বরিশাল মহাশ্মশানে দীপাবলি: দুই শতাব্দীর স্মৃতিতে হাজারো প্রদীপ
প্রয়াত স্বজনদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হাজারো মানুষের সমাগম হয়েছে কাউনিয়ার এ ঐতিহাসিক মহাশ্মশানে।
বরিশাল জেলা প্রতিনিধি · বরিশাল
প্রকাশ:
গোধূলির আলো মিলিয়ে যাওয়ার পর সন্ধ্যা নামতেই বরিশাল নগরের কাউনিয়া এলাকার মহাশ্মশানে জ্বলে ওঠে হাজারো মোমবাতি ও প্রদীপ। আলোয় ঝলমল করে ওঠে সারি সারি সমাধি। কোথাও ধূপ-আগরবাতির সুবাস, আবার কোথাও স্বজনদের চোখের জল। কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছেন, আবার কেউবা স্মৃতির অতীতে ফিরে গিয়ে প্রিয়জনদের খুঁজছেন। শনিবার সন্ধ্যায় এমনই আবেগঘন দৃশ্য দেখা যায় এই আয়োজনে।
বিজ্ঞাপন
প্রয়াত পূর্বপুরুষ ও স্বজনদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দূরদূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ এখানে সমবেত হয়েছেন। অনেকে প্রিয়জনের পছন্দের খাবার যেমন ইলিশ ও পায়েস সমাধির পাশে সাজিয়ে রেখেছেন। দুই দিনব্যাপী এই আয়োজন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এক আবেগময় মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
প্রায় ছয় একর জমির ওপর বিস্তৃত বরিশালের পশ্চিম কাউনিয়া ও নতুন বাজার এলাকার এই মহাশ্মশান নগরের পত্তনেরও আগের। ইতিহাস অনুযায়ী, ধনাঢ্য জমিদারদের সহায়তায় প্রথমে নতুন বাজার এলাকায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরে কাউনিয়া পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন এই মহাশ্মশানে ৭০ হাজারের বেশি সমাধি বা মঠ রয়েছে, যা দেশের অন্যতম বৃহৎ শ্মশান হিসেবে পরিচিত।
১৯২৭ সাল থেকে এই মহাশ্মশানে দীপাবলি উদযাপিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর কালীপূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশীর পুণ্য তিথিতে এই বিশেষ আয়োজন করা হয়। ভারত ও নেপালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকে এখানে ছুটে আসেন। অনেকের কাছে এটি শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং শিকড়ের টানে প্রিয়জনদের স্মৃতির সান্নিধ্যে ফিরে আসা।
ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক থেকে এই মহাশ্মশানটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে শায়িত আছেন কবি জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশ ও পিতামহ সর্বানন্দ দাশ। এছাড়া ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, কালিচন্দ্র ঘোষ ও মনোরমা বসুসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এখানে সমাহিত। ২০১২ সালে মৃত্যুর প্রায় ৮০ বছর পর অশ্বিনীকুমার দত্তের চিতাভস্ম ভারতের কেওড়াতলা মহাশ্মশান থেকে এনে এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এখানে আসা স্বজনদের ভাষ্যমতে, চতুর্দশী তিথিতে প্রতিবছর তারা প্রিয়জনদের আত্মার শান্তি কামনা করতে আসেন। কারও মা-বাবা, সন্তান কিংবা জীবনসঙ্গী এখানে শায়িত রয়েছেন। ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি স্বজনদের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও স্মৃতিচারণের মাধ্যমে পুরো এলাকা মিলনমেলায় রূপ নেয়।
প্রিয়াংকা নন্দী নামের এক দর্শনার্থী জানান, "আত্মীয়স্বজনের আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই তাঁরা প্রতিবছর এখানে ছুটে আসেন। জীবনের নানা ব্যস্ততা পেরিয়ে এই দিনে আপনজনদের কাছে ফিরে আসার চেষ্টা করেন।"
কাউনিয়া মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সভাপতি অসীম কুমার দাস মুরালী বলেন, "দীপাবলি উপলক্ষে দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ এখানে আসেন। ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকেও দর্শনার্থীরা এ আয়োজনে অংশ নেন। তাঁদের আগমনকে কেন্দ্র করে মহাশ্মশান এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।"
দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। মহাশ্মশান এলাকায় পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কাজ করছেন।
বিজ্ঞাপন
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) সুশান্ত সরকার জানান, "মহাশ্মশানে দীপাবলি উৎসবের নিরাপত্তায় পুলিশের প্রায় ৩০০ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের সদস্যরাও নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন। এ ছাড়া সাদাপোশাকে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছেন।"