চুলায় কেক বানানোর নিয়ম: ওভেন ছাড়াই নরম স্পঞ্জ কেক
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
বাসায় ওভেন নেই বলে কেক বানানো হয় না, এমন অনেকেই আছেন। অথচ গ্যাসের চুলা আর একটি ভারী তলার হাঁড়িতেই নরম, ফুলকো স্পঞ্জ কেক বানানো যায়। হাঁড়িটি এখানে ছোট একটি ওভেনের কাজ করে: ভেতরের গরম বাতাস কেককে চারপাশ থেকে সমানভাবে বেক করে।
বিজ্ঞাপন
চুলায় কেক বানানোর নিয়ম তিনটি কথায়: হাঁড়ি আগে থেকে গরম করা, কেকের পাত্র যেন সরাসরি হাঁড়ির তলা না ছোঁয়, আর কম আঁচে ঢাকনা বন্ধ রেখে ধৈর্য ধরা। হাঁড়ির ভেতরে একটি স্টিলের স্ট্যান্ড বা দুই কাপ লবণ বা বালির স্তর বিছিয়ে তার ওপর কেকের পাত্র বসালে তলা পোড়ে না। ৩৫ থেকে ৪৫ মিনিটে কেক হয়ে যায়, তবে প্রথম ২৫ মিনিট ঢাকনা খোলা চলবে না।
নিচের পরিমাণে সাত থেকে আট ইঞ্চির একটি গোল কেক হবে, যা ছয় থেকে আটজন খেতে পারবেন।
স্পঞ্জ কেক রেসিপির উপকরণ
ডিম তিনটি (ঘরের তাপমাত্রায়), চিনি পৌনে এক কাপ (গুঁড়া করে নিলে ভালো মেশে), ময়দা এক কাপ (মোটামুটি ১২৫ গ্রাম), বেকিং পাউডার এক চা-চামচ, তেল আধা কাপের কিছু কম, তরল দুধ এক-চতুর্থাংশ কাপ, ভ্যানিলা এসেন্স এক চা-চামচ, লবণ এক চিমটি।
বিজ্ঞাপন
অন্যান্য: সাত-আট ইঞ্চির কেকের পাত্র বা টিফিন বাটির মতো স্টিলের পাত্র, পাত্রে মাখানোর জন্য সামান্য তেল বা মাখন, বাটার পেপার (না থাকলে ময়দা ছিটিয়ে নিন), ভারী তলার বড় হাঁড়ি বা কড়াই এবং মাপমতো ঢাকনা, হাঁড়ির ভেতরে বসানোর স্টিলের স্ট্যান্ড অথবা দুই কাপ লবণ বা পরিষ্কার বালি।
ডিম ফ্রিজ থেকে বের করে অন্তত আধা ঘণ্টা রেখে দিন। ঠান্ডা ডিম ভালোভাবে ফেটে ফুলে না, এতে কেকও কম ফোলে।
চুলায় ওভেনের মতো তাপ তৈরি
১. হাঁড়ি প্রস্তুত: হাঁড়ির তলায় স্টিলের স্ট্যান্ড বসান। স্ট্যান্ড না থাকলে দুই কাপ লবণ বা বালি সমান করে বিছিয়ে দিন। লবণ বা বালি পরে চেলে রেখে দিলে বারবার ব্যবহার করা যায়, তবে এই লবণ রান্নায় খাবেন না।
বিজ্ঞাপন
২. আগে গরম করা: ঢাকনা দিয়ে মাঝারি আঁচে দশ মিনিট হাঁড়িটি গরম করুন। এটি ওভেন প্রিহিট করার মতো। ঠান্ডা হাঁড়িতে কেক বসালে ফুলতে দেরি হয় এবং কেক বসে যায়।
৩. পুরোনো প্রেশার কুকার: অনেকে প্রেশার কুকারে কেক বানান। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই রাবারের গ্যাসকেট আর সিটি খুলে নিন, নইলে ভেতরে চাপ তৈরি হয়ে বিপদ ঘটতে পারে।
