সূরা নাস বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার সূরা
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
কোরআন শুরু হয়েছে সূরা ফাতিহা দিয়ে, যেখানে বান্দা সঠিক পথের দিশা চায়। আর শেষ হয়েছে সূরা নাস দিয়ে, যেখানে বান্দা সেই পথ থেকে বিচ্যুত করার গোপন শত্রুর হাত থেকে আশ্রয় চায়। শুরু আর শেষের এই মিল অনেক আলেমকে মুগ্ধ করেছে।
বিজ্ঞাপন
সূরা নাস কোরআনের ১১৪তম ও সর্বশেষ সূরা, আয়াত ছয়টি। "নাস" অর্থ মানুষ। ছয় আয়াতের মধ্যে পাঁচটিতেই শব্দটি এসেছে। আগের সূরা ফালাকের সঙ্গে মিলিয়ে এ দুটিকে মুআওয়িজাতাইন বলা হয়। সূরা ফালাকে বাইরের নানা অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে, আর সূরা নাসে চাওয়া হয়েছে একটি মাত্র অনিষ্ট থেকে, যা মানুষের অন্তরে কাজ করে: ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা।
তাফসিরকারকেরা একটি সূক্ষ্ম বিষয় লক্ষ করেছেন। সূরা ফালাকে আল্লাহর একটি গুণ উল্লেখ করে চারটি অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। আর সূরা নাসে আল্লাহর তিনটি গুণ উল্লেখ করে একটি অনিষ্ট থেকে আশ্রয়। এ থেকে বোঝা যায়, অন্তরের কুমন্ত্রণা ঈমানের জন্য কত বড় হুমকি।
সূরা নাস আরবি
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ مَلِكِ النَّاسِ إِلَٰهِ النَّاسِ مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
১. কুল আউজু বিরাব্বিন নাস: বলুন, আমি আশ্রয় চাই মানুষের রবের কাছে।
২. মালিকিন নাস: মানুষের অধিপতির কাছে।
৩. ইলাহিন নাস: মানুষের উপাস্যের কাছে।
বিজ্ঞাপন
৪. মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস: আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে।
৫. আল্লাজি ইউওয়াসউইসু ফি সুদুরিন নাস: যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়।
৬. মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস: জিনদের মধ্য থেকে হোক বা মানুষের মধ্য থেকে।
"ওয়াসওয়াস" ও "ইউওয়াসউইসু" শব্দে "সিন" হরফ বারবার আসে, ফিসফিস শব্দের মতো, যা কুমন্ত্রণার ধরনকেই মনে করিয়ে দেয়। উচ্চারণ শুদ্ধ করতে কোনো কারির তিলাওয়াত শুনে মিলিয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
তিন গুণের তাৎপর্য
রব: যিনি সৃষ্টি করেন, লালন-পালন করেন, প্রয়োজন মেটান। মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর প্রতিপালনে।
মালিক: যিনি সার্বভৌম অধিপতি, সব আদেশ-নিষেধের অধিকার যাঁর। দুনিয়ার শাসকদের ক্ষমতা সীমিত ও ক্ষণস্থায়ী, তাঁর রাজত্ব চিরস্থায়ী।
ইলাহ: যিনি একমাত্র ইবাদতের যোগ্য।
বিজ্ঞাপন
তিনটি গুণ যেন তিন স্তরের নিরাপত্তা। শয়তান মানুষকে তিন জায়গায় আক্রমণ করে: প্রয়োজনের জায়গায় (রিজিক ও ভয়), আনুগত্যের জায়গায় (আদেশ অমান্য), আর ইবাদতের জায়গায় (শিরক ও অলসতা)। তিন গুণের মালিকের কাছে আশ্রয় চাওয়ায় তিন দিকই সুরক্ষিত হয়।
"খান্নাস" কে এবং ওয়াসওয়াসা কীভাবে কাজ করে
"খান্নাস" শব্দের অর্থ যে পিছিয়ে যায় ও লুকিয়ে পড়ে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ব্যাখ্যা তাফসিরে এসেছে: শয়তান মানুষের অন্তরে ওত পেতে থাকে, মানুষ যখন আল্লাহকে স্মরণ করে তখন সে সরে যায়, আর যখন উদাসীন হয় তখন কুমন্ত্রণা দেয়। অর্থাৎ জিকিরই তাকে দূরে রাখার প্রধান উপায়।
বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে আছে, শয়তান মানুষের শরীরে রক্তপ্রবাহের মতো চলাচল করে। তার কৌশল জোর করা নয়, ফিসফিস করে মন ঘুরিয়ে দেওয়া।
বিজ্ঞাপন
শেষ আয়াত মনে করিয়ে দেয়, কুমন্ত্রণাদাতা কেবল জিন নয়, মানুষও হতে পারে। খারাপ সঙ্গী, ভুল পথে টেনে নেওয়া বন্ধু, এমনকি মোবাইলের পর্দায় ক্রমাগত গুনাহের দিকে আহ্বান জানানো কনটেন্টও এর আধুনিক রূপ।
ওয়াসওয়াসার ধরন ও সুন্নাহসম্মত প্রতিকার
নামাজে মন ছুটে যাওয়া: সহিহ মুসলিমে আছে, সাহাবি উসমান ইবনে আবিল আস (রা.) অভিযোগ করেছিলেন, শয়তান তাঁর নামাজ ও কিরাতে বিভ্রান্তি তৈরি করে। মহানবী (সা.) বললেন, এ এক শয়তান, যার নাম খিনজাব। তার উপস্থিতি টের পেলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও এবং বাম দিকে তিনবার হালকা থুথু ফেলার ভঙ্গি করো। তিনি বলেন, এরপর আল্লাহ তা দূর করে দিয়েছেন।
