ঢোলের তালে লাঠিখেলা মেলা, শত বছর পরও জমজমাট
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী উপস্থিতিতে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে
মাগুরা জেলা প্রতিনিধি · মহম্মদপুর, মাগুরা
প্রকাশ:
ঢোলের তালে লাঠির ছন্দময় লড়াই দিয়ে মেলা শুরু হয়। মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার ডুমুরশিয়া গ্রামে প্রতি বছর কার্তিক মাসের ১৬ তারিখে ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা মেলা অনুষ্ঠিত হয়; এই বছর ২১ কার্তিক, গতকাল শুক্রবার থেকে দুই দিনব্যাপী ১০৬তম আয়োজন শুরু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে ডুমুরশিয়া ডিসি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে মেলা উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, যিনি লাঠিখেলায় নিজেই অংশ নেন এবং দর্শকদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেন। সন্ধ্যার পর একই স্থানে বিচারগানের আসর অনুষ্ঠিত হয়।
বিজ্ঞাপন
১৯১৩ সালের পর কোনো এক সময় থেকে এই আয়োজন নিয়মিতভাবে হয় আসছে, তবে প্রথম আয়োজনের নির্দিষ্ট সাল অজানা। ১৯৯৮ সাল থেকে লাঠিখেলা ও মেলার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয় এবং তখন থেকে মেলা দুই দিনব্যাপী চলে আসছে। লাঠিখেলার ঐতিহ্য এক শতাব্দীরও আগে ডুমুরশিয়া গ্রামে একটি পরিবারের উদ্যোগে শুরু হয়।
মাগুরা সদর উপজেলার বাগবাড়িয়ার বাসিন্দা ইমাম উদ্দিন সরদার ডুমুরশিয়া গ্রামে বিয়ে করে পশ্চিম পাড়ায় স্থায়ী হন; তিনি তৎকালীন তালুকদার মতিউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও লাঠিখেলার পারদর্শী ছিলেন এবং নিজের বাড়ির সামনে ও তালুকদারের ঘরোয়ায় শারীরিক কসরতের আয়োজন করতেন। ইমাম উদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে চিকিৎসক মোকররম হোসেন বাবার স্মৃতি রক্ষায় প্রতিবছর লাঠিখেলা ও মেলার আয়োজন চালিয়ে যান। পরে তাঁর ছেলে চিকিৎসক আবদুর রাজ্জাক এবং ডুমুরশিয়া ও চালিমিয়া গ্রামের মাতব্বরদের সহযোগিতায় আয়োজনটি বার্ষিক উৎসবে রূপ নেয়; এক পর্যায়ে দায়িত্ব ডুমুরশিয়া বাজার বণিক সমিতি নেয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুসারে, ১৯১৩ সালের পর কোনো এক সময় থেকে নিয়মিত আয়োজন হয়ে আসছে, তবে প্রথম আয়োজনের নির্দিষ্ট সাল জানা যায়নি। ১৯৯৮ সাল থেকে লাঠিখেলা ও মেলার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয় এবং মেলা দুই দিনব্যাপী চলতে থাকে। নিতাই রায় চৌধুরী মেলায় বলেন, "লাঠিখেলা আবহমান বাংলার প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ। এসব খেলাধুলা গ্রামীণ জনপদের জীবন ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।"
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আরিফুজ্জামান জানান, "মেলা দিন ডুমুরশিয়াসহ আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। ঈদ বা পূজার মতোই চলে প্রস্তুতি। জামাই–মেয়ে, নাতি–নাতনিদের মেলায় আসার দাওয়াত দেওয়া হয়। ঘরে ঘরে মুড়ি–চিড়া ভাজা, কাপড়চোপড় পরিষ্কারের আয়োজন চলে। অনেকের কাছে এটি শুধু লাঠিখেলা দেখার দিন নয়, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হওয়ারও উপলক্ষ।" মেলা মাঠের বাইরে খাবারের দোকান, খেলনা ও বড় বড় মাছ বিক্রি করে জেলেরা বসেন; দর্শকরা লাঠিখেলা উপভোগ করেন এবং সন্ধ্যায় বিচারগানের আসরে অংশ নেন।
বিজ্ঞাপন
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন মাগুরা জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ ও মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী। অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে ডুমুরশিয়া বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেন ছিলেন। আবুল হোসেন বলেন, "জমিদারি আমলে লাঠিয়াল বাহিনীর শারীরিক কসরত ও আত্মরক্ষার চর্চা থেকে বাংলায় লাঠিখেলার বিস্তার ঘটেছিল। সময়ের সঙ্গে এর সামরিক ও জমিদারি প্রেক্ষাপট হারিয়ে গেলেও বিনোদন ও লোকসংস্কৃতির অংশ হিসেবে খেলাটি টিকে আছে। এখন এই আয়োজন ডুমুরশিয়ার ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ১০৬তম আয়োজন সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।"