মোংলায় মৎস্য শিকার করেই চলে জয়মনির ঘোলের ঠোটা গ্রামের মানুষের জীবন
দারিদ্র্যের কারণে এই গ্রামের অধিকাংশ শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, তবুও সুন্দরবন-লাগোয়া এই জনপদের সন্তানদের মনে স্বপ্ন বেঁচে থাকে
বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি · মোংলা, বাগেরহাট
প্রকাশ:
বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জয়মনির ঘোলের ঠোটা গ্রামের অধিকাংশ পরিবার নদী ও সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরে জীবনধারণ করে। গ্রামের শ্যালা নদীর ভাঙনে বিলীন হওয়া ঘরের পাশে একটি কংক্রিটের টুকরার ওপর ছোট্ট মাটির চুলা দেখা যায়, যেখানে ২৪ অক্টোবর সকাল পৌনে ৭টার দিকে প্লাস্টিকের কৌটা ও চামচ নিয়ে খেলছিল পাঁচ বছর বয়সী লাবিবা আক্তার। সে সময় মা কুলসুম আক্তার (২৫) এক হাতে দুটি বড় কলসি এবং অন্য হাতে ১৩ মাস বয়সী ছেলে জিসান খানকে জড়িয়ে ধরে সুপেয় পানির জন্য নদী তীরের সরু রাস্তা ধরে ২০০ মিটার দূরে যাচ্ছিলেন। পানি নিয়ে ফেরার পর কুলসুম আক্তার জানান, নদীর পানি এখনো খুব বেশি লবণাক্ত হয়নি, তবে দুই-তিন মাস পর কড়া লবণ হয়ে যাবে, তখন রান্নাবান্না ও গোসলের পানি দূর থেকে টেনে আনতে হবে।
বিজ্ঞাপন
সুন্দরবন-লাগোয়া এই এলাকাটি পূর্ব ও দক্ষিণে শ্যালা নদী এবং উত্তর ও দক্ষিণে পশুর নদ দিয়ে ঘেরা। তিনদিকে নদী থাকায় সরু ভূখণ্ডের মতো আকৃতির কারণে এলাকাটিকে ঠোটা বলা হয়। একই গ্রামের বাসিন্দা ও কুলসুমের বাবা মোহাজ্জেম খলিফা (৫৮) জানান, এখানে শতাধিক পরিবার থাকলেও পড়াশোনার হার অত্যন্ত কম। তিনি বলেন, ‘১০ কেলাস পারইছে, এমন কোনো ঘর নেই এহানে। এহানে এক শর বেশি পরিবার আছে। কিন্তু কোনো পরিবারের পড়ালেহা নাই।’
স্থানীয় কিশোর আবু বক্কর, মুছা সওদাগর ও শাহজাহান জানায়, তারা সবাই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও অনেকেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। চাঁদপাই মেছেরশাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়া আবু বক্কর বলে, ‘সিস্টেমটা হলো, এজাগা থাকলে ল্যাহাপড়া হয় না। সিজনে ছোড ছোড পোলাপানও ম্যালা টাহা ইনকাম করে। টাহার চোখ দ্যাখলে আর ল্যাহাপড়া হয় না।’ এই কিশোররা সুন্দরবনের নদীতে চিংড়ির রেণুপোনা, কাঁকড়া ও মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে।
কুলসুম আক্তার আট বছর আগে রাজু খানকে বিয়ে করেন এবং গত শনিবার ভোরে স্বামী সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরতে যান। কুলসুম জানান, জোয়ার-ভাটার ওপর ভিত্তি করেই এখানকার জীবন চলে। তিনি নিজেও আগে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরতেন, এমনকি জিসান গর্ভে থাকার সময়ও বনে যেতেন। বর্তমানে তাঁর মা তাসলিমা বেগমসহ প্রতিবেশীদের অনেকেই নিয়মিত দল বেঁধে বনে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে যান।
ছোটবেলায় পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন দেখা কুলসুম মোরেলগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। তিনি জানান, পুলিশের পোশাক পরিহিত মেয়েদের দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। মোহাজ্জেম খলিফা আক্ষেপ করে বলেন, ‘মেয়েকে পড়াতে পারিনি। ও পড়তে চাইছিল। কিন্তু পয়সায় দুর্বল ছেলাম। সপ্তম শ্রেণির পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। তার দুই বছর পর মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিই।’ মোরেলগঞ্জের বারুইখালীর সমাদ্দারখালী থেকে জীবিকার প্রয়োজনে আসা মোহাজ্জেমের চার ভাই-বোনের মধ্যে কুলসুম সবার ছোট।
বিজ্ঞাপন
রান্নাবান্নার ব্যস্ততার মাঝে কুলসুম জানান, তাঁর স্বামী সকালে সেদ্ধ আটা খেয়ে কাজে গেছেন এবং জোয়ার এলে ভাত খাবেন। এদিকে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুশ্রেণিতে পড়া লাবিবা আক্তার বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। লাবিবা বলে, ‘আমি ডাক্তার হুউম।’ ডাক্তার হয়ে কী করবে জানতে চাইলে সে বলে, ‘মাইনসেরে ভালো রাহুম।’ কুলসুম নিজেও জানেন এখানে ডাক্তার বা নার্স হওয়া কঠিন, তবুও মেয়ের জন্য তিনি চেষ্টার কথা জানান।