পান। রিসোর্ট ব্যয়বহুল, কিন্তু মাফুশি বা থুলুসধুর মতো স্থানীয় দ্বীপের গেস্টহাউস আর সরকারি ফেরি ব্যবহার করলে খরচ নাগালে রাখা যায়।
৬. থাইল্যান্ড: বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা লাগে, সাধারণত অনলাইন ই-ভিসা। ব্যাংকক, পাতায়া, ফুকেটে বাজেট হোটেল ও স্ট্রিট ফুড সস্তা। বিমানভাড়া নির্ভর করে কত আগে কাটছেন তার ওপর।
৭. মালয়েশিয়া: অনলাইনে ই-ভিসার সুযোগ আছে। কুয়ালালামপুরে গণপরিবহন সহজ, বাজেট হোটেল প্রচুর। লংকাউই বা পেনাং যোগ করলে খরচ বাড়ে।
৮. ভিয়েতনাম: সব দেশের নাগরিকের জন্য অনলাইন ই-ভিসার ব্যবস্থা চালু আছে। খাবার ও থাকার খরচ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে কম। তবে ঢাকা থেকে সাধারণত সংযোগ ফ্লাইটে যেতে হয়, তাই টিকিট আগে কাটা জরুরি।
বিজ্ঞাপন
বিমানভাড়ায় সাশ্রয়ের কৌশল
১. আগেভাগে টিকিট: দুই-তিন মাস আগে কাটলে সাধারণত দাম কম থাকে।
২. সপ্তাহের মাঝের দিন: মঙ্গল-বুধবারের ফ্লাইট অনেক সময় সস্তা।
৩. ছুটির মৌসুম এড়ানো: ঈদ, পূজা, ডিসেম্বরের ছুটিতে ভাড়া অনেক বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
৪. ব্যাগেজ হিসাব: সস্তা টিকিটে ব্যাগেজ কম থাকে। পরে ব্যাগেজ কিনতে হলে মোট খরচ বেড়ে যায়, তাই হালকা ব্যাগে ভ্রমণ করুন।
৫. সড়কপথের সুযোগ: নেপাল, ভুটান, ভারতের ক্ষেত্রে সড়কপথ সময় বেশি নিলেও খরচ অনেক কমায়।
দেশ বাছাইয়ের সময় যে প্রশ্নগুলো করবেন
শুধু খরচ দেখে দেশ বাছাই করলে অনেক সময় হতাশ হতে হয়। নিজের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখুন। হাতে কত দিন ছুটি আছে? মাত্র চার-পাঁচ দিন থাকলে দীর্ঘ সংযোগ ফ্লাইটের দেশ বাদ দিন, কাছের গন্তব্য বেছে নিন। কী দেখতে চান, পাহাড়, সমুদ্র, শহর নাকি ইতিহাস? নেপাল ও ভুটান পাহাড়ের জন্য, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা সমুদ্রের জন্য, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া শহর আর কেনাকাটার জন্য বেশি পরিচিত।
বিজ্ঞাপন
কার সঙ্গে যাচ্ছেন, সেটাও বিবেচনায় রাখুন। বয়স্ক বাবা-মা থাকলে লম্বা সড়কযাত্রা বা খাড়া পাহাড়ি পথ কষ্টকর, তখন সরাসরি ফ্লাইটের গন্তব্য ভালো। বন্ধুদের দলে গেলে সড়কপথ আর হোস্টেলে থাকার অভিজ্ঞতাই আনন্দের অংশ হয়ে ওঠে। আর বছরের কোন সময় যাচ্ছেন, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক জায়গায় বর্ষায় খরচ কমে, কিন্তু সমুদ্র উত্তাল থাকে। হিমালয়ের দেশগুলোতে শরৎ আর বসন্তই সেরা।
থাকা ও খাওয়ায় খরচ কমানো
হোস্টেল, গেস্টহাউস বা বাজেট হোটেলে থাকুন, আর দুই-তিনজনে কক্ষ ভাগ করুন। শহরের কেন্দ্রের কাছে থাকলে যাতায়াত খরচ কমে, যদিও কক্ষভাড়া কিছুটা বেশি হতে পারে। স্থানীয় খাবারের দোকান আর বাজার এলাকার খাবার পর্যটনকেন্দ্রের রেস্তোরাঁর চেয়ে অনেক সস্তা। গণপরিবহন ব্যবহার করুন, ট্যাক্সির বদলে মেট্রো, বাস বা শেয়ার গাড়ি।
বাংলাদেশ থেকে বের হওয়ার আগে যা জরুরি
বিজ্ঞাপন
১. পাসপোর্টের মেয়াদ: অন্তত ছয় মাস বাকি থাকতে হবে।
২. ডলার এনডোর্সমেন্ট: বৈদেশিক মুদ্রা কিনে পাসপোর্টে এনডোর্স করিয়ে নিন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মে ভ্রমণের জন্য বছরে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত মুদ্রা নেওয়া যায়। আন্তর্জাতিক ব্যবহারের জন্য সক্রিয় ডুয়াল কারেন্সি কার্ডও কাজে লাগে।
৩. ভ্রমণ কর: বিমানে গেলে সাধারণত টিকিটের দামের সঙ্গে যুক্ত থাকে, স্থলপথে আলাদা পরিশোধ করতে হয়।
৪. ফিরতি টিকিট ও হোটেল বুকিং: অন অ্যারাইভাল ভিসার দেশেও এগুলো দেখাতে বলা হয়।
বিজ্ঞাপন
৫. ভ্রমণ বিমা: চিকিৎসা খরচের ঝুঁকি কমাতে বিবেচনা করুন, কিছু দেশে এটি চাওয়া হতে পারে।
যে ফাঁদে পড়বেন না
খুব কম দামে ভিসা ও প্যাকেজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া অনিবন্ধিত এজেন্সি এড়িয়ে চলুন। ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে কাজ করার প্রস্তাব বিপজ্জনক এবং বেআইনি। পাসপোর্ট কারও হাতে দিয়ে দেবেন না। কোনো দেশে অন অ্যারাইভাল ভিসা আছে বলে শুনলেও যাত্রার আগে সরকারি উৎস থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন, কারণ নিয়ম প্রায়ই বদলায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
প্রথম বিদেশ ভ্রমণের জন্য কোন দেশ সবচেয়ে সহজ?
নেপাল সাধারণত সবচেয়ে সহজ, কারণ অন অ্যারাইভাল ভিসা পাওয়া যায়, ফ্লাইট ছোট এবং খরচ তুলনামূলক কম।
অন অ্যারাইভাল ভিসা মানেই কি নিশ্চিত প্রবেশ?
না। ফিরতি টিকিট, হোটেল বুকিং, পর্যাপ্ত অর্থ আর বৈধ পাসপোর্টের মতো শর্ত পূরণ না হলে প্রবেশ নাকচ হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
কত টাকা হলে প্রথম বিদেশ ভ্রমণ সম্ভব?
গন্তব্য ও দিনভেদে আলাদা। সড়কপথে ভারত বা দার্জিলিংয়ে কয়েক দিনের সফর বিশ হাজার টাকার আশপাশেও সম্ভব, আকাশপথে নেপালে এক সপ্তাহে তার কয়েক গুণ লাগতে পারে।
ভিসা ছাড়া কি কোনো দেশে যাওয়া যায়?
কিছু দেশ বাংলাদেশিদের ভিসামুক্ত বা অন অ্যারাইভাল সুবিধা দেয়, তবে তালিকা সময়ে সময়ে বদলায়। যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি উৎস থেকে নিশ্চিত হোন।