পায়েস রেসিপি: খেজুর গুড় আর চিনির ঘন দুধের পায়েস
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
জন্মদিন, নতুন চাকরি, ঈদ বা শীতের সকালে নতুন গুড়ের আগমন, বাঙালির ঘরে আনন্দের খবর মানেই এক বাটি পায়েস। উপকরণ খুব সামান্য: দুধ, সুগন্ধি চাল, চিনি বা গুড় আর এলাচ। তবু কারও পায়েস হয় ঘন, মোলায়েম আর সুগন্ধি; কারও হয় পাতলা, নয়তো তলায় ধরে পোড়া গন্ধ। পার্থক্যটা ধৈর্য আর কয়েকটি ছোট কৌশলে।
বিজ্ঞাপন
পায়েস রেসিপির সংক্ষিপ্ত নিয়ম এমন: দুধ ফুটিয়ে কিছুটা ঘন করে নিন, তারপর ধুয়ে ঝরানো কালিজিরা বা চিনিগুঁড়া চাল দিয়ে কম আঁচে নেড়ে নেড়ে রান্না করুন যতক্ষণ না চাল গলে নরম হয় আর দুধ ঘন হয়। চিনির পায়েসে চাল সেদ্ধ হওয়ার পর চিনি দিন। গুড়ের পায়েসে চুলা বন্ধ করে পায়েস সামান্য ঠান্ডা হলে তবে গুড় মেশান, নইলে দুধ ফেটে যেতে পারে।
নিচের পরিমাণে আট থেকে দশ বাটি পায়েস হবে। সব মিলিয়ে সময় লাগবে এক ঘণ্টার মতো।
উপকরণ
ফুল ক্রিম তরল দুধ দুই লিটার, কালিজিরা বা চিনিগুঁড়া চাল আধা কাপ (মোটামুটি ১০০ গ্রাম), চিনি আধা কাপ থেকে পৌনে এক কাপ (স্বাদমতো), অথবা খেজুরের ঝোলা বা পাটালি গুড় ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম, এলাচ চার-পাঁচটি, তেজপাতা দুটি, দারুচিনি এক টুকরা (ঐচ্ছিক), ঘি এক টেবিল-চামচ, কিশমিশ দুই টেবিল-চামচ, কাজুবাদাম বা কাঠবাদাম কুচি দুই টেবিল-চামচ, লবণ এক চিমটি।
বিজ্ঞাপন
দুধ যত ঘন ও ননিযুক্ত হবে, পায়েস তত সুস্বাদু হবে। প্যাকেটের লো-ফ্যাট দুধে পায়েস পাতলা লাগে, ঘন হতেও সময় বেশি নেয়। গুড়ের পরিমাণ গুড়ের মিষ্টতার ওপর নির্ভর করে, তাই অল্প অল্প করে মিশিয়ে চেখে নিন।
চালের পায়েস: চাল বাছাই ও প্রস্তুতি
পায়েসের ঘ্রাণের বড় অংশ আসে চাল থেকে। কালিজিরা বা চিনিগুঁড়া চালের ছোট দানা দ্রুত গলে মোলায়েম হয় এবং পোলাওয়ের মতো সুবাস দেয়। বাসমতী দিয়েও পায়েস হয়, তবে স্বাদ কিছুটা আলাদা।
চাল দু-একবার আলতো করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। অনেকে চাল ধুয়ে কাপড়ে ছড়িয়ে শুকিয়ে নিয়ে এক চামচ ঘিয়ে দুই মিনিট হালকা ভেজে নেন। এতে ঘ্রাণ বাড়ে এবং চাল দলা পাকায় না। চাইলে ধোয়া চাল আধা ঘণ্টা ভিজিয়েও রাখতে পারেন, তাতে সেদ্ধ হতে সময় কম লাগে।
বিজ্ঞাপন
পায়েস রান্নার নিয়ম ধাপে ধাপে
