মেহেরপুর নার্সিং কলেজে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবন দুই বছরেও চালু হয়নি
অবসর, প্রশাসনিক ও আদালতগত জটিলতা কলেজের কার্যক্রমকে বাধা দিচ্ছে
মেহেরপুর জেলা প্রতিনিধি · মেহেরপুর
প্রকাশ:
মেহেরপুর পৌর শহরে ৩ একর ৬৩ শতক জমিতে নির্মিত নার্সিং কলেজের চারতলা একাডেমিক ভবন ও চারতলা ছাত্রাবাসের নির্মাণ কাজ ২০২৪ সালের ২৭ জুন শেষ হয়েছে, তবে দুই বছরের বেশি সময় পার হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষাকাল শুরু হয়নি। ভবনের মোট ব্যয় ৩৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।
বিজ্ঞাপন
মেহেরপুরের বেসরকারি ক্লিনিকে নার্স হিসেবে কর্মরত সুইটি আক্তার জানিয়ে বলেন, ‘মেহেরপুরে নার্সিং কলেজ না থাকায় আমাদের মতো দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের ঢাকায় বাসা ভাড়া করে থেকে পড়াশোনা করতে হয়েছে। এতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। পড়াশোনার খরচ জোগাতে বাবার বন্ধক রাখা কৃষিজমি দুই বছর ধরে চাকরি করেও ছাড়াতে পারিনি।’ তিনি অতিরিক্ত ব্যাখ্যা করেন যে, নার্সিং শিক্ষার জন্য ঢাকায় ভাড়া এবং জীবিকা চালাতে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের পাশের টিঅ্যান্ডটি মোড় এলাকায় অবস্থিত এই কলেজের নির্মাণে মোট ৩৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। নির্মাণকাজের শেষে অবকাঠামো সম্পূর্ণ হলেও শিক্ষক-শিক্ষার্থী, আসবাব, প্রশিক্ষণ যন্ত্রপাতি ইত্যাদি সরবরাহ হয়নি, ফলে ভবন অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।
ক্লিনিকের পরিচালনা ও কর্মী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় প্রয়োজন। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের পরিচালক নাহিদ-উল-মোস্তাক (শিক্ষা, অর্থ ও বাজেট) মুঠোফোনে জানান, ‘মেহেরপুর নার্সিং কলেজ পরিচালনার জন্য তিনটি পর্যায়ে প্রশাসনিক কাজ চলছে। অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ে, প্রশাসনিক অনুমোদন ও পদায়নের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এবং প্রয়োজনীয় পদ সৃজনের বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন। তিনি আশা করছেন, আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে প্রক্রিয়াগুলো শেষ হবে।’
প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হলে শিক্ষক ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ, আসবাব ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ, এবং শিক্ষার্থীর ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। তবে নাহিদ-উল-মোস্তাক উল্লেখ করেন যে, যদিও জানুয়ারি পর্যন্ত প্রশাসনিক কাজ শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে, তবে পাঠদান কবে শুরু হবে তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
বিজ্ঞাপন
অধিকন্তু, উচ্চ আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে নার্সদের পদায়ন সংক্রান্ত মামলা চলমান থাকায় অন্য প্রতিষ্ঠানের নার্সদের এখানে পদায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। নাহিদ-উল-মোস্তাক বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম, অন্তত নার্সদের দিয়ে কলেজটির কার্যক্রম শুরু করতে। কিন্তু উচ্চ আদালত ও ট্রাইব্যুনালে পদায়নসংক্রান্ত মামলা থাকায় অন্য কোনো স্থানের নার্সদের এখানে পদায়ন করাও সম্ভব হচ্ছে না।’
মেহেরপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার ভবিষ্যতে নার্সিংয়ে পড়তে চান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি নার্সিং পড়তে চাই। শুনেছি, নার্সিংয়ে পড়াশোনা শেষ করলে চাকরির সুযোগ আছে। দেশে নার্সদের অনেক চাহিদা। আমাদের শহরেই যদি নার্সিং পড়ার সুযোগ থাকত, তাহলে বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে পারতাম।’
মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স মিনতি বিশ্বাস জানান, ‘হাসপাতালে চিকিৎসকের সংকট তো কয়েক যুগ ধরে রয়েছে। অনেক সময় চিকিৎসকের কিছু কাজও আমাদের সামলাতে হয়। শিক্ষানবিশ নার্স পাওয়া গেলে রোগীদের আরও দ্রুত সেবা দেওয়া সম্ভব হতো।’ তিনি যোগ করেন যে, নার্সিং কলেজ চালু হলে স্থানীয় হাসপাতালের সেবার মান উন্নত হতে পারে।
মেহেরপুরের টিঅ্যান্ডটি মোড়ে অবস্থিত কলেজের প্রধান ফটকে তালা ঝুলে থাকলেও, স্থানীয় লোকজনের মতে নিরাপত্তা কর্মী রবিউল ইসলাম প্রায়শই ফটকের তালা খুলে দেন। নিরাপত্তা কর্মী বলেন, ‘এখানে কেউ আসে না। কবে কলেজ চালু হবে, তা-ও জানি না। সব কক্ষে ধুলার স্তর পড়েছে।’ ফলস্বরূপ, ভেতরের কক্ষগুলোতে ধুলো জমে আছে এবং গাছপালা বেড়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
মেহেরপুরের সিভিল সার্জন এ কে এম আবু সাঈদ বলেন, তারা নিয়মিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে কলেজ চালু করার প্রয়াসে আছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ঠিকাদার নির্মাণকাজ শেষ করে ভবন স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করেছে, তবে যন্ত্রপাতি, জনবল ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত সরঞ্জাম ছাড়া ভবনটি কার্যকরী করা সম্ভব নয়।