ভুটানের দর্শনীয় স্থান: পারো, থিম্পু ও পুনাখার সেরা জায়গাগুলো
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
পারো উপত্যকা থেকে মাথা তুলে তাকালে প্রায় খাড়া পাহাড়ের গায়ে আটকে থাকা কয়েকটি সাদা-লাল ঘর চোখে পড়ে। দেখে মনে হয় যেকোনো মুহূর্তে খসে পড়বে। এটাই টাইগার নেস্ট, ভুটানের সবচেয়ে পরিচিত ছবি। কিন্তু ভুটানের আকর্ষণ শুধু এটুকু নয়। প্রতিটি উপত্যকায় একটি করে জং, অর্থাৎ দুর্গ ও প্রশাসনিক-ধর্মীয় কেন্দ্র, পাহাড়ি গিরিপথে প্রার্থনা-পতাকা, আর নদীর পাড়ে শান্ত গ্রাম।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বেশির ভাগ পর্যটক প্রথম সফরে তিনটি জায়গা দেখেন: আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের শহর পারো, রাজধানী থিম্পু, আর একসময়ের রাজধানী পুনাখা। এই তিন শহরের মধ্যে দূরত্ব কম, পাঁচ-ছয় দিনে প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলো আরামে দেখা হয়ে যায়।
মনে রাখুন, থিম্পু ও পারোর বাইরে যেতে সাধারণত আলাদা রুট পারমিট লাগে, আর অনেক জায়গায় লাইসেন্সধারী গাইড নেওয়ার নিয়ম আছে। জং ও মন্দিরে ঢোকার সময় নির্দিষ্ট, কিছু জায়গায় পর্যটকদের প্রবেশ ফি দিতে হয়।
পারোর দর্শনীয় স্থান
১. টাইগার নেস্ট বা পারো তাকসাং: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় তিন হাজার মিটার উঁচুতে, উপত্যকার মেঝে থেকে কয়েকশ মিটার ওপরে খাড়া পাহাড়ের গায়ে নির্মিত মঠ। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, গুরু রিনপোচে বাঘের পিঠে চড়ে এখানে এসে ধ্যান করেছিলেন, সেখান থেকেই নাম। পার্কিং থেকে ট্রেইল ধরে উঠতে সাধারণত আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে, নামতে আরেকটু কম। পথের মাঝামাঝি একটি ক্যাফেটেরিয়া আছে, সেখান থেকে মঠের সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়। যাঁরা পুরো পথ উঠতে পারবেন না, তাঁরা ক্যাফেটেরিয়া পর্যন্ত গিয়েও ফিরতে পারেন। পথের প্রথম অংশে ঘোড়ায় চড়ার ব্যবস্থাও থাকে।
বিজ্ঞাপন
২. রিনপুং জং: পারো চু নদীর পাড়ে বিশাল দুর্গ, যেখানে এখন জেলা প্রশাসন ও মঠ দুটোই আছে। কাঠের কারুকাজ আর ভেতরের উঠান দেখার মতো। বসন্তে এখানে বিখ্যাত পারো উৎসব হয়।
৩. জাতীয় জাদুঘর: রিনপুং জংয়ের ওপরে পুরোনো একটি ওয়াচটাওয়ারে গড়ে ওঠা জাদুঘর, যেখানে ভুটানের শিল্প, মুখোশ, অস্ত্র ও প্রাকৃতিক ইতিহাসের সংগ্রহ আছে।
৪. কিচু লাখাং: দেশের প্রাচীনতম মন্দিরগুলোর একটি, শান্ত পরিবেশে ছোট মন্দির।
৫. চেলে লা গিরিপথ: পারো থেকে হা উপত্যকার পথে উঁচু গিরিপথ, পরিষ্কার দিনে হিমালয়ের তুষারচূড়া দেখা যায়। শীতে বরফে রাস্তা বন্ধ হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
৬. দ্রুকগিয়েল জং: পারো উপত্যকার শেষ প্রান্তে ঐতিহাসিক দুর্গ, সংস্কারের পর আবার দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে।
