ছারপোকা দূর করার উপায়: খাট, তোশক ও সোফা ছারপোকামুক্ত করুন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ছারপোকা দূর করার উপায় নিয়ে প্রথমেই একটি ভুল ধারণা ভাঙা দরকার: ছারপোকা হওয়া মানেই ঘর নোংরা, এমন নয়। ঝকঝকে হোটেল কক্ষ, বাস-ট্রেনের সিট, হোস্টেল বা অতিথির ব্যাগ থেকে খুব পরিচ্ছন্ন বাসাতেও ছারপোকা ঢুকে পড়তে পারে। একবার ঢুকলে খাটের জোড়া, তোশকের সেলাই আর দেয়ালের ফাটলে লুকিয়ে দ্রুত বংশ বাড়ায়।
বিজ্ঞাপন
এ কারণে ছারপোকা তাড়াতে একটি স্প্রে বা একদিনের রোদ যথেষ্ট নয়। কাজ করে কয়েকটি পদ্ধতির সমন্বয়: বিছানার কাপড় গরম পানিতে ধুয়ে কড়া রোদে বা গরমে শুকানো, তোশক-খাট-সোফার জোড়া আর ফাটল ভ্যাকুয়াম ও ভাপ দিয়ে পরিষ্কার করা, লুকানোর জায়গা বন্ধ করা এবং দুই সপ্তাহ পর একই কাজ আবার করা, কারণ ডিম থেকে নতুন ছারপোকা বের হয়।
ঘরোয়া উপায়ে অল্প উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে আসে। পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়লে পেশাদার পেস্ট কন্ট্রোলের সাহায্য নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
ছারপোকা কেন হয়, কোথায় লুকায়
ছারপোকা ছোট, চ্যাপ্টা, লালচে-বাদামি পোকা, যা মানুষের রক্ত খেয়ে বাঁচে। এরা উড়তে পারে না, লাফাতেও পারে না, তবে হামাগুড়ি দিয়ে দ্রুত চলে এবং খাবার ছাড়াও দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে।
বিজ্ঞাপন
ছারপোকা কেন হয়, তার প্রধান উত্তর হলো যাতায়াত। ভ্রমণের ব্যাগ, পুরোনো আসবাব বা তোশক কেনা, অতিথির কাপড়, এমনকি পাশের ফ্ল্যাট থেকে দেয়ালের ফাটল দিয়েও আসতে পারে।
এরা থাকে ঘুমানোর জায়গার কাছাকাছি, যেখানে রাতে মানুষের শরীর পাওয়া যায়। প্রধান লুকানোর জায়গা: তোশকের সেলাই ও কিনারা, খাটের কাঠের জোড়া ও স্ক্রুর গর্ত, খাটের পেছনের দেয়ালের ফাটল, সোফার কুশনের ভাঁজ, পর্দার ভাঁজ, বৈদ্যুতিক সুইচবোর্ডের পেছন আর বিছানার পাশের জিনিসপত্রের স্তূপ।
ছারপোকা আছে কি না বুঝবেন যেভাবে
১. কামড়ের ধরন: সকালে উঠে হাত, পা, ঘাড় বা পিঠে চুলকানিযুক্ত লাল ফোলা দাগ, অনেক সময় সারি বেঁধে বা গুচ্ছ আকারে। তবে কামড় দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না, মশা বা অন্য পোকার কামড়ও এমন হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
২. চাদরে রক্তের দাগ: ছোট ছোট লাল বা মরিচা রঙের দাগ, ঘুমের মধ্যে ছারপোকা চাপা পড়লে হয়।
৩. কালো বিন্দু: তোশকের সেলাই বা খাটের জোড়ায় কলমের ফোঁটার মতো কালো দাগ, যা ছারপোকার মল।
