ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নের নিয়ম: অনলাইনে আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজ
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, অথচ প্রতিদিনই গাড়ি বা মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামছেন। ট্রাফিক পুলিশ থামালে মামলা হতে পারে, আর দুর্ঘটনা ঘটলে বিমা ও আইনি জটিলতা বাড়ে। তাই মেয়াদ শেষের আগেই নবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
বিজ্ঞাপন
ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নের পুরো প্রক্রিয়া এখন অনলাইনে শুরু হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএর অফিশিয়াল বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল bsp.brta.gov.bd-এ নিবন্ধন করে নবায়নের আবেদন করতে হয়। এরপর নির্ধারিত ফি অনলাইনে বা নির্দিষ্ট ব্যাংকে জমা দিয়ে, আবেদনে বেছে নেওয়া বিআরটিএ সার্কেল অফিসে নির্দিষ্ট দিনে গিয়ে ছবি, আঙুলের ছাপ ও সই দিতে হয়। কাজ শেষে স্মার্ট কার্ড লাইসেন্স প্রস্তুত হলে এসএমএসে জানানো হয়।
নবায়নের জন্য মূল কাগজ চারটি: পুরোনো লাইসেন্স, জাতীয় পরিচয়পত্র, নিবন্ধিত চিকিৎসকের দেওয়া মেডিকেল সনদ এবং ফি জমার রসিদ। প্রক্রিয়া ও ফি সময়ে সময়ে বদলায়, তাই আবেদনের আগে পোর্টালের হালনাগাদ নির্দেশনা দেখে নিন।
লাইসেন্সের মেয়াদ ও কখন নবায়ন করবেন
লাইসেন্স দুই ধরনের: পেশাদার, যাঁরা চালক হিসেবে পেশা চালান তাঁদের জন্য, আর অপেশাদার, যাঁরা নিজের গাড়ি নিজে চালান তাঁদের জন্য। বর্তমান ব্যবস্থায় সাধারণত পেশাদার লাইসেন্সের মেয়াদ অপেশাদারের চেয়ে কম রাখা হয়, যাতে পেশাদার চালকদের স্বাস্থ্য ও দক্ষতা ঘন ঘন যাচাই হয়। আপনার লাইসেন্সের মেয়াদ কার্ডের ওপরেই লেখা থাকে।
বিজ্ঞাপন
মেয়াদ শেষ হওয়ার কিছুদিন আগে থেকেই নবায়নের আবেদন করা যায়। মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও নবায়ন করা যায়, তবে দেরির জন্য বাড়তি ফি দিতে হয় এবং দীর্ঘদিন মেয়াদোত্তীর্ণ থাকলে অতিরিক্ত শর্ত প্রযোজ্য হতে পারে। তাই মেয়াদ শেষের অন্তত এক-দুই মাস আগে প্রক্রিয়া শুরু করা ভালো।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
১. পুরোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স: মূল কার্ড ও এর একটি কপি। পুরোনো কাগজের বই ধরনের লাইসেন্স থাকলে সেটিও।
২. জাতীয় পরিচয়পত্র: অনলাইন নিবন্ধনে পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাই হয়। লাইসেন্স আর পরিচয়পত্রের নাম, জন্মতারিখ মিলতে হবে।
বিজ্ঞাপন
৩. মেডিকেল সনদ: নিবন্ধিত এমবিবিএস চিকিৎসকের দেওয়া শারীরিক সক্ষমতার সনদ, যেখানে দৃষ্টিশক্তি ও সাধারণ স্বাস্থ্যের তথ্য থাকে। বিআরটিএ নির্ধারিত ফরম্যাট থাকলে সেটিই ব্যবহার করুন।
৪. ছবি: অনলাইন আবেদনে সাম্প্রতিক ছবি আপলোড করতে হতে পারে। স্মার্ট কার্ডের ছবি সাধারণত সার্কেল অফিসেই তোলা হয়।
৫. ফি জমার প্রমাণ: অনলাইনে পরিশোধ করলে রসিদের প্রিন্ট বা স্ক্রিনশট, ব্যাংকে জমা দিলে রসিদের কপি।
অনলাইনে আবেদনের ধাপ
বিজ্ঞাপন
পোর্টালের নকশা ও মেনুর নাম মাঝে মাঝে বদলায়। তবে সাধারণ ধাপগুলো এমন।
১. নিবন্ধন: bsp.brta.gov.bd ঠিকানায় গিয়ে নিজের মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দিয়ে একটি একাউন্ট খুলুন। মোবাইলে আসা কোড দিয়ে নিবন্ধন নিশ্চিত করুন। আগে থেকে একাউন্ট থাকলে লগইন করুন।
২. নবায়নের সেবা বেছে নিন: ড্রাইভিং লাইসেন্স সংক্রান্ত সেবার তালিকা থেকে নবায়নের অপশন বেছে নিন।
৩. লাইসেন্সের তথ্য দিন: পুরোনো লাইসেন্স নম্বর, ইস্যুর তারিখ ও অন্যান্য তথ্য দিন। তথ্য মিললে আপনার লাইসেন্সের বিবরণ দেখাবে।
বিজ্ঞাপন
৪. কাগজপত্র আপলোড: মেডিকেল সনদ, ছবি বা চাওয়া অন্য কাগজ স্ক্যান করে নির্দিষ্ট আকারে আপলোড করুন।
৫. সার্কেল অফিস বেছে নিন: যে বিআরটিএ সার্কেল অফিসে বায়োমেট্রিক দিতে সুবিধা, সেটি নির্বাচন করুন।
৬. ফি পরিশোধ: পোর্টালে দেখানো ফি অনলাইন পেমেন্ট বা নির্ধারিত ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করুন। পরিশোধ শেষে রসিদ সংরক্ষণ করুন।
৭. আবেদন জমা ও প্রিন্ট: সব তথ্য মিলিয়ে আবেদন জমা দিন এবং আবেদনের কপি প্রিন্ট করে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
আবেদনের সময় সবচেয়ে বেশি ঝামেলা হয় তথ্যের অমিল নিয়ে। পুরোনো লাইসেন্সে নামের বানান একরকম আর জাতীয় পরিচয়পত্রে আরেকরকম হলে, কিংবা জন্মতারিখে ভিন্নতা থাকলে আবেদন আটকে যেতে পারে। এমন হলে আগে বিআরটিএ সার্কেল অফিসে গিয়ে কী সংশোধন লাগবে জেনে নিন। আবার পুরোনো হাতে লেখা বা বই ধরনের লাইসেন্সের তথ্য অনেক সময় অনলাইনে খুঁজে পাওয়া যায় না, তখনও অফিসের সাহায্য লাগে।
ছবি ও কাগজ আপলোডের সময় পোর্টালে নির্দিষ্ট আকার ও ফাইলের ধরন বলা থাকে। মোবাইলে তোলা ছবি অনেক সময় বড় হয়, তাই প্রয়োজনে আকার ছোট করে নিন। আর আবেদনের সময় যে মোবাইল নম্বর দিচ্ছেন, সেটি যেন সচল থাকে, কারণ পরের সব খবর ওই নম্বরেই আসবে।
লাইসেন্স নবায়ন ফি নিয়ে যা জানা দরকার
লাইসেন্স নবায়ন ফি নির্ভর করে লাইসেন্স পেশাদার নাকি অপেশাদার, কত বছরের জন্য নবায়ন হচ্ছে এবং মেয়াদ পেরিয়ে কত দিন দেরি হয়েছে তার ওপর। ফির সঙ্গে সরকারি ভ্যাট যুক্ত হয়। সরকার সময়ে সময়ে এই হার বদলায়, তাই এখানে নির্দিষ্ট অঙ্ক দেওয়া হলো না। আবেদনের সময় পোর্টালেই আপনার লাইসেন্সের জন্য প্রযোজ্য ফি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেখানো হয়। এর বাইরে কোনো দালাল বাড়তি টাকা চাইলে বুঝবেন সেটি সরকারি ফি নয়।
