কম্পিউটার ফাস্ট করার উপায়: স্লো উইন্ডোজ পিসির দ্রুত সমাধান
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
সকালে কম্পিউটার চালু করে চা বানাতে চলে যান, ফিরে এসে দেখেন এখনো ঘুরছে লোডিংয়ের চাকা। একটা ফাইল খুলতে গেলে আধা মিনিট, ব্রাউজারে দুটো ট্যাব খুললেই সব আটকে যায়। স্লো কম্পিউটার শুধু বিরক্তিকর নয়, কাজের সময়ও খেয়ে ফেলে।
বিজ্ঞাপন
সুখবর হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কম্পিউটার স্লো হওয়ার কারণ যন্ত্র নষ্ট হওয়া নয়, বরং জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় প্রোগ্রাম, ভরা স্টোরেজ আর অবহেলিত রক্ষণাবেক্ষণ। কম্পিউটার ফাস্ট করার উপায়গুলোর বড় অংশই বিনা খরচে, ঘরে বসে করা যায়: চালুর সময় নিজে থেকে খুলে যাওয়া প্রোগ্রাম বন্ধ করা, স্টোরেজ খালি করা, অব্যবহৃত সফটওয়্যার মুছে ফেলা, উইন্ডোজ হালনাগাদ রাখা আর ভাইরাস স্ক্যান করা। এতে কাজ না হলে পুরোনো হার্ডডিস্কের বদলে এসএসডি বসানো বা র্যাম বাড়ানো সবচেয়ে কার্যকর উন্নয়ন।
কম্পিউটার দ্রুত করার উপায় খুঁজতে গিয়ে অনেকে শুরুতেই নতুন যন্ত্রাংশ কিনে ফেলেন, অথচ আগে বিনা খরচের ধাপগুলো সেরে নিলে বহু ক্ষেত্রে তার দরকারই পড়ে না। নিচের পরামর্শগুলো মূলত উইন্ডোজ ১০ ও ১১ চালিত ডেস্কটপ এবং ল্যাপটপের জন্য। সংস্করণভেদে মেনুর নাম কিছুটা আলাদা হতে পারে।
কম্পিউটার স্লো কেন হয়
সমাধানের আগে কারণ বোঝা জরুরি, কারণ ভুল জায়গায় চিকিৎসা করলে ফল আসে না।
বিজ্ঞাপন
১. চালুর সময় অনেক প্রোগ্রাম: সফটওয়্যার ইনস্টল করার সময় অনেকগুলোই নিজেকে স্টার্টআপে যুক্ত করে নেয়। ফলে কম্পিউটার চালু হলেই এক ডজন প্রোগ্রাম পেছনে চলতে থাকে।
২. স্টোরেজ প্রায় ভরা: সিস্টেম ড্রাইভ, সাধারণত সি ড্রাইভ, প্রায় ভরে গেলে উইন্ডোজ সাময়িক ফাইল রাখার জায়গা পায় না, তখন সব কাজ ধীর হয়।
৩. কম র্যাম: আজকের ব্রাউজার ও সফটওয়্যার আগের চেয়ে অনেক বেশি মেমোরি চায়। কম র্যামে একসঙ্গে কয়েকটি কাজ করলে কম্পিউটার হাঁপিয়ে ওঠে।
৪. পুরোনো হার্ডডিস্ক: ঘূর্ণায়মান চাকতির প্রচলিত হার্ডডিস্ক এসএসডির তুলনায় অনেক ধীর। বয়স বাড়লে এর গতি আরও কমে।
বিজ্ঞাপন
৫. ভাইরাস ও অপ্রয়োজনীয় সফটওয়্যার: ক্ষতিকর প্রোগ্রাম গোপনে প্রসেসর ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে।
৬. অতিরিক্ত গরম: ভেতরে ধুলা জমে ফ্যান ঠিকমতো কাজ না করলে প্রসেসর নিজেকে রক্ষা করতে গতি কমিয়ে দেয়।
বিনা খরচে প্রথম সাত সমাধান
১. স্টার্টআপ প্রোগ্রাম বন্ধ করুন: কি-বোর্ডে Ctrl, Shift আর Esc একসঙ্গে চাপলে টাস্ক ম্যানেজার খোলে। সেখানে "স্টার্টআপ" বা "স্টার্টআপ অ্যাপস" অংশে দেখুন কোন প্রোগ্রামগুলো চালুর সময় খুলছে এবং প্রভাব কতটা। যেগুলো প্রতিদিন দরকার নেই, যেমন গেম লঞ্চার বা আপডেট চেকার, সেগুলো ডিজেবল করুন। অ্যান্টিভাইরাস বা টাচপ্যাড-সাউন্ডের ড্রাইভার বন্ধ করবেন না।
বিজ্ঞাপন