১. দুধ ফোটানো: ভারী তলার বড় হাঁড়িতে দুধ, তেজপাতা, এলাচ আর দারুচিনি দিয়ে মাঝারি আঁচে ফোটান। হাঁড়ি বড় নিন, কারণ দুধ উথলে ওঠে।
২. দুধ কিছুটা ঘন করা: ফুটে উঠলে আঁচ কমিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট নাড়তে থাকুন। দুধ মোটামুটি পাঁচ ভাগের এক ভাগ কমে আসবে।
৩. চাল দেওয়া: প্রস্তুত চাল দুধে দিয়ে দিন। এখন থেকে আঁচ কম রাখুন এবং কাঠের চামচ দিয়ে তলা থেকে কিছুক্ষণ পরপর নাড়তে থাকুন। চাল তলায় বসে গেলেই লেগে পুড়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
৪. চাল সেদ্ধ: ২৫ থেকে ৩৫ মিনিটে চাল নরম হয়ে আঙুলে চাপলে সহজে গলে যাবে। দুধ তখন ঘন হয়ে চামচের পেছনে প্রলেপ ফেলবে।
৫. মিষ্টি দেওয়া: চিনির পায়েস হলে এই সময় চিনি আর এক চিমটি লবণ দিন। চিনি দেওয়ার পর পায়েস আবার কিছুটা পাতলা হবে, আরও পাঁচ থেকে দশ মিনিট নেড়ে ঘন করুন। চাল সেদ্ধ হওয়ার আগে চিনি দিলে চাল শক্ত থেকে যায়, তাই তাড়াহুড়া করবেন না।
৬. শেষ ধাপ: ঘিয়ে কিশমিশ আর বাদাম হালকা ভেজে পায়েসে মিশিয়ে দিন, কিছু ওপরে সাজানোর জন্য রেখে দিন।
গুড়ের পায়েস: দুধ না ফাটানোর কৌশল
বিজ্ঞাপন
শীতে নতুন খেজুর গুড়ের পায়েসের স্বাদ অতুলনীয়। কিন্তু গরম দুধে সরাসরি গুড় ঢেলে দিলে অনেক সময় দুধ ছানা কেটে ফেটে যায়। গুড়ের অম্লতা আর উচ্চ তাপ একসঙ্গে মিললে এমন হয়।
নিয়ম: চাল পুরোপুরি সেদ্ধ আর পায়েস ঘন হলে চুলা বন্ধ করুন। পাঁচ থেকে দশ মিনিট রেখে পায়েস একটু ঠান্ডা হতে দিন, যেন ধোঁয়া ওঠা বন্ধ হয় কিন্তু গরম থাকে। তারপর গুড় কুচি বা ঝোলা গুড় অল্প অল্প করে দিয়ে নাড়তে থাকুন। গুড় গলে মিশে যাবে।
আরেকটি উপায়: আলাদা একটি ছোট পাত্রে গুড়ের সঙ্গে আধা কাপ পানি বা দুধ দিয়ে কম আঁচে গলিয়ে নিন, ছেঁকে ময়লা থাকলে ফেলে দিন। কুসুম গরম অবস্থায় এই গুড়ের সিরা পায়েসে মেশান।
চাইলে অর্ধেক চিনি আর অর্ধেক গুড় দিতে পারেন। এতে রং হালকা থাকে, গুড়ের ঘ্রাণও পাওয়া যায়, ফাটার ঝুঁকিও কমে। গুড়ের পায়েস ঠান্ডা হলে রং কিছুটা গাঢ় হয়, এটি স্বাভাবিক।
বিজ্ঞাপন
ঘনত্ব, স্বাদ আর পরিবেশন
পায়েস চুলায় যতটা ঘন দেখায়, ঠান্ডা হলে তার চেয়ে অনেক বেশি ঘন হয়ে যায়। তাই চুলা থেকে নামানোর সময় একটু ঢিলেঢালা, ঢালা যায় এমন ঘনত্ব রাখুন। ঠান্ডা হয়ে খুব শক্ত হয়ে গেলে কয়েক চামচ গরম দুধ মিশিয়ে নিন।
