ভাপা পিঠা রেসিপি: শীতের সকালে গুড়-নারকেলের নরম পিঠা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
কুয়াশা ঢাকা সকালে মোড়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা হাঁড়ির পাশে লাইন, কাপড় সরাতেই বেরিয়ে আসে সাদা ধবধবে গোল পিঠা, ভেতরে গলে যাওয়া খেজুর গুড়। শীতের পিঠার কথা উঠলে ভাপা পিঠার নামই আগে আসে। ঘরে বানানোও কঠিন নয়, শুধু চালের গুঁড়ার আর্দ্রতা ঠিক রাখা আর ভাপ দেওয়ার কায়দাটা জানতে হয়।
বিজ্ঞাপন
ভাপা পিঠা রেসিপির সারকথা: আতপ চাল কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে পানি ঝরিয়ে ভেজা অবস্থায় মিহি গুঁড়া করুন। গুঁড়ায় হালকা লবণ-পানি ছিটিয়ে হাতে ঝুরঝুরে করে মেখে চালনিতে চেলে নিন। ছোট বাটিতে অর্ধেক গুঁড়া, মাঝে গুড় আর নারকেল, ওপরে আবার গুঁড়া দিয়ে আলতো চেপে সমান করুন। ভেজা পাতলা কাপড়ে মুড়ে ফুটন্ত পানির হাঁড়ির মুখের ছিদ্রের ওপর উল্টে বসিয়ে ঢেকে দিন। চার থেকে ছয় মিনিটে পিঠা হয়ে যায়।
এই পরিমাণে আকারভেদে ১২ থেকে ১৫টি মাঝারি পিঠা হবে।
উপকরণ
আতপ চাল আধা কেজি, খেজুরের পাটালি বা দানাদার গুড় ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম, নারকেল কোরা দেড় থেকে দুই কাপ (একটি মাঝারি নারকেল), লবণ আধা চা-চামচ, কুসুম গরম পানি প্রয়োজনমতো।
বিজ্ঞাপন
সরঞ্জাম: মুখ সরু একটি হাঁড়ি বা ভাপা পিঠার বিশেষ পাতিল, যার ঢাকনার মাঝখানে ছিদ্র থাকে; ছোট দুটি স্টিল বা মাটির বাটি; দুই টুকরা পাতলা সুতি কাপড় বা মসলিন; একটি চালনি।
ভাপা পিঠার পাতিল না থাকলে সাধারণ হাঁড়ির মুখে পাতলা কাপড় টানটান করে বেঁধে নিন, অথবা এমন একটি ঢাকনা নিন যার মাঝখানে ছোট ছিদ্র করা যায়। পানি হাঁড়ির অর্ধেকের মতো থাকবে, যেন ফুটন্ত পানি ছিদ্র পর্যন্ত না পৌঁছায়।
ভাপা পিঠার চালের গুঁড়া তৈরি
ভাপা পিঠার সাফল্য অর্ধেকটাই চালের গুঁড়ায়। দোকানের শুকনো চালের গুঁড়া দিয়েও করা যায়, তবে ভেজা চাল ভাঙিয়ে নেওয়া গুঁড়ায় পিঠা বেশি নরম আর ফুলকো হয়।
বিজ্ঞাপন
১. চাল ভেজানো: আতপ চাল ধুয়ে চার থেকে ছয় ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন।
২. পানি ঝরানো: চালনিতে ঢেলে আধা ঘণ্টা রেখে পানি ঝরিয়ে নিন। চাল ভেজা ভেজা থাকবে কিন্তু পানি টপটপ করে পড়বে না।
৩. গুঁড়া করা: ঢেঁকি, মিল বা ঘরের শক্তিশালী ব্লেন্ডারে অল্প অল্প করে মিহি গুঁড়া করুন। ব্লেন্ডার একটানা বেশিক্ষণ চালাবেন না, গরম হয়ে গুঁড়া দলা পাকায়।
