কম খরচে পাহাড় ভ্রমণ: বাংলাদেশের সাশ্রয়ী পাহাড়ি গন্তব্যগুলো
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
পাহাড় দেখতে হলে বান্দরবান বা সাজেকেই যেতে হবে, এমন নয়। ঢাকা থেকে চার-পাঁচ ঘণ্টার দূরত্বে এমন বেশ কয়েকটি জায়গা আছে, যেখানে এক দিনে বা এক রাতে পাহাড়, ঝরনা আর সবুজের স্বাদ নেওয়া যায়, খরচও হাতের নাগালে। আবার একটু হিসাব করে গেলে তিন পার্বত্য জেলাও খুব বেশি খরচ ছাড়াই ঘুরে আসা সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
কম খরচে পাহাড় ভ্রমণের মূল সূত্র হলো দূরত্ব কম রাখা, রাতের বাস বা ট্রেনে যাওয়া, আর দলবেঁধে যাতায়াত ভাগ করা। নিচে বাংলাদেশের পাহাড়ি গন্তব্যগুলোকে খরচ আর দূরত্বের হিসাবে সাজানো হলো, যাতে নিজের বাজেট আর ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে বেছে নিতে পারেন।
বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকা মূলত দক্ষিণ-পূর্বের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম, উত্তর-পূর্বের সিলেট অঞ্চল আর উত্তরে ময়মনসিংহ বিভাগের সীমান্তঘেঁষা কিছু এলাকায়। প্রতিটির চেহারা আলাদা, কোথাও উঁচু খাড়া পাহাড়, কোথাও টিলা আর চা-বাগান।
এক দিনেই সম্ভব: সবচেয়ে কম খরচের গন্তব্য
১. সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই, চট্টগ্রাম: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশেই চন্দ্রনাথ পাহাড়, খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া আর ঝরঝরি ঝরনা। রাতের বাসে গিয়ে দিনে ঘুরে রাতের বাসে ফেরা যায়। জনপ্রতি আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
২. শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার: চা-বাগানের টিলা, লাউয়াছড়ার বন, মাধবপুর লেক। ট্রেনে আরামে যাওয়া যায়, শহরে সস্তা গেস্টহাউস আছে। এক রাত থাকলে জনপ্রতি আনুমানিক ২৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা।
৩. দুর্গাপুর, নেত্রকোনা: সোমেশ্বরী নদী, চীনামাটির পাহাড় আর ওপারে মেঘালয়ের পাহাড়ের সারি। ঢাকার মহাখালী থেকে বাসে যাওয়া যায়, শহরের তুলনায় খরচ কম।
৪. গজনী, শেরপুর: ঝিনাইগাতীতে গারো পাহাড়ের কোলে অবকাশ কেন্দ্র, লেক ও টিলা। পরিবার নিয়ে দিনের পিকনিকের জন্য জনপ্রিয়।
দুই-তিন দিনের গন্তব্য: পার্বত্য চট্টগ্রাম
বিজ্ঞাপন
১. খাগড়াছড়ি: আলুটিলা গুহা, রিছাং ঝরনা, শহরের কাছের ঝুলন্ত সেতু আর দেবতা পুকুর। ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে আট ঘণ্টার মতো। সাজেক যাওয়ার পথও খাগড়াছড়ি দিয়ে।
২. সাজেক ভ্যালি: রাঙামাটি জেলায়, তবে যাতায়াত খাগড়াছড়ি থেকে চাঁদের গাড়িতে। মেঘের জন্য বিখ্যাত। খরচ কমাতে বড় দলে গাড়ি ভাগ করুন আর কর্মদিবসে যান, ছুটির দিনে কটেজভাড়া অনেক বাড়ে।
