পোশাকশ্রমিক এক মাসে মালিকের সন্ধান না পেয়ে কুড়িয়ে পাওয়া টাকা ফেরত দিতে মাইকিং চালালেন
এক মাসের অনুসন্ধানের পরেও মালিক পাওয়া না গেলে তিনি এক হাজার টাকা ব্যয় করে পাবলিক নোটিশ দিলেন
নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি · পলাশ, নরসিংদী
প্রকাশ:
এক মাস আগে বিকেলে কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে নরসিংদী পলাশের ডাঙ্গা ইউনিয়নের হাসনহাটা গ্রামে কবির মিয়া কিছু টাকা কুড়িয়ে দেখেন এবং তা তুলে নেন। তিনি সেদিন রাত ৯টা পর্যন্ত এলাকাবাসীদের সঙ্গে খোঁজ নিলেন, তবে মালিকের কোনও চিহ্ন না পেয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে যান।
বিজ্ঞাপন
পরের দিন থেকে প্রতিদিন কাজের পথে অটোরিকশা চালক, কারখানার শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার লোককে জিজ্ঞাসা করেন, কেউ টাকা হারিয়েছেন কি না। এত চেষ্টার পরেও প্রকৃত মালিকের সন্ধান পাননি কবির মিয়া।
গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত কেউ টাকার মালিকানা দাবি করে আসেননি; তাই শেষ চেষ্টা হিসেবে এক হাজার টাকা ব্যয় করে ঘটনাস্থল ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় মাইকিং করান। মাইকিং‑এ লেখা আছে, ‘গত মাসে অক্টোবরের তিন তারিখ রোজ শনিবার ঘোড়াশাল থেকে দৃষ্টিনন্দন ও ফকিরার রাস্তা ধরে আসার পথে বেশ কিছু টাকা পাওয়া যায়। সঠিক তথ্য দিয়ে টাকাগুলো নেওয়ার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করা হলো। যোগাযোগের ঠিকানা: পূর্ব হাসনহাটার মরহুম সাহাজউদ্দিনের বাড়ির জামে মসজিদের ইমাম সাহেবের সঙ্গে।’ কবির মিয়া একই সাথে নিজের মোবাইল নম্বরও যুক্ত করেন।
মাইকিংটি গতকাল দিনভর নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়ন ও ঘোড়াশাল পৌরসভার বিভিন্ন সড়কে করা হয় এবং একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
কবির মিয়া পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের হাসনহাটা গ্রামের মো. আকবর আলীর ছেলে; তিনি স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। কুড়িয়ে পাওয়া টাকার সুনির্দিষ্ট পরিমাণ না বললেও তিনি জানিয়েছেন, টাকার পরিমাণ পাঁচ অঙ্কের ঘরে।
বিজ্ঞাপন
কবির মিয়া বলেন, “জানি না কার টাকা। হয়তো অনেক কষ্টের টাকা। অন্যের টাকা তো আমি খরচ করতে পারি না, আবার দানও করতে পারি না। ইমাম সাহেব কেউ আসে কি না, অপেক্ষা করে দেখতে বলায় এত দিন অপেক্ষা করেছি।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকাল থেকে ডাঙ্গার চরকা পোশাক কারখানা, ডাঙ্গা বাজার, ঘোড়াশালের ঘোড়া চত্বর ও ভিরিন্দা এলাকায় মাইকিং করা হয়; পরে কারখানার বিভিন্ন ফটকের সামনেও মাইকিং করা হয়। মাইকিংয়ের টেক্সট পূর্বে উল্লেখিত একই রকম।
কবির মিয়া প্রথম আলোকে জানান, তিনি ৩ অক্টোবর বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে ঘোড়াশাল‑ডাঙ্গা সড়কের হাসনহাটা এলাকায় টাকা পড়ে থাকতে দেখেন; কুড়িয়ে নেওয়ার পর এলাকাবাসীদের জানান। রাত ৯টা পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করেও মালিক না পেয়ে মসজিদের ইমামের পরামর্শে কয়েক দিন অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।
পরবর্তীতে তিনি জানেন, ওই দিন প্রাণ‑আরএফএল গ্রুপের চরকা কারখানার শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হয়েছিল; সেখানে গিয়ে টাকা পাওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। তবু কোনো দাবি করা ব্যক্তি না পাওয়ায় তিনি মাইকিং চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।
বিজ্ঞাপন
ইমাম নাজমুল হাসান, পূর্ব হাসনহাটা বাইতুন নূর জামে মসজিদের ইমাম, প্রথম আলোকে বলেন, টাকাগুলো কোনো শ্রমিকের বেতনও হতে পারে, তবে প্রকৃত মালিককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না; তাই মাইকিং করা ছাড়া বিকল্প না পেয়ে কবির এই উদ্যোগ নেন।
কবির মিয়া আরও জানান, মাইকিংয়ের জন্য কুড়িয়ে পাওয়া টাকা থেকে এক হাজার টাকা খরচ করা হয়েছে; সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে কেউ না এলে টাকাগুলো এতিমখানায় দান করা হবে।
ইমাম নাজমুল হাসান আবার বলেন, টাকাগুলো মালিকের সন্ধানে মাইকিং করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই এবং কবিরের সততার দৃষ্টান্তকে প্রশংসা করেন।