ভুটান ভ্রমণ: বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা, খরচ ও যাওয়ার উপায়
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
ভুটানকে অনেকে বলেন সুখী মানুষের দেশ। হিমালয়ের কোলে ছোট এই দেশে পাহাড়ের গায়ে সাদা দুর্গের মতো জং, নদীর ওপর রঙিন প্রার্থনা-পতাকা, আর পরিচ্ছন্ন শহরে ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়াই চলা যানবাহন। বাংলাদেশ থেকে কাছের এই দেশটি এখন অনেকের পছন্দের গন্তব্য, বিশেষ করে বাংলাদেশিদের জন্য সাম্প্রতিক কিছু সুবিধার কারণে।
বিজ্ঞাপন
ভুটান ভ্রমণের মূল বিষয়টি বোঝা দরকার শুরুতেই। ভুটান কম পর্যটক, বেশি মূল্য নীতিতে চলে। সব বিদেশি পর্যটকের কাছ থেকে প্রতি রাতের জন্য টেকসই উন্নয়ন ফি বা এসডিএফ নেওয়া হয়। বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য বছরে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা পর্যন্ত এই ফি সাধারণ হারের তুলনায় অনেক কম রাখা হয়েছে, প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতি রাতে ১৫ মার্কিন ডলারের মতো। কোটা পূর্ণ হলে সাধারণ হার প্রযোজ্য হতে পারে।
ভিসা, ফি, গাইড ও হোটেলের নিয়ম গত কয়েক বছরে কয়েকবার বদলেছে। তাই যাত্রার আগে ভুটানের পর্যটন বিভাগ বা নিবন্ধিত ভুটানি ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে সর্বশেষ নিয়ম নিশ্চিত করুন।
ভুটান অন অ্যারাইভাল ভিসা ও প্রবেশের নিয়ম
বাংলাদেশি নাগরিকেরা ভুটানের ভিসার জন্য অনলাইনে আগে আবেদন করতে পারেন, আবার প্রবেশের সময়ও অনুমতি নেওয়া যায় বলে ভুটানের পর্যটন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। বাস্তবে আগে থেকে অনলাইনে বা ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে ভিসা অনুমোদন নিয়ে যাওয়াই নিরাপদ, এতে সীমান্ত বা বিমানবন্দরে ঝামেলা কমে।
বিজ্ঞাপন
যা লাগে: অন্তত ছয় মাস মেয়াদি পাসপোর্ট, ছবি, ভ্রমণ বিমা, অনুমোদিত হোটেলের বুকিং, যাত্রাসূচি আর এসডিএফ পরিশোধ। ভিসা প্রক্রিয়াকরণের ফি বাংলাদেশিদের জন্য মওকুফের কথা বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তবে আবেদনের সময় নিশ্চিত হয়ে নিন।
প্রবেশের অনুমতি সাধারণত থিম্পু ও পারোর জন্য দেওয়া হয়। পুনাখা, ফোবজিখা বা অন্য জেলায় যেতে আলাদা রুট পারমিট লাগে, যা থিম্পুর অভিবাসন দপ্তর থেকে বা অনলাইনে নেওয়া যায়। ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে গেলে এসব তারাই করে দেয়।
নিয়ম অনুযায়ী পর্যটকদের পর্যটন বিভাগের অনুমোদিত হোটেলে থাকতে হয়, এবং অনেক এলাকায় লাইসেন্সধারী গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। কোন অংশে গাইড ছাড়া ঘোরা যায় আর কোথায় যায় না, তা যাত্রার আগে জেনে নিন।
ভুটান যাওয়ার উপায়
বিজ্ঞাপন