বিজ্ঞাপন
সার্কেল অফিসে বায়োমেট্রিক ও কার্ড সংগ্রহ
আবেদনের পর এসএমএসে বা পোর্টালে বায়োমেট্রিকের তারিখ জানানো হয়। নির্ধারিত দিনে মূল লাইসেন্স, জাতীয় পরিচয়পত্র, আবেদনের প্রিন্ট ও ফির রসিদ নিয়ে সার্কেল অফিসে যান। সেখানে ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ ও ডিজিটাল সই নেওয়া হয়।
বায়োমেট্রিকের পর স্মার্ট কার্ড প্রস্তুত হতে কিছু সময় লাগে। এ সময় গাড়ি চালানোর জন্য সাধারণত আবেদনের রসিদ বা অস্থায়ী কাগজ দেওয়া হয়, যা সঙ্গে রাখবেন। কার্ড প্রস্তুত হলে এসএমএস আসে, তখন সার্কেল অফিস থেকে বা নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংগ্রহ করুন। আবেদনের অবস্থা পোর্টালে লগইন করেও দেখা যায়।
বায়োমেট্রিকের দিনে সকাল সকাল যাওয়া ভালো, কারণ অনেক অফিসে দিনের শেষ দিকে ভিড় বাড়ে। চশমা পরে গাড়ি চালালে ছবি তোলার সময় সে বিষয়ে কর্মকর্তার নির্দেশনা মেনে চলুন। আঙুলের ছাপ না মিললে হাত পরিষ্কার করে আবার চেষ্টা করা হয়, তাই ঘাবড়ানোর কিছু নেই।
বিজ্ঞাপন
দালাল এড়িয়ে চলুন। পুরো প্রক্রিয়া নিজে অনলাইনে করা যায়, আর বিআরটিএ অফিসে প্রতিটি ধাপের নির্দেশনা দেওয়া থাকে। কেউ "দ্রুত করিয়ে দেব" বলে টাকা চাইলে সতর্ক থাকুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মেয়াদ শেষ হওয়া লাইসেন্স দিয়ে কি গাড়ি চালানো যায়?
না। মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সে গাড়ি চালালে আইন অনুযায়ী জরিমানা হতে পারে। নবায়নের আবেদন করে থাকলে আবেদনের রসিদ ও প্রয়োজনীয় কাগজ সঙ্গে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
অন্য জেলা থেকে কি নবায়ন করা যায়?
অনলাইন আবেদনের সময় সুবিধাজনক সার্কেল অফিস বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে। তবে নিয়ম বদলাতে পারে, তাই আবেদনের সময় পোর্টালে দেখে নিন।
নবায়নের সময় কি আবার পরীক্ষা দিতে হয়?
সাধারণ নবায়নে আবার লিখিত বা মাঠ পরীক্ষা দিতে হয় না। তবে খুব দীর্ঘ সময় মেয়াদোত্তীর্ণ থাকলে বা বিশেষ ক্ষেত্রে বাড়তি শর্ত থাকতে পারে, যা বিআরটিএ থেকে জেনে নিন।
বিজ্ঞাপন
স্মার্ট কার্ড পেতে কত দিন লাগে?
সময় নির্দিষ্ট নয়, কার্ড ছাপার চাপ ও অফিসভেদে আলাদা হয়। এসএমএস না আসা পর্যন্ত পোর্টালে আবেদনের অবস্থা দেখতে থাকুন এবং অস্থায়ী কাগজ সঙ্গে রাখুন।
প্রবাসে থাকলে লাইসেন্স নবায়ন করব কীভাবে?
অনলাইন আবেদন বিদেশ থেকেও শুরু করা যায়, কিন্তু ছবি ও আঙুলের ছাপ দিতে সাধারণত সশরীরে বিআরটিএ সার্কেল অফিসে উপস্থিত থাকতে হয়। তাই দেশে আসার সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে আবেদনের পরিকল্পনা করুন এবং বিশেষ কোনো ব্যবস্থা আছে কি না বিআরটিএ থেকে জেনে নিন।