৩. রাঙামাটি: পাহাড় আর লেক একসঙ্গে। ট্রলার ভাগ করে কাপ্তাই লেক ঘোরা যায়।
৪. বান্দরবান: নীলাচল, মেঘলা, স্বর্ণমন্দির, শৈলপ্রপাত, নীলগিরি। শহরের কাছের জায়গাগুলো সিএনজিতেই ঘোরা যায়, দূরের জন্য চাঁদের গাড়ি ভাগ করুন।
বিজ্ঞাপন
পার্বত্য জেলায় দুই রাত বাসে আর এক-দুই দিন ঘোরাঘুরিতে জনপ্রতি আনুমানিক ৪০০০ থেকে ৭০০০ টাকা ধরে রাখা যায়, দলের আকার ও গন্তব্যভেদে।
তিনটি নমুনা বাজেট পরিকল্পনা
দুই হাজার টাকার আশপাশে, এক দিন: রাতের নন-এসি বাসে ঢাকা থেকে মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া। ভোরে খৈয়াছড়া ঝরনার ট্রেইল, দুপুরে গ্রামের বাড়িতে আগে বলে রাখা ভাত-মাছ, বিকেলে মহাসড়কে উঠে ঢাকার বাস। অথবা সীতাকুণ্ডে নেমে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ওঠা। যাতায়াত, খাবার আর স্থানীয় অটোভাড়া মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক দেড় থেকে তিন হাজার টাকা।
চার হাজার টাকার আশপাশে, এক রাত দুই দিন: রাতের ট্রেনে শ্রীমঙ্গল। প্রথম দিন সকালে লাউয়াছড়া, দুপুরে চা-বাগান আর মাধবপুর লেক। রাতে শহরের সাধারণ গেস্টহাউসে তিনজনে এক কক্ষ। দ্বিতীয় দিন সকালে কাছের কোনো টিলা বা বাগানে হাঁটা, দুপুরের ট্রেনে ফেরা। ট্রেনের শোভন চেয়ার, ভাগের কক্ষ আর সাধারণ খাবারে জনপ্রতি আনুমানিক আড়াই থেকে চার হাজার টাকা।
বিজ্ঞাপন
সাত হাজার টাকার আশপাশে, দুই রাত বাসে ও এক রাত হোটেলে: রাতের বাসে খাগড়াছড়ি। প্রথম দিন আলুটিলা গুহা, রিছাং ঝরনা আর শহরের কাছের দর্শনীয় স্থান। দ্বিতীয় দিন দল মিলিয়ে চাঁদের গাড়িতে সাজেক, বিকেলে ফিরে রাতের বাসে ঢাকা। অথবা সাজেকে এক রাত থেকে পরদিন ফেরা, তখন খরচ কিছুটা বাড়বে। দশ-বারো জনের দলে গাড়ি ভাগ করলে জনপ্রতি আনুমানিক পাঁচ থেকে আট হাজার টাকায় হয়ে যায়।
সব হিসাব আনুমানিক এবং জ্বালানির দাম, মৌসুম আর ছুটির দিনভেদে বদলায়। হাতে সব সময় কিছু বাড়তি টাকা রাখুন।
সিলেটের টিলা ও সীমান্তের পাহাড়
জাফলং, বিছনাকান্দি, পাংথুমাই আর লালাখালের দিক থেকে সীমান্তের ওপারে মেঘালয়ের উঁচু পাহাড় আর ঝরনা দেখা যায়। নিজে পাহাড়ে ওঠার সুযোগ কম, কিন্তু দৃশ্য অসাধারণ। সিলেট শহর থেকে লেগুনা বা বাসে কম খরচে এসব জায়গায় যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে ট্রেনে সিলেট গেলে খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে। সীমান্ত এলাকায় নির্ধারিত সীমার বাইরে যাবেন না।
বিজ্ঞাপন
পাহাড়ে ঘোরার জায়গা বাছাইয়ের সময় যা ভাববেন
সময়: ছুটি এক দিনের হলে সীতাকুণ্ড-মিরসরাই বা গজনী, দুই দিনের হলে শ্রীমঙ্গল বা দুর্গাপুর, তিন দিনের বেশি হলে পার্বত্য জেলা।
শারীরিক সামর্থ্য: শ্রীমঙ্গলের টিলা বা নীলাচলের মতো জায়গায় হাঁটা কম, চন্দ্রনাথ বা খৈয়াছড়ায় খাড়া পথ।