১. আকাশপথে পারো: ঢাকা থেকে ভুটানের দুটি বিমান সংস্থা পারো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা করে, সময় এক ঘণ্টার মতো। পরিষ্কার দিনে জানালা দিয়ে হিমালয়ের চূড়া দেখা যায়, আর পাহাড়ের ভাঁজে পারোর অবতরণ বিখ্যাত। আসা-যাওয়ার ভাড়া আনুমানিক ৩৫০০০ থেকে ৬০০০০ টাকা, মৌসুম ও বুকিংয়ের সময়ভেদে। সপ্তাহে ফ্লাইট সীমিত, তাই আগে টিকিট কাটুন।
২. সড়কপথে বুড়িমারী-ফুন্টশোলিং: ঢাকা থেকে বাসে লালমনিরহাটের বুড়িমারী, সীমান্ত পার হয়ে ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা। সেখান থেকে বাস বা ভাড়া গাড়িতে জয়গাঁও, তিন-চার ঘণ্টার পথ। জয়গাঁও আর ভুটানের ফুন্টশোলিং পাশাপাশি শহর। এই পথে ভারতের বৈধ ভিসা লাগে, যাতে চ্যাংড়াবান্ধা স্থলবন্দর ও প্রয়োজনীয় বহির্গমন পথের উল্লেখ থাকতে হয়। জয়গাঁওয়ে ভারতের বহির্গমন সিল নিয়ে ফুন্টশোলিংয়ে ভুটানের প্রবেশ প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়।
৩. ফুন্টশোলিং থেকে থিম্পু: পাহাড়ি পথে পাঁচ-ছয় ঘণ্টার মতো, বাস বা ভাড়া গাড়িতে।
সড়কপথে খরচ কমে, কিন্তু ভারতীয় ভিসা, দুটি সীমান্ত পারাপার আর বাড়তি দুই-তিন দিন সময় লাগে। ছুটি কম হলে বিমানই সুবিধাজনক।
বিজ্ঞাপন
কোথায় ঘুরবেন
ভুটানের মূল পর্যটন সার্কিট পারো, থিম্পু আর পুনাখা। প্রথম সফরে পাঁচ-ছয় দিনে এগুলো আরামে দেখা যায়।
১. পারো: পাহাড়ের খাড়া গায়ে টাইগার্স নেস্ট মনাস্ট্রি, রিনপুং জং, জাতীয় জাদুঘর আর প্রাচীন কিচু লাখাং।
২. থিম্পু: রাজধানী, বিশাল বুদ্ধ দরদেনমা মূর্তি, তাশিছো জং, মেমোরিয়াল চোর্তেন, জাতীয় প্রাণী টাকিনের সংরক্ষণকেন্দ্র আর সাপ্তাহিক বাজার।
বিজ্ঞাপন
৩. পুনাখা: দুই নদীর সংগমে পুনাখা জং, লম্বা ঝুলন্ত সেতু। পথে দোচুলা গিরিপথ, যেখানে ১০৮টি স্মৃতিস্তূপ।
ভুটান ভ্রমণ খরচ: কোথায় কত
নিচের অঙ্ক আনুমানিক এবং ফি, বিনিময় হার ও মৌসুমভেদে বদলায়।
১. এসডিএফ: বাংলাদেশিদের জন্য কম হারে, প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতি রাতে প্রায় ১৫ ডলার, কোটা পর্যন্ত। পাঁচ রাতে প্রায় ৭৫ ডলার। শিশুদের জন্য ছাড়ের নিয়ম আছে।
বিজ্ঞাপন
২. বিমানভাড়া: আসা-যাওয়ায় আনুমানিক ৩৫০০০ থেকে ৬০০০০ টাকা।
৩. হোটেল: অনুমোদিত হোটেলে কক্ষপ্রতি রাতে মান অনুযায়ী আনুমানিক কয়েক হাজার থেকে বহু হাজার নুলট্রাম। দুজনে ভাগ করলে খরচ কমে।
৪. গাড়ি ও গাইড: পুরো সফরের জন্য গাড়ি ও গাইডের খরচ দলে ভাগ হয়, তাই চার-ছয়জনের দলে জনপ্রতি অনেক কম।
৫. খাওয়া ও প্রবেশ ফি: দিনে আনুমানিক ১০০০ থেকে ২০০০ নুলট্রাম, জং ও জাদুঘরে প্রবেশ ফি আলাদা।
বিজ্ঞাপন
পাঁচ রাত ছয় দিনের সফরে আকাশপথে জনপ্রতি আনুমানিক ৮০০০০ থেকে ১৩০০০০ টাকা ধরে রাখতে পারেন। সড়কপথে এবং বড় দলে গেলে খরচ উল্লেখযোগ্য কম পড়ে।
প্রথম সফরের জন্য ছয় দিনের নমুনা যাত্রাসূচি