ঈমান নিয়ে অদ্ভুত প্রশ্ন: বুখারি ও মুসলিমে আছে, শয়তান এসে প্রশ্ন তোলে, এটা কে সৃষ্টি করেছে, ওটা কে সৃষ্টি করেছে, শেষে বলে, তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে? এমন হলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে এবং চিন্তাটি সেখানেই থামিয়ে দেবে। সহিহ মুসলিমের আরেক হাদিসে সাহাবিরা বলেছিলেন, মনে এমন চিন্তা আসে যা মুখে বলাও ভয়ংকর মনে হয়। মহানবী (সা.) বললেন, এটি তো স্পষ্ট ঈমানের লক্ষণ। অর্থাৎ এমন চিন্তাকে ঘৃণা করাই ঈমানের প্রমাণ, এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।
বিজ্ঞাপন
ওজু ও পবিত্রতা নিয়ে সন্দেহ: সহিহ মুসলিমের হাদিসে আছে, পেটে কিছু অনুভব করলে শব্দ শোনা বা গন্ধ পাওয়া পর্যন্ত মসজিদ থেকে বের হয়ো না। ফকিহরা এখান থেকে মূলনীতি নিয়েছেন: নিশ্চিত বিষয় সন্দেহে বাতিল হয় না। বারবার ওজু ভেঙেছে কি না ভাবলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওজু আছে বলে ধরে নিন।
অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন চিন্তা: কারও যদি একই চিন্তা বারবার জোর করে মাথায় আসে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওজু-গোসল বা হাত ধোয়ায় চলে যায় এবং দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়, তাহলে এটি অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডারের (ওসিডি) মতো চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা হতে পারে। দোয়ার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। এটি ঈমানের দুর্বলতা নয়।
সূরা নাস পড়ার সুন্নাহসম্মত সময় ও জিকিরের অভ্যাস
"খান্নাস" যেহেতু আল্লাহর স্মরণে পিছিয়ে যায়, তাই দিনের প্রতিটি মোড়ে ছোট ছোট জিকির শয়তানকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ঘরে ঢোকা ও খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বললে শয়তান সেখানে রাত কাটানো ও খাবারের সুযোগ পায় না বলে সহিহ মুসলিমে আছে। রাগ উঠলে "আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" বলার শিক্ষা বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে এসেছে, যেখানে মহানবী (সা.) রাগে লাল হয়ে যাওয়া এক ব্যক্তির কথা বলে জানিয়েছিলেন, সে এ বাক্যটি বললে তার রাগ চলে যেত। কোরআন তিলাওয়াতের শুরুতেও আউজুবিল্লাহ পড়ার নির্দেশ সূরা নাহলের ৯৮ নম্বর আয়াতে আছে।
বিজ্ঞাপন
এসব ছোট অভ্যাসের পাশাপাশি সূরা ফালাকের মতোই সূরা নাস প্রতি ফরজ নামাজের পর একবার, সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার এবং ঘুমের আগে সূরা ইখলাস ও ফালাকের সঙ্গে তিনবার পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে বুলিয়ে নেওয়া সুন্নাহ। অসুস্থতায় পড়ে ফুঁ দেওয়ার কথাও বুখারি ও মুসলিমে এসেছে। সহিহ মুসলিমের হাদিসে এ দুই সূরাকে অতুলনীয় আয়াত বলা হয়েছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ওয়াসওয়াসা এলে কি গুনাহ হয়?
না। মনে আসা চিন্তার জন্য পাকড়াও করা হয় না, যতক্ষণ না তা কাজে বা মুখে প্রকাশ পায়। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে এ কথা এসেছে।
বিজ্ঞাপন
সূরা নাস কি শুধু জিনের জন্য পড়া হয়?
না। শেষ আয়াত অনুযায়ী কুমন্ত্রণা মানুষের দিক থেকেও আসে। খারাপ সঙ্গ ও প্রলোভন থেকে বাঁচতেও এটি পড়া হয়।
শিশুদের ভয় পেলে কী পড়াব?
তিন কুল পড়ে শিশুর গায়ে ফুঁ দিতে পারেন এবং তাকেও মুখস্থ করাতে পারেন। পাশাপাশি তার ভয়ের কারণ বুঝে আশ্বস্ত করুন।
বিজ্ঞাপন
নামাজে বারবার রাকাত সংখ্যা ভুলে গেলে কী করব?
হানাফি মতে জীবনে প্রথমবার এমন সন্দেহ হলে নামাজটি আবার পড়বেন। প্রায়ই হলে প্রবল ধারণার ওপর আমল করবেন, আর কোনো দিকে প্রবল ধারণা না হলে কম সংখ্যা ধরে নামাজ পূর্ণ করে শেষে সাহু সিজদা দেবেন। এ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করাও ওয়াসওয়াসার অংশ।
সূরা নাস মক্কি না মাদানি?
সূরা ফালাকের মতো এটি নিয়েও আলেমদের দুই মত আছে।