৪. খোলস ও ডিম: হালকা বাদামি ফাঁপা খোলস আর চালের দানার চেয়েও ছোট সাদা ডিম।
৫. গন্ধ: উপদ্রব বেশি হলে ঘরে একটি মিষ্টি-ভ্যাপসা গন্ধ পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
রাতে বাতি নিভিয়ে এক-দেড় ঘণ্টা পর টর্চ নিয়ে তোশকের কিনারা আর খাটের জোড়া দেখলে অনেক সময় জীবন্ত ছারপোকা চোখে পড়ে।
ছারপোকা মারার ঘরোয়া উপায়: ধাপে ধাপে
১. বিছানার কাপড় গরম পানিতে ধোয়া: চাদর, বালিশের কভার, মশারি, কাঁথা আর পর্দা ব্যাগে ভরে সরাসরি ধোয়ার জায়গায় নিন, যাতে ঘরে ছারপোকা না ছড়ায়। যতটা সম্ভব গরম পানিতে, অন্তত ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি, ধুয়ে কড়া রোদে বা ড্রায়ারের গরমে পুরোপুরি শুকান।
২. ভ্যাকুয়াম করা: ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের সরু মুখ দিয়ে তোশকের সেলাই, খাটের জোড়া, সোফার ভাঁজ আর মেঝের কিনারা ভালো করে টানুন। কাজ শেষে ভ্যাকুয়ামের ব্যাগ বা ধুলার কৌটা পলিথিনে শক্ত করে বেঁধে ঘরের বাইরে ফেলুন।
বিজ্ঞাপন
৩. ভাপ বা গরম পানি: ছারপোকা আর তার ডিম উচ্চ তাপে মারা যায়। স্টিমার থাকলে তোশক, সোফা আর খাটের জোড়ায় ধীরে ধীরে ভাপ দিন। কাঠের খাটের জোড়া আর স্ক্রুর গর্তে সাবধানে ফুটন্ত পানি ঢালা যায়, তবে কাঠ বা পালিশের ক্ষতি হতে পারে এবং নিজে পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।
৪. রোদে দেওয়া: তোশক, বালিশ আর কুশন কড়া রোদে কয়েক ঘণ্টা রাখুন, মাঝে উল্টে দিন। রোদের তাপ সহায়ক, তবে ভেতরের স্তর পর্যন্ত যথেষ্ট গরম না হলে সব ছারপোকা মরে না, তাই এটিকে একমাত্র উপায় ভাববেন না।
৫. লুকানোর জায়গা বন্ধ: খাটের পেছনের দেয়ালের ফাটল, ঢিলে টাইলস আর কাঠের ফাঁক পুটি দিয়ে বন্ধ করুন। খাট দেয়াল থেকে কয়েক ইঞ্চি সরিয়ে রাখুন, চাদর যেন মেঝে ছুঁয়ে না থাকে। খাটের নিচের জিনিসপত্রের স্তূপ সরিয়ে ফেলুন।
৬. তোশকের কভার: বাজারে চেন লাগানো পুরো তোশক মোড়ানোর কভার পাওয়া যায়। এতে ভেতরে আটকে থাকা ছারপোকা বের হতে পারে না, নতুন করে ঢুকতেও পারে না। কয়েক মাস কভার খুলবেন না।
বিজ্ঞাপন
৭. দুই সপ্তাহ পর আবার: ডিম থেকে নতুন ছারপোকা বের হয়, তাই এক-দুই সপ্তাহ পরপর অন্তত কয়েকবার পুরো প্রক্রিয়া চালিয়ে যান।
কীটনাশক আর পেস্ট কন্ট্রোল
