কম খরচে নেপাল ভ্রমণ: সড়ক ও আকাশপথে বাজেট ট্যুরের পরিকল্পনা
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
হিমালয় দেখতে ইউরোপ বা অনেক দূরে যাওয়ার দরকার নেই, ঢাকা থেকে সোয়া এক ঘণ্টার ফ্লাইটেই কাঠমান্ডু। আর বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য নেপালের দরজা তুলনামূলক সহজে খোলা: বিমানবন্দরে বা স্থলসীমান্তে নেমেই ভিসা মেলে, প্রথম সফরে সাধারণত ফি-ও লাগে না। এ কারণে বিদেশ ভ্রমণে বাজেট কম, এমন অনেকের প্রথম পছন্দ নেপাল।
বিজ্ঞাপন
কম খরচে নেপাল ভ্রমণের মূল হিসাব দুটি জায়গায়: যাতায়াত আর থাকা। আকাশপথে টিকিট আগেভাগে কাটলে খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে, আর ভারতের ভিসা থাকলে সড়কপথে আরও কম খরচে যাওয়া যায়। নেপালের ভেতরে লোকাল বা ট্যুরিস্ট বাস, কাঠমান্ডুর থামেল আর পোখারার লেকসাইডের বাজেট গেস্টহাউস এবং স্থানীয় খাবার বেছে নিলে দৈনিক খরচ বেশ কম রাখা যায়।
তবে নিয়ম বদলায়। ভিসার শর্ত, ফি আর ট্রেকিং অনুমতির নিয়ম যাত্রার আগে নেপালের অভিবাসন বিভাগ বা ঢাকার নেপাল দূতাবাস থেকে মিলিয়ে নিন।
ভিসা: বাংলাদেশিদের জন্য কী নিয়ম
নেপাল সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের, যার মধ্যে বাংলাদেশ আছে, এক ভিসা বছরে প্রথমবার সফরে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বিনা ফিতে ভিসা দেয়, যা সাধারণত ত্রিশ দিন পর্যন্ত বলা হয়। একই বছরে দ্বিতীয়বার গেলে নির্ধারিত ফি দিতে হয়।
বিজ্ঞাপন
যা লাগে: অন্তত ছয় মাস মেয়াদি পাসপোর্ট, পাসপোর্ট সাইজের ছবি, ফিরতি টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ের কপি, আর পর্যাপ্ত অর্থের প্রমাণ হিসেবে এনডোর্স করা ডলার। কাঠমান্ডুর বিমানবন্দরে অনলাইন বা কিয়স্কে আগমন ফরম পূরণ করতে হয়। অনেকে যাত্রার আগেই অনলাইনে ফরম পূরণ করে রাখেন, এতে লাইনে সময় বাঁচে।
আকাশপথে নেপাল
ঢাকা থেকে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশি ও নেপালি এয়ারলাইনসের সরাসরি ফ্লাইট চলে, সময় লাগে সোয়া এক ঘণ্টার মতো। আসা-যাওয়ার টিকিট সময় ও মৌসুমভেদে আনুমানিক ২৫০০০ থেকে ৪৫০০০ টাকা, আগে কাটলে কম, ছুটির মৌসুমে বেশি। বিমানে গেলে ভ্রমণ কর টিকিটের দামের সঙ্গেই যুক্ত থাকে।
টিকিট সস্তায় পেতে দুই-তিন মাস আগে বুকিং দিন, সপ্তাহের মাঝের দিনে যাত্রা খুঁজুন, আর ঈদ বা বড় ছুটির সময় এড়িয়ে চলুন। চেক-ইন ব্যাগেজের সীমা দেখে নিন, অনেক কম দামের টিকিটে ব্যাগেজ কম থাকে।
বিজ্ঞাপন
সড়কপথে নেপাল: ধাপে ধাপে
সড়কপথ সময়সাপেক্ষ, কিন্তু খরচ কম আর পথের অভিজ্ঞতা আলাদা। এর জন্য ভারতের ভিসা লাগবে, যাতে প্রবেশ ও বহির্গমনের স্থলবন্দর হিসেবে বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ী এবং নেপাল সীমান্তের পথ উল্লেখ থাকা জরুরি। কোন ধরনের ভারতীয় ভিসা লাগবে, তা আবেদনের সময় ভিসা কেন্দ্র থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।
১. ঢাকা থেকে বাংলাবান্ধা: রাতের বাসে বা পঞ্চগড়গামী ট্রেনে গিয়ে বাংলাবান্ধা।
২. বাংলাবান্ধা থেকে পানিট্যাঙ্কি: সীমান্ত পার হয়ে ফুলবাড়ী থেকে শিলিগুড়ি, তারপর শেয়ার গাড়িতে ভারত-নেপাল সীমান্তের পানিট্যাঙ্কি। শিলিগুড়ি থেকে প্রায় এক ঘণ্টা।
বিজ্ঞাপন
৩. কাকরভিটায় নেপালে প্রবেশ: মেচি নদীর সেতু পার হয়ে নেপালের কাকরভিটা। ভারতের বহির্গমন আর নেপালের প্রবেশ, দুই জায়গাতেই পাসপোর্টে সিল নিতে ভুলবেন না। কাকরভিটায় নেপালের অন অ্যারাইভাল ভিসা পাওয়া যায়।
৪. কাকরভিটা থেকে কাঠমান্ডু বা পোখারা: রাতের দূরপাল্লার বাসে কাঠমান্ডু যেতে চৌদ্দ-ষোলো ঘণ্টা লাগতে পারে। সময় বাঁচাতে চাইলে কাছের ভদ্রপুর বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে কাঠমান্ডু যাওয়া যায়, তবে খরচ বাড়ে।
এ পথে সব মিলিয়ে ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু পৌঁছাতে দুই দিনের কাছাকাছি লাগে। তাই ছুটি কম হলে বিমানই ভালো, আর সময় বেশি থাকলে সড়কপথে গিয়ে বিমানে ফেরা একটা ভালো সমঝোতা।
কোথায় ঘুরবেন, কীভাবে খরচ কম রাখবেন
বিজ্ঞাপন
১. কাঠমান্ডু: থামেলে বাজেট হোটেলের ছড়াছড়ি। স্বয়ম্ভূনাথ, বৌদ্ধনাথ স্তূপ, পশুপতিনাথ মন্দির, কাঠমান্ডু দরবার স্কয়ার ঘোরা যায়। ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোতে বিদেশিদের প্রবেশ ফি আছে, সার্ক নাগরিকদের জন্য অনেক জায়গায় কম হারে।
২. ভক্তপুর ও পাটন: পুরোনো নগরী, প্রবেশ ফি দিয়ে ঘোরা যায়। লোকাল বাসে গেলে যাতায়াত খরচ সামান্য।
৩. নগরকোট: কাঠমান্ডুর কাছের পাহাড়ি এলাকা, পরিষ্কার দিনে হিমালয়ের দৃশ্য।
৪. পোখারা: কাঠমান্ডু থেকে ট্যুরিস্ট বাসে সাত-আট ঘণ্টা। ফেওয়া লেক, সারাংকোট থেকে অন্নপূর্ণা পর্বতমালায় সূর্যোদয়, ডেভিস ফলস। লেকসাইডে বাজেট গেস্টহাউস প্রচুর।
বিজ্ঞাপন
৫. চিতওয়ান: জাতীয় উদ্যান, জঙ্গল সাফারি। খরচ তুলনামূলক বেশি, বাজেট টানাটানি হলে বাদ রাখা যায়।
ট্রেকিং করতে চাইলে মনে রাখুন, নেপালের বিভিন্ন সংরক্ষিত এলাকায় ট্রেকিংয়ের জন্য অনুমতিপত্র লাগে এবং অনেক রুটে বিদেশিদের জন্য লাইসেন্সধারী গাইড বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে খরচ বাড়ে, তাই আগে হিসাব করুন।
নেপাল ভ্রমণ খরচ বাংলাদেশ থেকে: নমুনা বাজেট
ছয় রাত সাত দিনের, কাঠমান্ডু ও পোখারা, আকাশপথে, জনপ্রতি আনুমানিক:
বিজ্ঞাপন
১. বিমান টিকিট আসা-যাওয়া: ২৫০০০ থেকে ৪৫০০০ টাকা।
২. থাকা, দুজনে এক কক্ষ, বাজেট হোটেল: রাতপ্রতি জনপ্রতি আনুমানিক ৮০০ থেকে ২০০০ নেপালি রুপি।
৩. খাওয়া: দিনে আনুমানিক ৮০০ থেকে ১৫০০ নেপালি রুপি, স্থানীয় খাবারে।
৪. কাঠমান্ডু-পোখারা আসা-যাওয়া, ট্যুরিস্ট বাসে: আনুমানিক কয়েক হাজার নেপালি রুপি।