মৌসুম: ঝরনা দেখতে বর্ষা, মেঘ দেখতে বর্ষা ও বর্ষার পরপর, আরামে ঘুরতে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি।
বিজ্ঞাপন
অনুমতি: পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু উপজেলায় সময়ে সময়ে পর্যটক চলাচলে বিধিনিষেধ থাকে। দূরের এলাকায় যাওয়ার আগে প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশনা জানুন।
খরচ কমানোর বাস্তব কৌশল
১. রাতের যাত্রা: রাতের বাস বা ট্রেনে গেলে একটি হোটেলরাত বাঁচে।
২. দলের আকার: চাঁদের গাড়ি, ট্রলার, সিএনজি সবই পুরো ভাড়ায় চলে। আট-বারো জনের দল হলে জনপ্রতি খরচ নাটকীয়ভাবে কমে।
বিজ্ঞাপন
৩. কর্মদিবস: শুক্র-শনিবার আর সরকারি ছুটিতে হোটেল ও গাড়ির ভাড়া বাড়ে। রবি থেকে বুধবার যাত্রা খুঁজুন।
৪. স্থানীয় খাবার: পর্যটনকেন্দ্রের রেস্তোরাঁর বদলে বাজার এলাকার সাধারণ হোটেলে খান।
৫. ভাগাভাগি করে থাকা: তিন-চারজনে এক কক্ষ নিলে জনপ্রতি খরচ অনেক কমে।
৬. আগাম টিকিট: ফিরতি বাস বা ট্রেনের টিকিট আগেই কাটুন, শেষ মুহূর্তে দাম বেশি দিতে না হয়।
বিজ্ঞাপন
পাহাড় ভ্রমণ টিপস: নিরাপত্তা আগে
পাহাড়ে সাশ্রয়ের নামে নিরাপত্তায় ছাড় দেবেন না। গ্রিপওয়ালা জুতা পরুন, চপ্পলে পাহাড়ি পথে পিছলে পড়ার ঝুঁকি বেশি। সন্ধ্যার আগে নিরাপদ জায়গায় ফিরুন। ঝরনার কুণ্ডে সাঁতার না জেনে নামবেন না, পাহাড়ি ঢলের সময় ঝিরিপথ এড়িয়ে চলুন। পার্বত্য এলাকায় ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি আছে, মশা তাড়ানোর ক্রিম ব্যবহার করুন। পানির বোতল, স্যালাইন আর প্রাথমিক চিকিৎসার জিনিস রাখুন। নিবন্ধিত গাইড লাগে এমন এলাকায় গাইড ছাড়া যাবেন না।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর এলাকায় শ্রদ্ধাশীল থাকুন। অনুমতি ছাড়া ছবি তুলবেন না, উচ্চ শব্দে গান বাজাবেন না, প্লাস্টিক ফেলে আসবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
ঢাকার সবচেয়ে কাছের পাহাড়ি জায়গা কোনটি?
বড় পাহাড়ের মধ্যে সীতাকুণ্ড-মিরসরাই সবচেয়ে কাছে ও সহজ। উত্তরে গজনী ও দুর্গাপুরেও এক দিনে ঘুরে আসা যায়, তবে সেখানে পাহাড় মূলত টিলা আকারের।
দুই হাজার টাকায় কি পাহাড় ভ্রমণ সম্ভব?
ঢাকা থেকে সীতাকুণ্ড বা মিরসরাইয়ে এক দিনের যাত্রা নন-এসি বাসে আর সাধারণ খাবারে মোটামুটি এর কাছাকাছি খরচে হয়ে যায়। পার্বত্য জেলায় এর বেশি লাগে।
বিজ্ঞাপন
মেয়েরা কি দলবেঁধে কম খরচে পাহাড় ভ্রমণে যেতে পারেন?
পারেন। পরিচিত দলে, নির্ভরযোগ্য পরিবহনে এবং সন্ধ্যার আগে ফেরার পরিকল্পনা রেখে গেলে যাত্রা সাধারণত নির্বিঘ্ন হয়।
পাহাড়ে কোন মৌসুমে খরচ কম?
বর্ষায় ভিড় কম থাকায় হোটেলভাড়া কমে, তবে পথ পিচ্ছিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। অক্টোবর-নভেম্বরের কর্মদিবস খরচ ও নিরাপত্তা দুই দিক থেকেই ভালো সময়।