৪. চালা: মিহি চালনিতে চেলে মোটা দানা আলাদা করুন, সেগুলো আবার গুঁড়া করুন।
বিজ্ঞাপন
ভেজা গুঁড়া বেশিক্ষণ ঘরের তাপমাত্রায় রাখলে টক গন্ধ হয়ে যায়। সেদিনই ব্যবহার করুন, নয়তো মুখবন্ধ পাত্রে ফ্রিজে রেখে এক-দুই দিনের মধ্যে শেষ করুন।
গুঁড়া মাখানোর সঠিক আর্দ্রতা
এই ধাপটি ভুল হলে পিঠা হয় ভেঙে যায়, নয়তো শক্ত ও আঠালো হয়। আধা চা-চামচ লবণ এক কাপ কুসুম গরম পানিতে গুলে নিন। গুঁড়ার ওপর এই পানি অল্প অল্প ছিটিয়ে দুই হাতের তালুতে ঘষে ঘষে মাখুন, যেন আটার মতো খামির না হয়।
ঠিক আর্দ্রতা বোঝার সহজ পরীক্ষা: এক মুঠো গুঁড়া হাতে চাপ দিয়ে ধরুন। চাপ দিলে মুঠোর আকারে জমাট বাঁধবে, আবার আঙুল দিয়ে টোকা দিলে ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়বে। জমাট না বাঁধলে আরও পানি লাগবে; আঙুলে লেগে কাদার মতো হলে পানি বেশি হয়ে গেছে, তখন কিছু শুকনো গুঁড়া মিশিয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
মাখানো গুঁড়া আরেকবার চালনিতে চেলে নিন। এতে পিঠা ঝুরঝুরে আর হালকা হয়। গুঁড়া একটি ভেজা কাপড়ে ঢেকে রাখুন, যাতে শুকিয়ে না যায়।
গুড় ছুরি দিয়ে চেঁছে বা ছোট টুকরা করে নিন। পাটালি খুব শক্ত হলে কোরানো নারকেলের সঙ্গে হাতে মিশিয়ে নরম করে নিতে পারেন।
ভাপা পিঠা তৈরির নিয়ম ধাপে ধাপে
১. পানি ফোটানো: হাঁড়িতে পানি দিয়ে ঢাকনা বা কাপড় বেঁধে বড় আঁচে ফোটান। ছিদ্র দিয়ে জোরালো ভাপ বের হলে প্রস্তুত।
বিজ্ঞাপন
২. বাটি ভরা: বাটিতে প্রথমে আধা বাটি গুঁড়া আলতো করে ছড়িয়ে দিন, চেপে দেবেন না। মাঝখানে এক থেকে দেড় টেবিল-চামচ গুড় আর এক টেবিল-চামচ নারকেল দিন। ওপরে আবার গুঁড়া দিয়ে বাটি ভরে দিন এবং হাতের তালু দিয়ে খুব হালকা করে সমান করুন।
৩. কাপড়ে মোড়া: পাতলা কাপড় পানিতে ভিজিয়ে চিপে নিন। বাটির মুখে কাপড় রেখে বাটি উল্টে দিন, যাতে পিঠা কাপড়ের ওপর আসে। এবার কাপড়ের কোণগুলো দিয়ে পিঠার ওপরটা ঢেকে দিন।
৪. ভাপে বসানো: কাপড়ে মোড়া পিঠা ঢাকনার ছিদ্রের ওপর বসিয়ে দিন। ওপরে খালি বাটিটি উপুড় করে ঢেকে দিন, যাতে ভাপ আটকে থাকে।
৫. সময়: চার থেকে ছয় মিনিট রাখুন। পিঠার কিনারা স্বচ্ছ ও শক্ত হয়ে এলে এবং গুঁড়ার কাঁচা ভাব চলে গেলে বুঝবেন হয়ে গেছে।
বিজ্ঞাপন
৬. নামানো: কাপড়ের কোণ ধরে সাবধানে তুলে প্লেটে নামান। ভাপ খুব গরম থাকে, হাত পুড়ে যেতে পারে।
প্রতিবার পিঠা তোলার পর কাপড় আবার ভিজিয়ে নিন, নইলে পরের পিঠা কাপড়ে লেগে যাবে।
সমস্যা ও সমাধান