পায়েস গরম, কুসুম গরম বা ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা, তিনভাবেই খাওয়া যায়। ওপরে বাদাম কুচি, কিশমিশ আর চাইলে সামান্য এলাচ গুঁড়া ছড়িয়ে দিন। শীতে পাটিসাপটা বা চিতই পিঠার সঙ্গে গুড়ের পায়েস জমে যায়।
যে ভুলগুলোয় পায়েস নষ্ট হয়
বিজ্ঞাপন
বেশি আঁচ: দ্রুত ঘন করার জন্য আঁচ বাড়ালে দুধ তলায় লেগে পোড়া গন্ধ হয়, যা পুরো পায়েসে ছড়িয়ে পড়ে। একবার পোড়া লাগলে সঙ্গে সঙ্গে ওপরের অংশ অন্য হাঁড়িতে ঢেলে নিন, তলার অংশ চাঁচবেন না।
বেশি চাল: চাল বেশি দিলে পায়েস ভাতের মতো দলা হয়। দুই লিটার দুধে আধা কাপ চালই যথেষ্ট।
পাতলা হাঁড়ি: ভারী তলার হাঁড়ি বা ননস্টিক পাত্র ব্যবহার করুন। পাতলা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে দুধ খুব দ্রুত তলায় ধরে যায়। হাঁড়ির তলায় আগে এক চামচ পানি বা ঘি বুলিয়ে নিলে দুধ লেগে যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমে।
নাড়ার ধরন: শুধু ওপরে ওপরে নাড়লে চলবে না। কাঠের চামচ তলায় ঠেকিয়ে আট-এর মতো করে ঘুরিয়ে নাড়ুন, হাঁড়ির কোনাগুলোও চেঁছে দিন। দুধের ওপর সর পড়লে তা ভেতরে মিশিয়ে দিন, এতে পায়েস আরও ঘন ও সুস্বাদু হয়।
বিজ্ঞাপন
ফাটা দুধ: দুধ পুরোনো বা টক হয়ে গেলে ফুটানোর সময়ই ফেটে যায়। পায়েস শুরুর আগে অল্প দুধ আলাদা করে ফুটিয়ে দেখে নিন।
মিষ্টি আগে দেওয়া: চাল সেদ্ধের আগে চিনি বা গুড় দিলে চাল ঠিকমতো গলে না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
গুঁড়া দুধ দিয়ে পায়েস হবে কি?
বিজ্ঞাপন
হবে। প্যাকেটের নির্দেশনা অনুযায়ী গুঁড়া দুধ গরম পানিতে গুলে তরল দুধ বানিয়ে নিন, স্বাদ ও ঘনত্ব বাড়াতে সামান্য বেশি গুঁড়া দুধ দিতে পারেন। বাকি নিয়ম একই।
পায়েস কত দিন ভালো থাকে?
ঢাকনা দেওয়া পাত্রে ফ্রিজে রাখলে সাধারণত দুই-তিন দিন ভালো থাকে। ঘরের তাপমাত্রায়, বিশেষ করে গরমকালে, বেশিক্ষণ ফেলে রাখবেন না।
কনডেন্সড মিল্ক দিলে কি পায়েস তাড়াতাড়ি ঘন হয়?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ, শেষ দিকে কয়েক টেবিল-চামচ কনডেন্সড মিল্ক দিলে পায়েস দ্রুত ঘন ও মিষ্টি হয়। সে ক্ষেত্রে চিনির পরিমাণ কমিয়ে দিন।
ডায়াবেটিস রোগী কি পায়েস খেতে পারবেন?
পায়েসে চিনি বা গুড় আর চাল দুটোই আছে, তাই এটি রক্তে সুগার বাড়ায়। খেলে উৎসবের দিনে খুব ছোট এক বাটি, তা-ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে।