ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হবে সাতক্ষীরার নকিপুর জমিদারবাড়ি
১৮৮৮ সালে নির্মিত এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটি দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলায় আজ বিলুপ্তির পথে
সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি · শ্যামনগর, সাতক্ষীরা
প্রকাশ:
যেকোনো দেশের ইতিহাস কেবল বই কিংবা জাদুঘরে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা ছড়িয়ে থাকে বিভিন্ন পুরোনো প্রাসাদ, মসজিদ, মন্দির ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাঝে। এসব স্থাপনা আমাদের অতীতের সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে। তবে বাংলাদেশে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা ও অবহেলার চিত্র বারবার সামনে আসছে, যার একটি জলন্ত দৃষ্টান্ত সাতক্ষীরার শ্যামনগরের নকিপুর জমিদারবাড়ি।
বিজ্ঞাপন
১৮৮৮ সালে নির্মিত এই জমিদারবাড়ির খিলান, স্তম্ভ, শিবমন্দির, নহবতখানা এবং পুকুরের ঘাট তৎকালীন স্থাপত্য ও জমিদারি ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অযত্ন এবং লুটপাটের কারণে বর্তমানে স্থাপনাটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। স্থাপনাটির ছাদের বড় অংশ ধসে পড়েছে এবং দেয়াল ভেঙে পড়েছে। প্রতিবেদনে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, দোতলা এই ভবনটি গাছ ও আগাছার জঙ্গলে পুরোপুরি ছেয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের আক্ষেপও এই অবহেলারই সাক্ষ্য দেয়, অথচ যথাসময়ে উদ্যোগ নিলে এই ঐতিহাসিক স্থাপনার বড় অংশ রক্ষা করা সম্ভব হতো।
প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কেবল পুরোনো ভবন টিকিয়ে রাখার কাজ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জাতির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। অতীতের এই স্থাপত্য নিদর্শনগুলো নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে। এছাড়া এসব স্থাপনা গবেষণা, শিক্ষা এবং ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তাই এগুলোকে শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে নয়, জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
প্রত্নসম্পদ রক্ষায় দেশে আইন রয়েছে। ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি আইন, যা ১৯৭৬ সালে সংশোধিত হয়, অনুযায়ী সরকার যেকোনো পুরাকীর্তিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করতে পারে। এই আইনে প্রত্নসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, সুরক্ষা এবং ক্ষতিসাধন প্রতিরোধের সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অন্যতম দায়িত্ব হলো জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার সংস্কার ও মেরামত করা। অর্থাৎ, প্রত্নসম্পদ রক্ষায় আইনি কাঠামো ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান—দুটিই বিদ্যমান।
প্রশ্ন থেকে যায়, এত বছরেও কেন নকিপুর জমিদারবাড়ির মতো প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের আওতায় এল না? শুধু প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো কিংবা ইতিবাচক সাড়া পাওয়াই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। স্থাপনাটি চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আগেই সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। দখলসংক্রান্ত কোনো জটিলতা থাকলে তা সমাধানে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে এবং যাঁরা বর্তমানে সেখানে বসবাস করছেন, তাঁদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিজ্ঞাপন
নকিপুর জমিদারবাড়িকে ঘিরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই, তবে এই উদ্যোগ যেন কেবল চিঠি চালাচালিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। দেশের প্রত্নসম্পদের তালিকা হালনাগাদ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিতকরণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্নসম্পদ সংস্কার ও সংরক্ষণে বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি। কারণ, একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা একবার ধ্বংস হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।