খালি হাঁড়ি অনেকক্ষণ চুলায় থাকলে কিছু হাঁড়ির তলা কালচে হয়ে যায়। তাই কেকের জন্য একটি পুরোনো ভারী হাঁড়ি আলাদা রাখতে পারেন।
স্পঞ্জ কেকের ব্যাটার তৈরি
বিজ্ঞাপন
১. শুকনো উপকরণ চেলে নেওয়া: ময়দা, বেকিং পাউডার আর লবণ একসঙ্গে দুইবার চেলে নিন। এতে বাতাস ঢোকে এবং দলা থাকে না।
২. ডিম ফেটানো: বড় বাটিতে ডিম আর গুঁড়া চিনি নিয়ে ইলেকট্রিক বিটার বা হুইস্ক দিয়ে ফেটান। বিটারে পাঁচ থেকে সাত মিনিট, হাতে আরও বেশি সময় লাগবে। মিশ্রণ হালকা ঘিয়া রঙের, ফেনা ফেনা আর আয়তনে প্রায় দ্বিগুণ হলে বুঝবেন ঠিক আছে। এই ধাপেই কেকের ফোলা ভাব তৈরি হয়।
৩. তরল মেশানো: তেল, দুধ আর ভ্যানিলা ধীরে ধীরে ঢেলে অল্প সময় ফেটিয়ে মিশিয়ে নিন।
৪. ময়দা মেশানো: চেলে রাখা ময়দা তিন ভাগে দিন। প্রতিবার স্প্যাচুলা বা বড় চামচ দিয়ে নিচ থেকে ওপরে আলতো করে ভাঁজ করে মেশান, একদিকে ঘুরিয়ে জোরে নাড়বেন না। ময়দার শুকনো দাগ মিলিয়ে গেলেই থামুন। বেশি নাড়লে ডিমের বাতাস বেরিয়ে যায়, কেক শক্ত হয়।
বিজ্ঞাপন
৫. পাত্রে ঢালা: কেকের পাত্রে তেল মাখিয়ে তলায় বাটার পেপার বসান। ব্যাটার ঢেলে পাত্রটি টেবিলে দুই-একবার আলতো ঠুকে দিন, ভেতরের বড় বুদবুদ বেরিয়ে যাবে।
চুলায় বেক করার নিয়ম
গরম হাঁড়ির স্ট্যান্ড বা লবণের স্তরের ওপর সাবধানে কেকের পাত্র বসান। হাত পুড়ে যাওয়া এড়াতে মোটা কাপড় বা গ্লাভস ব্যবহার করুন। ঢাকনা দিয়ে আঁচ একেবারে কমিয়ে দিন, এমন আঁচ যাতে আগুন নিভে না যায় কিন্তু খুব ছোট থাকে।
৩৫ থেকে ৪৫ মিনিট বেক করুন। হাঁড়ির পুরুত্ব আর চুলার আঁচভেদে সময় কমবেশি হয়। প্রথম ২৫ মিনিট ঢাকনা খুলবেন না, গরম বাতাস বেরিয়ে গেলে ফুলতে থাকা কেক বসে যায়।
বিজ্ঞাপন
৩৫ মিনিট পর একটি টুথপিক বা কাঠি কেকের মাঝখানে ঢুকিয়ে দেখুন। কাঠি পরিষ্কার বেরিয়ে এলে কেক হয়ে গেছে। কাঠিতে কাঁচা ব্যাটার লেগে থাকলে আরও পাঁচ-দশ মিনিট রাখুন।
চুলা বন্ধ করে পাঁচ মিনিট হাঁড়িতেই রেখে দিন। তারপর বের করে দশ মিনিট ঠান্ডা হতে দিন। পাত্রের কিনারায় ছুরি ঘুরিয়ে উল্টে কেক বের করুন। পুরো ঠান্ডা হলে কাটলে টুকরা সুন্দর হয়।
কেক ফুলে না কেন: সমস্যা আর সমাধান