বিজ্ঞাপন
৫. প্রবেশ ফি ও স্থানীয় যাতায়াত: আনুমানিক ৩০০০ থেকে ৬০০০ নেপালি রুপি।
সব মিলিয়ে আকাশপথে জনপ্রতি আনুমানিক ৪৫০০০ থেকে ৭০০০০ টাকা। সড়কপথে গেলে যাতায়াতের খরচ উল্লেখযোগ্য কমে, তবে ভারতীয় ভিসার খরচ ও সময় যোগ হয়। বিনিময় হার ও মৌসুমভেদে হিসাব বদলায়।
নেপাল ভ্রমণ প্যাকেজ নাকি নিজে
প্যাকেজে হোটেল, যাতায়াত আর গাইড একসঙ্গে থাকে, প্রথমবার বা পরিবার নিয়ে গেলে ঝামেলা কম। তবে নিজে পরিকল্পনা করলে সাধারণত খরচ কম পড়ে, বিশেষ করে বন্ধুদের দলে। প্যাকেজ নিলে কী অন্তর্ভুক্ত, কী নয়, যেমন প্রবেশ ফি, দুপুরের খাবার, বিমানবন্দর ট্রান্সফার, লিখিতভাবে জেনে নিন। নিবন্ধিত ট্রাভেল এজেন্সি ছাড়া কারও কাছে অগ্রিম টাকা দেবেন না।
বিজ্ঞাপন
কখন যাবেন ও কী সাবধানতা
অক্টোবর-নভেম্বর আর মার্চ-এপ্রিল নেপালের সেরা মৌসুম। আকাশ পরিষ্কার, হিমালয় ভালো দেখা যায়। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে প্রচণ্ড ঠান্ডা, তবে খরচ কম। বর্ষায় পাহাড়ি রাস্তায় ধস নামে, পর্বতচূড়া মেঘে ঢাকা থাকে।
নেপালে টাকা ভাঙানো নিয়েও একটু পরিকল্পনা দরকার। বাংলাদেশি টাকা সেখানে সাধারণত ভাঙানো যায় না, তাই এনডোর্স করা ডলার নিয়ে যান এবং কাঠমান্ডু বা পোখারার অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জে ভাঙান। বিমানবন্দরে প্রথম দিনের খরচের জন্য অল্প ভাঙিয়ে বাকিটা শহরে ভাঙালে হার একটু ভালো পাওয়া যেতে পারে। আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য সক্রিয় করা কার্ড দিয়ে এটিএম থেকে টাকা তোলা যায়, তবে প্রতিবার তোলায় ফি কাটে।
উচ্চতাজনিত অসুস্থতা, অর্থাৎ অনেক উঁচুতে দ্রুত উঠলে মাথাব্যথা, বমিভাব, শ্বাসকষ্ট হতে পারে। ট্রেকিংয়ে ধীরে উঠুন, লক্ষণ দেখা দিলে নিচে নামুন। ট্যাপের পানি সরাসরি পান করবেন না। থামেলে দোকানে দরদাম করে কিনুন। টাকা ভাঙাতে অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করুন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাংলাদেশিদের কি নেপালের ভিসা আগে নিতে হয়?
সাধারণত না। বিমানবন্দর বা স্থলসীমান্তে পৌঁছে অন অ্যারাইভাল ভিসা নেওয়া যায়। বছরে প্রথম সফরে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ফি লাগে না।
সড়কপথে নেপাল যেতে কি ভারতের ভিসা লাগবে?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ। ভারতের ভূখণ্ড দিয়ে যেতে হয় বলে বৈধ ভারতীয় ভিসা লাগবে, যাতে সংশ্লিষ্ট স্থলবন্দরের উল্লেখ থাকতে হবে।
নেপালে কি ভারতীয় রুপি চলে?
অনেক জায়গায় ভারতীয় রুপি নেওয়া হয়, তবে বড় নোটের ক্ষেত্রে নিয়ম আছে। নেপালি রুপিতে লেনদেন করাই নিরাপদ।
কয় দিনের ছুটিতে নেপাল ঘোরা যায়?
বিজ্ঞাপন
কাঠমান্ডু ও পোখারা আরামে দেখতে আকাশপথে পাঁচ থেকে সাত দিন যথেষ্ট। সড়কপথে গেলে আরও তিন-চার দিন যোগ করুন।