ডিমের উপকারিতা: দিনে কয়টি ডিম খাওয়া নিরাপদ, কখন খাবেন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
সস্তা, সহজে পাওয়া যায়, রান্না করতে পাঁচ মিনিট লাগে, আবার শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই খেতে পারেন। পুষ্টির দিক থেকে এমন খাবার খুব কমই আছে। তবু ডিম নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই: কুসুম খেলে কি কোলেস্টেরল বাড়ে, দিনে কয়টা খাওয়া যায়, সেদ্ধ না ভাজা কোনটা ভালো।
বিজ্ঞাপন
সংক্ষেপে বললে, ডিমের উপকারিতা আসে এর উচ্চমানের আমিষ থেকে, যাতে শরীরের প্রয়োজনীয় সব অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে। সঙ্গে আছে ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি, ভিটামিন এ, রাইবোফ্লাভিন, সেলেনিয়াম, কোলিন এবং চোখের জন্য উপকারী লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিন। বেশির ভাগ সুস্থ মানুষের জন্য দিনে একটি ডিম নিরাপদ বলে ধরা হয়; যাঁদের কোলেস্টেরল বেশি, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ আছে, তাঁদের পরিমাণ চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা উচিত।
রান্নার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। সেদ্ধ বা পোচ করা ডিম তেলে ডুবিয়ে ভাজা ডিমের চেয়ে স্বাস্থ্যকর, কারণ বাড়তি তেল আর ক্যালরি যোগ হয় না।
একটি ডিমে কী থাকে
একটি মাঝারি থেকে বড় ডিমে মোটামুটি ছয় গ্রামের মতো আমিষ আর ৭০ থেকে ৮০ ক্যালরি থাকে। আকারভেদে এই হিসাব কিছুটা কমবেশি হয়। সাদা অংশে প্রায় শুধু আমিষ আর পানি, চর্বি নেই বললেই চলে। কুসুমে থাকে চর্বি, কোলেস্টেরল আর ভিটামিন-খনিজের বড় অংশ।
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ শুধু সাদা অংশ খেলে আমিষের একটা অংশ পাওয়া যায়, কিন্তু ভিটামিন ডি, বি১২, কোলিন আর লুটেইনের মতো উপাদানের বেশির ভাগই বাদ পড়ে যায়।
ডিমের উপকারিতা
১. পেশি গঠন ও মেরামত: ডিমের আমিষ শরীর সহজে কাজে লাগাতে পারে। শিশুর বৃদ্ধি, কিশোরদের বেড়ে ওঠা, অসুখ থেকে সেরে ওঠা আর বয়স্কদের পেশি ধরে রাখায় এটি সহায়ক।
২. দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা: সকালের নাশতায় ডিম থাকলে অনেকের দুপুর পর্যন্ত খিদে কম লাগে। এতে বারবার হালকা খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
বিজ্ঞাপন
৩. মস্তিষ্কের জন্য কোলিন: কুসুমে থাকা কোলিন স্নায়ুতন্ত্রের জন্য দরকারি। গর্ভাবস্থায় শিশুর মস্তিষ্ক গঠনেও এর ভূমিকা আছে বলে পুষ্টিবিদেরা উল্লেখ করেন।
৪. চোখের সুরক্ষা: লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিন চোখের রেটিনায় জমা থাকে এবং বয়সজনিত কিছু চোখের সমস্যার ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
৫. ভিটামিন ডি ও বি১২: খুব কম খাবারেই প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি থাকে, ডিমের কুসুম তার একটি। বি১২ রক্ত তৈরি আর স্নায়ুর জন্য দরকারি।
৬. সাশ্রয়ী আমিষ: মাছ-মাংসের তুলনায় কম খরচে মানসম্মত আমিষের উৎস হিসেবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ডিম বড় ভরসা।
বিজ্ঞাপন
দিনে কয়টা ডিম খাওয়া উচিত
এ প্রশ্নের এক উত্তর সবার জন্য নয়। এখনকার পুষ্টি গবেষণা মোটামুটি এই দিকে ইঙ্গিত করে:
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক: বেশির ভাগের জন্য দিনে একটি ডিম স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। শারীরিক পরিশ্রম বেশি হলে, আর অন্য খাবারে চর্বি ও কোলেস্টেরল কম থাকলে, কেউ কেউ দুটিও খান।
শিশু ও কিশোর: বয়স অনুযায়ী দিনে একটি ডিম সাধারণত ভালো। ছয় মাস বয়সের পর শিশুর বাড়তি খাবারে ভালো করে সেদ্ধ ডিম যোগ করা যায়; কোনো অ্যালার্জির লক্ষণ, যেমন গায়ে চাকা চাকা দাগ, বমি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে শিশু বিশেষজ্ঞকে জানান।
বিজ্ঞাপন
ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা উচ্চ কোলেস্টেরল: এ ক্ষেত্রে কিছু গবেষণায় বেশি ডিম খাওয়ার সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক দেখা গেছে, যদিও ফলাফল এক রকম নয়। তাই সপ্তাহে কয়টি খাবেন, তা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করুন।
মনে রাখবেন, ডিমের সঙ্গে কী খাচ্ছেন তা-ও গুরুত্বপূর্ণ। পরোটা, মাখন আর প্রক্রিয়াজাত মাংসের সঙ্গে ডিম ভাজা আর সবজি ও রুটির সঙ্গে সেদ্ধ ডিম, স্বাস্থ্যের দিক থেকে এক নয়।
ডিমের কুসুম খাওয়া নিয়ে ভুল ধারণা
একসময় মনে করা হতো, কুসুমের কোলেস্টেরল সরাসরি রক্তের কোলেস্টেরল বাড়ায়, তাই কুসুম বাদ দেওয়াই ভালো। পরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে খাবারের কোলেস্টেরলের চেয়ে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্সফ্যাট আর সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস রক্তের কোলেস্টেরলে বেশি প্রভাব ফেলে। তবে মানুষভেদে শরীরের প্রতিক্রিয়া আলাদা।
বিজ্ঞাপন
তাই সুস্থ মানুষের কুসুম ফেলে দেওয়ার দরকার নেই; এতে বরং পুষ্টির বড় অংশ নষ্ট হয়। যাঁদের রক্তে কোলেস্টেরল বেশি বা চিকিৎসক কুসুম সীমিত করতে বলেছেন, তাঁরা সেই পরামর্শ মানবেন।
সেদ্ধ ডিমের উপকারিতা আর খাওয়ার সময়
সেদ্ধ ডিমে কোনো তেল লাগে না, তাই ক্যালরি নিয়ন্ত্রণে থাকে। পোচ বা অল্প তেলে অমলেটও ভালো বিকল্প, বিশেষ করে সঙ্গে পেঁয়াজ, টমেটো, পালংশাক বা ক্যাপসিকাম দিলে। ডুবো তেলে ভাজা, ঘিয়ে ভাজা বা বারবার গরম করা তেলে ভাজা ডিম কম খাওয়াই ভালো।
পুরো সেদ্ধ ডিম পেতে পানি ফোটার পর মাঝারি আঁচে আট থেকে দশ মিনিট রাখুন, তারপর ঠান্ডা পানিতে দিন। বেশিক্ষণ সেদ্ধ করলে কুসুমের চারপাশে সবুজাভ ধূসর স্তর পড়ে, এটি ক্ষতিকর নয়, তবে স্বাদ কিছুটা বদলে যায়।
বিজ্ঞাপন
ডিম খাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো "সঠিক সময়" নেই। সকালের নাশতায় খেলে দিনের শুরুতে আমিষ মেলে আর পেট বেশিক্ষণ ভরা থাকে, তাই অনেকে সকালে খেতে পছন্দ করেন। ব্যায়ামের পর বা দুপুর-রাতের খাবারের সঙ্গেও খাওয়া যায়। রাতে ভারী ভাজা ডিম খেলে কারও কারও হজমে অস্বস্তি হতে পারে।
কাঁচা ডিম বা আধা সেদ্ধ ডিমে সালমোনেলা জীবাণুর ঝুঁকি থাকে। গর্ভবতী নারী, ছোট শিশু, বয়স্ক এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন মানুষের জন্য কুসুম ও সাদা অংশ পুরোপুরি শক্ত হওয়া পর্যন্ত রান্না করা ডিমই নিরাপদ।
নিরাপদে ডিম কেনা ও রাখা
ফাটা বা খোসায় ময়লা লেগে থাকা ডিম কিনবেন না। ডিম ফ্রিজের ভেতরের তাকে রাখুন, দরজার তাকে তাপমাত্রা ওঠানামা করে। ময়লা থাকলে সংরক্ষণের আগে না ধুয়ে রান্নার ঠিক আগে ধুয়ে নিন। ডিম ধরার পর হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
বিজ্ঞাপন
ডিম তাজা কি না বুঝতে একটি গ্লাসে পানি নিয়ে ডিম ছাড়ুন। তাজা ডিম তলায় শুয়ে থাকে, কিছুটা পুরোনো ডিম খাড়া হয়ে দাঁড়ায়, আর ভেসে উঠলে সেটি বেশ পুরোনো, না খাওয়াই ভালো। ভাঙার পর দুর্গন্ধ পেলে অবশ্যই ফেলে দিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
দেশি মুরগির ডিম কি ফার্মের ডিমের চেয়ে বেশি পুষ্টিকর?
মুরগির খাবারের ওপর ডিমের কিছু পুষ্টি উপাদান নির্ভর করে, তবে দুই ধরনের ডিমই ভালো আমিষের উৎস। দেশি ডিমের কুসুমের রং গাঢ় হলেও পুষ্টিতে পার্থক্য খুব বড় নয় বলে ধরা হয়।
বিজ্ঞাপন
হাঁসের ডিম কি খাওয়া যায়?
যায়। হাঁসের ডিম আকারে বড়, চর্বি ও কোলেস্টেরলও কিছুটা বেশি। অবশ্যই ভালো করে সেদ্ধ বা রান্না করে খান।
ব্যায়াম করলে কি কাঁচা ডিম খাওয়া ভালো?
না। কাঁচা ডিমে জীবাণুর ঝুঁকি থাকে এবং রান্না করা ডিমের আমিষ শরীর বরং ভালোভাবে কাজে লাগায়। সেদ্ধ ডিমই ভালো বিকল্প।
বিজ্ঞাপন
ডিম খেলে কি ব্রণ হয় বা শরীর গরম হয়?
ডিম খেলে শরীর গরম হয় বা ব্রণ হয়, এমন ধারণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই। তবে কারও ডিমে অ্যালার্জি থাকলে চুলকানি, চাকা বা পেটের সমস্যা হতে পারে; তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।