প্রথম দিন পারোতে অবতরণ, বিমানবন্দর থেকে সরাসরি থিম্পু, পথে নদীর ধারে বিশ্রাম। বিকেলে শহরের কেন্দ্রে হাঁটা। দ্বিতীয় দিন থিম্পুর বুদ্ধ দরদেনমা, মেমোরিয়াল চোর্তেন, টাকিন সংরক্ষণকেন্দ্র আর তাশিছো জং। এই দিনেই পুনাখার রুট পারমিট সেরে রাখুন, ট্যুর অপারেটর থাকলে তারাই করবে।
তৃতীয় দিন সকালে দোচুলা গিরিপথ হয়ে পুনাখা, বিকেলে পুনাখা জং আর ঝুলন্ত সেতু। চতুর্থ দিন সকালে পুনাখার আশপাশের গ্রাম ও কৃষিখেত দেখে পারোর দিকে ফেরা। পঞ্চম দিন টাইগার্স নেস্টে হাইকিং, এর জন্য পুরো দিন রাখুন, পথে ওঠা-নামা মিলিয়ে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লাগতে পারে। ষষ্ঠ দিন সকালে পারোর বাজারে কেনাকাটা সেরে ফ্লাইট।
বিজ্ঞাপন
শরীর মানিয়ে নেওয়ার জন্য টাইগার্স নেস্টের হাইক সফরের শেষের দিকে রাখাই ভালো। তত দিনে উচ্চতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো হয়ে যায়।
কখন যাবেন
মার্চ থেকে মে আর সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর ভুটান ভ্রমণের সেরা সময়। বসন্তে রডোডেনড্রন ফোটে, শরতে আকাশ সবচেয়ে পরিষ্কার এবং অনেক জংয়ে বর্ণাঢ্য উৎসব হয়। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে প্রচণ্ড ঠান্ডা, উঁচু গিরিপথে বরফ পড়ে রাস্তা বন্ধ হতে পারে। জুন থেকে আগস্ট বর্ষায় পাহাড়ি রাস্তায় ধস নামে, তবে ভিড় কম।
যাওয়ার আগে কিছু জরুরি কথা
বিজ্ঞাপন
ভুটানের মুদ্রা নুলট্রাম, যা ভারতীয় রুপির সমমূল্যে বাঁধা এবং অনেক জায়গায় রুপি চলে, তবে বড় নোটের ক্ষেত্রে নিয়ম থাকতে পারে। ডলার এনডোর্স করে নিন। জং ও মন্দিরে ঢুকতে লম্বা হাতার জামা ও লম্বা প্যান্ট পরতে হয়, টুপি খুলতে হয়, ভেতরে ছবি তোলা সাধারণত নিষেধ। ভুটানে প্রকাশ্যে ধূমপান ও তামাকপণ্য নিয়ে কঠোর নিয়ম আছে, তামাক নিয়ে গেলে ঘোষণা দিতে হতে পারে। পাহাড়ি উচ্চতায় শ্বাসকষ্ট হলে বিশ্রাম নিন, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাংলাদেশিরা কি ভুটানে অন অ্যারাইভাল ভিসা পান?
ভুটানের পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে বাংলাদেশিরা অনলাইনে বা প্রবেশের সময় ভিসা নিতে পারেন। তবে এসডিএফ পরিশোধ, অনুমোদিত হোটেল বুকিং ও অন্য শর্ত পূরণ করতে হয়, তাই আগে অনলাইনে অনুমোদন নেওয়াই ভালো।
বিজ্ঞাপন
এসডিএফ কি প্রতিদিন দিতে হয়?
হ্যাঁ, থাকার প্রতি রাতের জন্য এসডিএফ দিতে হয়। বাংলাদেশিদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা পর্যন্ত কম হার প্রযোজ্য।
সড়কপথে ভুটান যেতে কি ভারতের ভিসা লাগবে?
হ্যাঁ। ভারতের ভেতর দিয়ে যেতে হয় বলে বৈধ ভারতীয় ভিসা লাগবে, যাতে সংশ্লিষ্ট স্থলবন্দরের উল্লেখ থাকতে হবে।
বিজ্ঞাপন
ভুটানে কি নিজে নিজে ঘোরা যায়?
থিম্পু ও পারো শহরের কিছু অংশে সীমিত পরিসরে নিজে ঘোরা যায়, তবে অনেক এলাকায় লাইসেন্সধারী গাইড বাধ্যতামূলক। পরিকল্পনার সময় এই নিয়ম জেনে নিন।