২. অব্যবহৃত সফটওয়্যার আনইনস্টল করুন: সেটিংসের "অ্যাপস" অংশে গিয়ে তালিকা দেখুন। কয়েক মাস ব্যবহার না করা সফটওয়্যার, বিশেষ করে নিজে থেকে ঢুকে পড়া টুলবার বা ট্রায়াল প্রোগ্রাম মুছে ফেলুন।
৩. স্টোরেজ খালি করুন: সেটিংসের "সিস্টেম" অংশে "স্টোরেজ"-এ গেলে কোন ধরনের ফাইল কত জায়গা নিচ্ছে দেখা যায়। সেখান থেকে সাময়িক ফাইল মুছে ফেলুন এবং "স্টোরেজ সেন্স" চালু রাখুন, যা নিয়মিত অপ্রয়োজনীয় ফাইল পরিষ্কার করে। ডাউনলোড ফোল্ডার আর রিসাইকেল বিন খালি করুন। সি ড্রাইভে অন্তত কিছুটা জায়গা সব সময় ফাঁকা রাখার চেষ্টা করুন।
৪. উইন্ডোজ ও ড্রাইভার হালনাগাদ রাখুন: সেটিংসের "উইন্ডোজ আপডেট" অংশে নিয়মিত আপডেট নিন। আপডেটে নিরাপত্তার ত্রুটি ও অনেক কার্যক্ষমতার সমস্যার সমাধান থাকে।
৫. ভাইরাস স্ক্যান করুন: উইন্ডোজের নিজস্ব "উইন্ডোজ সিকিউরিটি" দিয়ে পূর্ণ স্ক্যান চালান। একাধিক অ্যান্টিভাইরাস একসঙ্গে চালাবেন না, এতে কম্পিউটার আরও ধীর হয়।
বিজ্ঞাপন
৬. ব্রাউজার হালকা রাখুন: অনেক সময় কম্পিউটার নয়, ব্রাউজারই ধীর। একসঙ্গে বিশটি ট্যাব খোলা রাখা, অপ্রয়োজনীয় এক্সটেনশন জমানো, এসব র্যাম খেয়ে ফেলে। দরকার নেই এমন এক্সটেনশন সরিয়ে দিন, আর পরে পড়ার জিনিস বুকমার্ক করে ট্যাব বন্ধ করুন।
৭. নিয়মিত রিস্টার্ট দিন: দিনের পর দিন শুধু স্লিপ মোডে রাখলে মেমোরিতে জঞ্জাল জমে। সপ্তাহে অন্তত কয়েকবার পুরোপুরি রিস্টার্ট দিন।
সেটিংসের ছোট কিছু পরিবর্তন
পাওয়ার মোড: ল্যাপটপে ব্যাটারি বাঁচানোর মোড চালু থাকলে প্রসেসর ইচ্ছা করে ধীরে চলে। চার্জারে যুক্ত থাকা অবস্থায় সেটিংসের পাওয়ার অংশ থেকে "বেস্ট পারফরম্যান্স" বা "ব্যালান্সড" বেছে নিন।
বিজ্ঞাপন
ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট কমানো: পুরোনো বা কম শক্তির কম্পিউটারে জানালা খোলা-বন্ধের অ্যানিমেশন ও স্বচ্ছতার ইফেক্ট বন্ধ করলে কিছুটা গতি বাড়ে। উইন্ডোজের সার্চে "পারফরম্যান্স" লিখে "অ্যাডজাস্ট দ্য অ্যাপিয়ারেন্স অ্যান্ড পারফরম্যান্স অব উইন্ডোজ" অপশনে এটি পাওয়া যায়।
পেছনের অ্যাপ সীমিত করা: কিছু অ্যাপ ব্যবহার না করলেও পেছনে চলতে থাকে। অ্যাপের সেটিংস থেকে প্রয়োজনে এদের পটভূমিতে চলার অনুমতি বন্ধ করা যায়।
ক্লাউড সিংক নিয়ন্ত্রণ: ক্লাউড স্টোরেজের প্রোগ্রাম একসঙ্গে বিপুল ফাইল সিংক করলে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট দুটোই ধীর হয়। জরুরি কাজের সময় সাময়িকভাবে সিংক থামিয়ে রাখা যায়।
গরম আর ধুলার কথা ভুলবেন না
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ধুলা আর গরম কম্পিউটারের নীরব শত্রু। ল্যাপটপ বিছানা বা বালিশের ওপর রেখে চালালে নিচের বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। শক্ত, সমতল জায়গায় রাখুন, প্রয়োজনে ল্যাপটপ স্ট্যান্ড ব্যবহার করুন।
ডেস্কটপের কেসিং বা ল্যাপটপের ভেতরে বছরে অন্তত একবার ধুলা পরিষ্কার করানো ভালো। নিজে কেসিং খুলতে অস্বস্তি লাগলে অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানের সাহায্য নিন। পুরোনো ল্যাপটপে প্রসেসরের থার্মাল পেস্ট শুকিয়ে গেলেও তাপমাত্রা বাড়ে, যা সার্ভিসিংয়ের সময় বদলে নেওয়া যায়।
হার্ডওয়্যার উন্নয়ন: যখন সফটওয়্যারে কাজ হয় না
সব চেষ্টার পরও কম্পিউটার ধীর থাকলে বুঝবেন, সমস্যা যন্ত্রের সক্ষমতায়। তখন দুটি উন্নয়ন সবচেয়ে বেশি ফল দেয়।
বিজ্ঞাপন
এসএসডি বসানো: পুরোনো হার্ডডিস্কের জায়গায় এসএসডি বসালে কম্পিউটার চালু হওয়া, প্রোগ্রাম খোলা আর ফাইল কপি, সব কিছুর গতি নাটকীয়ভাবে বাড়ে। কম খরচে স্লো কম্পিউটারকে নতুন জীবন দেওয়ার এটিই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। উইন্ডোজসহ পুরোনো ডেটা নতুন এসএসডিতে স্থানান্তর করা যায়, তবে আগে ব্যাকআপ নিয়ে রাখুন।
র্যাম বাড়ানো: একসঙ্গে অনেক কাজ করলে বা টাস্ক ম্যানেজারে মেমোরি ব্যবহার প্রায় সব সময় পূর্ণ দেখালে বাড়তি র্যাম উপকারী। তবে আগে নিশ্চিত হোন আপনার মাদারবোর্ড বা ল্যাপটপে বাড়তি র্যাম বসানোর জায়গা ও সমর্থন আছে কি না, এবং কোন ধরনের র্যাম লাগবে। কিছু পাতলা ল্যাপটপে র্যাম বোর্ডের সঙ্গে স্থায়ীভাবে লাগানো থাকে, বদলানো যায় না।
খুব পুরোনো প্রসেসরের কম্পিউটারে অবশ্য এই উন্নয়নেও সীমিত ফল আসে। তখন খরচের হিসাব করে নতুন যন্ত্র কেনার কথা ভাবা যুক্তিসংগত।
শেষ উপায়: উইন্ডোজ রিসেট
বিজ্ঞাপন
অনেক বছরের জমা জঞ্জাল, ভাঙা সেটিংস আর অজানা প্রোগ্রামে সিস্টেম ভারী হয়ে গেলে উইন্ডোজ রিসেট বা নতুন করে ইনস্টল করা কার্যকর। সেটিংসের "রিকভারি" অংশে "রিসেট দিস পিসি" অপশন আছে, যেখানে ব্যক্তিগত ফাইল রেখে বা সব মুছে নতুন করে শুরু করা যায়। কাজটির আগে জরুরি ফাইলের ব্যাকআপ অবশ্যই নেবেন, আর প্রয়োজনীয় সফটওয়্যারের লাইসেন্স ও ইনস্টলার হাতের কাছে রাখবেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ক্লিনার বা "পিসি বুস্টার" সফটওয়্যার কি কাজে আসে?
উইন্ডোজের নিজস্ব স্টোরেজ সেন্স ও টাস্ক ম্যানেজার দিয়েই বেশির ভাগ কাজ হয়। অনেক বুস্টার সফটওয়্যার নিজেই পেছনে চলে কম্পিউটার ধীর করে বা বিজ্ঞাপন দেখায়। অজানা উৎস থেকে এমন সফটওয়্যার নামাবেন না।
বিজ্ঞাপন
ল্যাপটপ ফাস্ট করার উপায় কি ডেস্কটপের মতোই?
মূল পদ্ধতি একই। বাড়তি হিসেবে ল্যাপটপে পাওয়ার মোড, ব্যাটারির অবস্থা ও তাপমাত্রার দিকে বিশেষ নজর দিন। চার্জারে যুক্ত থাকলে সাধারণত কার্যক্ষমতা বেশি থাকে।
হার্ডডিস্ক ডিফ্র্যাগমেন্ট করা কি দরকার?
প্রচলিত হার্ডডিস্কের ক্ষেত্রে উইন্ডোজ সাধারণত নিজেই নির্দিষ্ট সময়ে অপ্টিমাইজ করে। এসএসডিতে প্রচলিত ডিফ্র্যাগমেন্ট দরকার নেই, উইন্ডোজ এর জন্য আলাদা পদ্ধতি ব্যবহার করে।
বিজ্ঞাপন
নতুন কম্পিউটারও কয়েক মাসে স্লো হয়ে যায় কেন?
সাধারণত একের পর এক সফটওয়্যার ইনস্টল, স্টার্টআপে প্রোগ্রাম জমা এবং স্টোরেজ ভরে যাওয়ার কারণে। শুরু থেকেই প্রয়োজন ছাড়া সফটওয়্যার না নামানো আর মাসে একবার পরিষ্কারের অভ্যাস রাখলে গতি দীর্ঘদিন ভালো থাকে।