কেক ফুলল না বা বসে গেল: বেকিং পাউডার পুরোনো হলে কাজ করে না। পরীক্ষা করতে আধা চা-চামচ বেকিং পাউডার গরম পানিতে দিন; বুদবুদ না উঠলে নতুন কিনুন। ডিম ঠিকমতো না ফেটানো, ময়দা মেশানোর সময় বেশি নাড়া আর বেক চলাকালে ঢাকনা খোলাও বড় কারণ।
বিজ্ঞাপন
ওপরে কাঁচা, নিচে পোড়া: আঁচ বেশি ছিল বা কেকের পাত্র সরাসরি হাঁড়ির তলায় বসানো ছিল। স্ট্যান্ড বা লবণের স্তর ব্যবহার করুন এবং আঁচ কমান।
কেক শক্ত ও ঘন: ময়দা বেশি হয়েছে বা বেশি নাড়া হয়েছে। মাপের কাপ ব্যবহার করুন এবং ময়দা চামচে তুলে কাপে ভরুন, চেপে নয়।
মাঝখানে ভেজা: সময় কম হয়েছে বা পাত্র খুব গভীর। কাঠি পরীক্ষা না করে চুলা বন্ধ করবেন না।
ডিমের গন্ধ: ভ্যানিলা এসেন্স কম হয়েছে বা কেক কম বেক হয়েছে। সামান্য লেবুর খোসা কুচি দিলেও গন্ধ কমে।
বিজ্ঞাপন
ভিন্ন স্বাদ আর সংরক্ষণ
চকলেট কেক: ময়দা থেকে তিন টেবিল-চামচ সরিয়ে সমান পরিমাণ কোকো পাউডার দিন, দুধ দুই টেবিল-চামচ বাড়িয়ে দিন।
কমলা বা লেবুর কেক: দুধের বদলে কমলার রস আর এক চা-চামচ খোসা কুচি দিন।
খেজুর-বাদাম: শেষে কুচানো খেজুর আর বাদামে সামান্য ময়দা মাখিয়ে ব্যাটারে মিশিয়ে দিন, তাহলে তলায় বসে যাবে না।
বিজ্ঞাপন
কেক ঠান্ডা হলে বাতাস ঢোকে না এমন বাক্সে রাখুন। ঘরের তাপমাত্রায় এক-দুই দিন, ফ্রিজে কয়েক দিন ভালো থাকে। ফ্রিজের কেক খাওয়ার আগে কিছুক্ষণ বাইরে রাখলে নরম হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ডিম ছাড়া কি চুলায় কেক হয়?
হয়। ডিমের বদলে টক দই আর বেকিং সোডা ব্যবহার করে কেক বানানো যায়, তবে মাপ আর পদ্ধতি আলাদা। স্পঞ্জ কেকের মতো হালকা হবে না, কিছুটা ঘন হবে।
বিজ্ঞাপন
ননস্টিক প্যানে কেক বানানো যায়?
ঢাকনাসহ ভারী ননস্টিক প্যানে ছোট কেক করা যায়। তবে খালি ননস্টিক প্যান অনেকক্ষণ উচ্চ তাপে গরম করা ঠিক নয়, তাই আঁচ কম রাখুন।
কেক বানাতে কোন তেল ভালো?
গন্ধহীন সয়াবিন বা সূর্যমুখী তেল ভালো। সরিষার তেল দেবেন না, এর ঝাঁজ কেকের স্বাদ নষ্ট করে। মাখন দিলে স্বাদ বাড়ে, তবে গলিয়ে ঠান্ডা করে দিন।
বিজ্ঞাপন
লবণের বদলে বালি ব্যবহার কি নিরাপদ?
পরিষ্কার শুকনো বালি ব্যবহার করা যায়। কেকের পাত্রের নিচে শুধু তাপ ছড়ানোর জন্যই এটি থাকে, খাবারের সংস্পর্শে আসে না। তবে সবচেয়ে ঝামেলাহীন হলো একটি স্টিলের স্ট্যান্ড।