বাজারে ছারপোকার জন্য বিভিন্ন স্প্রে পাওয়া যায়। লেবেলে ছারপোকার কথা লেখা আছে কি না দেখে কিনুন এবং নির্দেশনা হুবহু মেনে চলুন। বিছানার যেখানে শরীর লাগে, বালিশ বা শিশুর খাটে সরাসরি স্প্রে করবেন না, যদি লেবেলে তা অনুমোদিত না থাকে। স্প্রের সময় মাস্ক ও গ্লাভস পরুন, ঘর থেকে শিশু ও পোষা প্রাণী সরিয়ে রাখুন, পরে ভালো করে বাতাস চলাচল করান।
কেরোসিন, পেট্রল বা অন্য দাহ্য তরল বিছানায় ঢালা খুবই বিপজ্জনক। এতে আগুন লাগার ঝুঁকি থাকে এবং শ্বাসকষ্ট হতে পারে। একই কারণে ঘরের ভেতরে কীটনাশক পুড়িয়ে ধোঁয়া দেওয়াও ঠিক নয়।
বিজ্ঞাপন
পুরো বাসায় ছড়িয়ে পড়লে, বা কয়েক সপ্তাহ চেষ্টার পরও কামড় কমছে না, এমন হলে পেশাদার পেস্ট কন্ট্রোল সেবা নিন। তাঁরা সাধারণত দুই বা তিন দফায় চিকিৎসা করেন। ফ্ল্যাট বাড়িতে পাশের ফ্ল্যাটেও খোঁজ নিন, নইলে আবার ফিরে আসতে পারে।
ছারপোকার কামড়: কী করবেন
ছারপোকার কামড় সাধারণত বিপজ্জনক রোগ ছড়ায় বলে জানা যায় না, তবে চুলকানি আর ঘুমের ব্যাঘাত বড় সমস্যা। কামড়ের জায়গা সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে নিন, ঠান্ডা সেঁক দিন। নখ দিয়ে চুলকাবেন না, এতে ক্ষত হয়ে সংক্রমণ হতে পারে। ক্যালামাইন লোশনে অনেকে আরাম পান।
চুলকানি খুব বেশি হলে, ক্ষতে পুঁজ জমলে, শরীর ফুলে গেলে বা শ্বাসকষ্ট হলে চিকিৎসকের কাছে যান। শিশুর শরীরে অনেক কামড় দেখা দিলেও শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখান।
বিজ্ঞাপন
ছারপোকা যেন আবার না ফেরে
ভ্রমণ থেকে ফিরে ব্যাগ বিছানায় না রেখে মেঝেতে বা বারান্দায় খুলুন, কাপড় সরাসরি ধুয়ে ফেলুন। হোটেলে উঠে তোশকের কিনারা আর খাটের জোড়া একবার দেখে নিন। পুরোনো আসবাব, তোশক বা সোফা কেনার আগে ভালো করে পরীক্ষা করুন। মাসে একবার তোশক উল্টে কিনারাগুলো দেখে নেওয়ার অভ্যাস করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ছারপোকা কি শুধু রাতে কামড়ায়?
বিজ্ঞাপন
মূলত রাতে, মানুষ ঘুমিয়ে থাকলে কামড়ায়। তবে অনেক দিন রক্ত না পেলে দিনেও অন্ধকার জায়গায় কামড়াতে পারে।
খাবার ছাড়া ছারপোকা কত দিন বাঁচে?
পরিবেশভেদে খাবার ছাড়াও কয়েক মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। তাই কিছুদিন ঘর ফাঁকা রাখলেই ছারপোকা মরে যাবে, এমন ভাবা ঠিক নয়।
নিমপাতা বা ন্যাপথলিন কি কাজ করে?
বিজ্ঞাপন
নিমপাতার কার্যকারিতার শক্ত প্রমাণ নেই। ন্যাপথলিনের গ্যাস মানুষের জন্য ক্ষতিকর, বিশেষ করে শিশুদের জন্য, তাই বিছানায় ব্যবহার করবেন না।
নতুন তোশক কিনলেই কি সমাধান?
খাট, দেয়াল আর অন্যান্য আসবাবে ছারপোকা থাকলে নতুন তোশকেও দ্রুত চলে আসবে। পুরো ঘর পরিষ্কার করার পরই নতুন তোশক আনুন।