থিম্পু দর্শনীয় স্থান
১. বুদ্ধ দরদেনমা: শহরের দক্ষিণে পাহাড়ের ওপর ব্রোঞ্জের তৈরি বিশাল সোনালি বুদ্ধমূর্তি। ওপর থেকে পুরো থিম্পু উপত্যকা দেখা যায়। ভেতরে হাজারো ছোট বুদ্ধমূর্তি রয়েছে।
২. তাশিছো জং: সরকারের প্রধান প্রশাসনিক ভবন ও কেন্দ্রীয় মঠ। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে, সাধারণত অফিস সময়ের পর, পর্যটকদের ঢুকতে দেওয়া হয়। সন্ধ্যায় আলোয় জংয়ের রূপ চমৎকার।
বিজ্ঞাপন
৩. ন্যাশনাল মেমোরিয়াল চোর্তেন: শহরের মাঝখানে সাদা স্তূপ, যেখানে সারা দিন স্থানীয় মানুষ প্রদক্ষিণ করেন আর প্রার্থনাচক্র ঘোরান। ভুটানের দৈনন্দিন ধর্মীয় জীবন কাছ থেকে দেখার ভালো জায়গা।
৪. টাকিন সংরক্ষণকেন্দ্র: মোতিথাংয়ে ভুটানের জাতীয় প্রাণী টাকিন দেখা যায়, যা দেখতে গরু আর ছাগলের মিশ্রণের মতো।
৫. চাংগাংখা লাখাং: পাহাড়ের ওপর পুরোনো মন্দির, শহরের ভালো দৃশ্য পাওয়া যায়।
৬. সাপ্তাহিক কৃষকবাজার: সপ্তাহের শেষ দিকে নদীর পাড়ের বাজারে স্থানীয় সবজি, পনির, শুকনো মরিচ আর হস্তশিল্প বিক্রি হয়। নদীর ওপারে হস্তশিল্পের বাজারে যেতে একটি ঝুলন্ত সেতু পার হতে হয়।
বিজ্ঞাপন
৭. লোক ঐতিহ্য জাদুঘর ও টেক্সটাইল জাদুঘর: ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বাড়ি আর ভুটানের বিখ্যাত বুননের সংগ্রহ।
৮. সিমতোখা জং: থিম্পুর প্রবেশপথের কাছে, দেশের পুরোনো জংগুলোর একটি।
থিম্পু থেকে পুনাখার পথে: দোচুলা
থিম্পু থেকে পুনাখা যাওয়ার পথে দোচুলা গিরিপথ। এখানে ১০৮টি ছোট স্মৃতিস্তূপ সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে, পাশে একটি মন্দির। পরিষ্কার দিনে, বিশেষ করে শীতের সকালে, এখান থেকে উত্তরের হিমালয়ের তুষারচূড়ার লম্বা সারি দেখা যায়। প্রায় সব পর্যটক এখানে কিছুক্ষণ থামেন, চা খান, ছবি তোলেন।
বিজ্ঞাপন
পুনাখা জং ও পুনাখার অন্যান্য স্থান
১. পুনাখা জং: ফো চু ও মো চু নামের দুই নদীর সংগমস্থলে নির্মিত এই জংকে অনেকে ভুটানের সবচেয়ে সুন্দর জং বলেন। একসময় এটি দেশের রাজধানীর প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল, রাজকীয় নানা আনুষ্ঠানিকতাও এখানে হয়েছে। বসন্তে চত্বরের জ্যাকারান্ডা গাছে বেগুনি ফুল ফোটে। কাঠের সেতু পেরিয়ে ঢুকতে হয়।
২. পুনাখা ঝুলন্ত সেতু: দেশের লম্বা ঝুলন্ত সেতুগুলোর একটি, প্রার্থনা-পতাকায় সাজানো। নদীর ওপর দিয়ে হাঁটতে বেশ রোমাঞ্চ লাগে।
৩. চিমি লাখাং: ধানখেতের মাঝ দিয়ে হেঁটে যেতে হয় এমন একটি মন্দির, যা সন্তান কামনায় প্রার্থনার জন্য পরিচিত এবং লোককথার এক সাধু দ্রুকপা কুনলের সঙ্গে জড়িত।
বিজ্ঞাপন
৪. খামসুম ইউলে নামগিয়াল চোর্তেন: পাহাড়ের ওপর মন্দির, ধানখেত আর নদী পেরিয়ে আধা ঘণ্টার মতো চড়াই। ওপর থেকে উপত্যকার দৃশ্য চমৎকার।
সময় থাকলে পুনাখা থেকে ফোবজিখা উপত্যকা যোগ করতে পারেন। শীতকালে সেখানে বিরল কালো গলার সারস পাখি আসে, আর হিমবাহ-গঠিত বিস্তৃত উপত্যকাটি দেখতে চমৎকার।
টাইগার নেস্টে হাইকিংয়ের প্রস্তুতি
টাইগার নেস্টের পথ খুব কঠিন নয়, কিন্তু উচ্চতা আর একটানা চড়াইয়ের কারণে অনেকে হাঁপিয়ে পড়েন। সফরের শেষের দিকে এই হাইক রাখুন, যাতে আগের কয়েক দিনে শরীর উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়। সকাল সকাল শুরু করুন, ভিড় আর রোদ দুটোই কম থাকে। ট্রেইলের মুখে বাঁশ বা কাঠের লাঠি ভাড়া পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
ভালো গ্রিপের জুতা, পানির বোতল, হালকা খাবার আর একটা জ্যাকেট নিন, ওপরে বাতাস ঠান্ডা। মঠের ভেতরে ঢোকার আগে ব্যাগ, ক্যামেরা ও মোবাইল জমা রাখতে হয়, ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ। মঠের ভেতরে ঢোকার নির্দিষ্ট সময় আছে, দুপুরে কিছু সময় বন্ধ থাকতে পারে।
কখন যাবেন ও কত দিন রাখবেন
মার্চ থেকে মে বসন্ত, রডোডেনড্রন আর জ্যাকারান্ডা ফোটে, অনেক জংয়ে উৎসব হয়। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর আকাশ সবচেয়ে পরিষ্কার, হিমালয় দেখার সেরা সময়, থিম্পুর বড় উৎসবও এ সময়ে হয়। শীতে ঠান্ডা বেশি হলেও আকাশ পরিষ্কার, ভিড় কম। বর্ষায় ধস আর মেঘের কারণে দৃশ্য কম মেলে।
পারো, থিম্পু, পুনাখা আরামে দেখতে পাঁচ থেকে ছয় দিন যথেষ্ট। ফোবজিখা যোগ করলে আরও এক-দুই দিন।
বিজ্ঞাপন
জং ও মন্দিরে ঢোকার আদবকায়দা
১. পোশাক: লম্বা হাতার জামা, লম্বা প্যান্ট বা স্কার্ট। হাফপ্যান্ট, স্লিভলেস জামা বা টুপি পরে ঢোকা যায় না।
২. ছবি: জং ও মন্দিরের ভেতরের কক্ষে ছবি তোলা সাধারণত নিষেধ। বাইরের উঠানে অনুমতি থাকে।
৩. প্রদক্ষিণ: স্তূপ ও প্রার্থনাচক্র ঘড়ির কাঁটার দিকে প্রদক্ষিণ করা হয়।
বিজ্ঞাপন
৪. আচরণ: উচ্চস্বরে কথা বলা, মূর্তির দিকে পা ছড়িয়ে বসা বা কিছু স্পর্শ করা অসম্মানজনক।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
টাইগার নেস্টে কি সবাই উঠতে পারেন?
শারীরিকভাবে মোটামুটি সক্ষম যে কেউ ধীরে ধীরে উঠতে পারেন। হৃদ্রোগ বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, প্রয়োজনে ক্যাফেটেরিয়া পর্যন্ত গিয়ে ফিরুন।
বিজ্ঞাপন
পুনাখা জং দেখতে কি আলাদা অনুমতি লাগে?
পুনাখা যেতে রুট পারমিট লাগে, আর জংয়ে ঢুকতে পর্যটকদের প্রবেশ ফি দিতে হয়। গাইড থাকলে এসব ব্যবস্থা সহজ হয়।
থিম্পু ঘুরতে কত দিন লাগে?
প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলো এক থেকে দেড় দিনে দেখা যায়। বাজার ও জাদুঘর যোগ করলে দুই দিন রাখুন।
বিজ্ঞাপন
ভুটানে কি সব দর্শনীয় স্থানে প্রবেশ ফি আছে?
অনেক জং, মন্দির ও জাদুঘরে পর্যটকদের জন্য প্রবেশ ফি আছে, কিছু জায়গায় নেই। ফি সময়ে সময়ে বদলায়।