পিঠা ভেঙে যাচ্ছে: গুঁড়ায় পানি কম, বা ভাপ যথেষ্ট সময় পায়নি। আর্দ্রতা বাড়ান এবং সময় এক মিনিট বাড়িয়ে দেখুন।
বিজ্ঞাপন
পিঠা শক্ত ও আঠালো: পানি বেশি হয়েছে অথবা বাটিতে গুঁড়া চেপে বসানো হয়েছে। গুঁড়া আলতো করে ছড়িয়ে দিন।
গুড় গলে বাইরে বেরিয়ে আসছে: গুড় কিনারার খুব কাছে দেওয়া হয়েছে। পুর সবসময় মাঝখানে রাখুন।
পিঠা কাপড়ে লেগে যাচ্ছে: কাপড় শুকনো বা গুঁড়া বেশি ভেজা। কাপড় ভিজিয়ে চিপে নিন।
শীতের পিঠা পরিবেশন ও ভিন্নতা
বিজ্ঞাপন
ভাপা পিঠা গরম গরম খাওয়াই সবচেয়ে মজার। ঠান্ডা হলে শক্ত হয়ে যায়; তখন আবার কয়েক সেকেন্ড ভাপে দিলে নরম হয়। অনেক এলাকায় নারকেলের বদলে বা সঙ্গে খেজুরের ঝোলা গুড় ঢেলে খাওয়া হয়।
ভাপা পিঠা বানানোর সবচেয়ে ভালো সময় শীতের শুরু থেকে মাঝামাঝি, যখন নতুন খেজুর গুড় বাজারে আসে। নতুন গুড়ের ঘ্রাণই এই পিঠার আসল আকর্ষণ। গুড় কেনার সময় খুব উজ্জ্বল হলুদ রং বা অস্বাভাবিক শক্ত দানাদার গুড় এড়িয়ে চলুন, এতে চিনি বা রং মেশানো থাকতে পারে। পরিচিত বিক্রেতার কাছ থেকে কেনাই নিরাপদ।
পরিবারে অনেক মানুষ থাকলে দুই-তিনটি বাটি আর কয়েকটি কাপড় একসঙ্গে প্রস্তুত রাখুন। একটি পিঠা ভাপে থাকতে থাকতে পরেরটি সাজিয়ে ফেলা যায়, এতে সময় অনেক কম লাগে। হাঁড়ির পানি কমে এলে মাঝে মাঝে গরম পানি যোগ করুন, ঠান্ডা পানি দিলে ভাপ কমে যায়।
ঝাল স্বাদের জন্য পুর হিসেবে গুড়ের বদলে সরিষাবাটা, ধনেপাতা আর কাঁচা মরিচ মেশানো নারকেল দেওয়া যায়, আবার শুঁটকি বা ডিমের ভর্তার পুরও কিছু অঞ্চলে জনপ্রিয়। খেজুর গুড় না পেলে আখের গুড় দিয়েও বানানো যায়, স্বাদ একটু আলাদা হবে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
দোকানের শুকনো চালের গুঁড়া দিয়ে কি ভাপা পিঠা হয়?
হয়, তবে শুকনো গুঁড়া পানি বেশি টানে। পানি একটু বেশি লাগবে এবং মাখার পর আধা ঘণ্টা ঢেকে রাখলে গুঁড়া সমানভাবে ভিজে নরম হয়।
সিদ্ধ চালের গুঁড়ায় কি ভাপা পিঠা করা যায়?
বিজ্ঞাপন
প্রচলিতভাবে আতপ চালই ব্যবহার করা হয়, কারণ এতে পিঠা নরম ও সাদা হয়। সিদ্ধ চালে পিঠা জমাট বাঁধতে সমস্যা হয়।
ভাপা পিঠা কত দিন রাখা যায়?
তাজা খাওয়াই ভালো। রাখতে হলে ঠান্ডা করে ঢাকনা দেওয়া বাটিতে ফ্রিজে এক দিন রাখা যায়, খাওয়ার আগে আবার ভাপে গরম করে নিন।
ডায়াবেটিস থাকলে ভাপা পিঠা খাওয়া যাবে?
বিজ্ঞাপন
চালের গুঁড়া আর গুড় দুটোই রক্তে সুগার বাড়ায়। খেতে চাইলে ছোট একটি পিঠা, গুড় কম দিয়ে, আর চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে।