দিনমজুরের টাকায় তিন সড়কে ১১ যাত্রীছাউনি নির্মাণ
বাবুল শেখ ২০২৪-২০২৫ সালে গাজীপুরের কাপাসিয়া-জয়দেবপুর, কাপাসিয়া-কালীগঞ্জ ও পাতলা-বরসিট সড়কে মোট ১১টি যাত্রীছাউনি ও একটি শৌচাগার তৈরি করেছেন
গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি · কাপাসিয়া, গাজীপুর
প্রকাশ:
বৃষ্টি নামতেই কোলের শিশুকে আগলে রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মা। এক হাতে সন্তান ধরে রাখছেন, অন্য হাতে ভারী ব্যাগ সামলাচ্ছেন। বাসের জন্য অপেক্ষমাণ এক মা হঠাৎ শুরু হওয়া বৃষ্টির মধ্যে কী করবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না। দুই বছর আগে কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কের পাতলা মোড়ে এ রকম একটি দৃশ্য দেখে খারাপ লেগেছিল বাবুল শেখের।
বিজ্ঞাপন
সেই দৃশ্যটি বাবুলের মনে রোদের নিচে বৃষ্টিতে এক মায়ের নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চিত্র হিসেবে রয়ে গিয়েছিল। দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালানোর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, সামর্থ্য যতই হোক না কেন কিছু না কিছু করবেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের এক বিকেলে বাঁশ, কাঠ, চাটাই, পলিথিন নিয়ে তিনি কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কের পাতলা মোড়ে গিয়ে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি প্রথম যাত্রীছাউনি তৈরি করেন।
এর পর থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়ক এবং আশপাশের আরও দুটি সড়কে মোট ১১টি যাত্রীছাউনি তৈরি করেন। এর মধ্যে একটি যাত্রীছাউনির পাশে শৌচাগারও নির্মাণ করা হয়েছে। দেড় মাস পর একই স্থানে সড়কের উল্টো দিকে আরেকটি যাত্রীছাউনি ও শৌচাগার নির্মাণ করেন। ২০২৪ সালের পর ২০২৫ সালে আরও চারটি যাত্রীছাউনি তৈরি করেন, বাকি পাঁচটি চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে সম্পন্ন হয়েছে।
কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কে আটটি, কাপাসিয়া-কালীগঞ্জ সড়কে একটি এবং পাতলা-বরসিট সড়কে দুটি যাত্রীছাউনি নির্মিত হয়েছে। এই তিন সড়কের চার থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে ছাউনিগুলো অবস্থিত।
যাত্রীছাউনিগুলো বাঁশ, কাঠ, চাটাই এবং মোটা পলিথিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। কোনোটি লম্বায় ৭ ফুট, প্রস্থে ৫ ফুট, আবার অন্যটি লম্বায় ৫ ফুট, প্রস্থে ৪ ফুট। কিছু ছাউনিতে একটি বেঞ্চ, অন্যগুলোতে চার থেকে পাঁচটি বেঞ্চ পাতা রয়েছে। চাটাইয়ের ওপর মোটা পলিথিন ব্যবহার করা হয়েছে ছাউনির কভার হিসেবে।
বিজ্ঞাপন
ছোট আকারের যাত্রীছাউনি নির্মাণে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা খরচ হয়েছে, আর বড় আকারের ছাউনিতে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। শৌচাগার নির্মাণে রিং-স্ল্যাব, প্যান, টিনসহ বিভিন্ন উপকরণ কিনতে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা লেগেছে। যাত্রীছাউনি ও শৌচাগার তৈরিতে কোনো শ্রমিকের দরকার হয়নি, তিনি নিজেই কাজটি সম্পন্ন করেছেন।
নির্মাণের পর রক্ষণাবেক্ষণও তিনি নিজের হাতে করেন। শৌচাগারে পানির ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন বোতলে পানি ভরে রাখেন এবং ব্যবহার শেষে নিজেই পরিষ্কার করেন। কখনো কখনো বিরূপ মন্তব্য শুনতে হলেও তিনি তার কাজ চালিয়ে যান।
বাবুল শেখ বলেন, ‘অনেকে বলে, আমি পাগলামি করছি। আমি তাদের কথায় গুরুত্ব দিই না।’
সালমা খাতুন, দিনমজুর বাবুল শেখের স্ত্রী, মাঝে কখনো মনে হতো এগুলা কইরা কী অইবো, তবে এখন মাইনষের উপকার দেখা যায়। তিনি যোগ করেন, ‘মাঝে মাঝে মনে হইতো এগুলা কইরা কী অইবো। এহন দেহি মাইনষের উপকার হইতাছে। মানুষ ভালো বলতাছে। আমার নিজেরও এহন ভালো লাগে।’ পাতলা গ্রামের বাসিন্দা উবায়দুল্লাহ আকন বলেন, বাবুল শেখ কখনো তর্কে জড়ান না এবং তিনি সরল মানুষ।
বিজ্ঞাপন
যে তিনটি সড়কে যাত্রীছাউনি নির্মাণ হয়েছে, তার মধ্যে একটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতাধীন, অন্য দুটি সড়ক স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (LGED) অধীন। এলজিইডির কাপাসিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. সোহেল রানা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) হাফিজুল হক উভয়ই বাবুলের উদ্যোগকে প্রশংসা করেছেন এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানান।
৩ নভেম্বর রিপোর্টারের গিয়ে দেখা যায়, কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কের পাতলা মোড়ে প্রথম যাত্রীছাউনি এবং শৌচাগার উভয়ই সেবা দিচ্ছে। ছাউনির পাশে বাঁশের খুঁটিতে টানানো দড়িতে কয়েকটি পানির বোতল ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, এবং শৌচাগারের বেড়ায় ‘ব্যবহারের পর পরিষ্কার রাখুন’ লেখা ব্যানার টাঙানো আছে।
যাত্রী ছাউনি ব্যবহারকারী বেদন মিয়া বলেন, সড়কের পাশে বসার ব্যবস্থা থাকায় যাত্রীদের অনেক সুবিধা হয়েছে, রোদের মধ্যে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হলে অনেক কষ্ট হতো। পাতলা গ্রামের বড়সিটের বাসিন্দা মো. রিয়াদ জানান, শৌচাগারটি হওয়ায় পথচারীদের সুবিধা বাড়েছে।
বাবুল শেখের বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের বড়সিট গ্রামে, যেখানে তিনি ছোট আকারের মুরগির খামার চালান। দিনের কাজের পাশাপাশি তিনি এক মেয়ে, দুই ছেলেকে পারিবারিকভাবে সমর্থন করেন; মেয়ে বিয়ে হয়েছে, ছোট ছেলেকে মাদ্রাসায় পাঠানো হয়, বড় ছেলেকে সাত মাস আগে বিদেশে পাঠানো হয়েছে, যার জন্য তিনি আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সংসারে টানাপোড়েনের পরও তিনি ছোট কাজেও মানুষের উপকারের জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বলেন, ‘ছোট কাজেও যদি মানুষের উপকার হয়, তাতেই আমি খুশি।’ তার স্ত্রী সালমা খাতুনও প্রথমে পাগলায়ের কাজ মনে করলেও এখন বিষয়টি ভালভাবে গ্রহণ করছেন।