মোবাইল কেনার আগে যা জানা দরকার: বাজেট অনুযায়ী সঠিক ফোন বাছাই
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
ফোন কেনার সময় অনেকেই দুটি জিনিস দেখেন: ক্যামেরা কত মেগাপিক্সেল আর র্যাম কত জিবি। অথচ বছরখানেক পর যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি ভোগায়, তা হলো ফোন ধীর হয়ে যাওয়া, চার্জ দিনভর না থাকা, স্টোরেজ ভরে যাওয়া আর আপডেট বন্ধ হয়ে যাওয়া। বিজ্ঞাপনের বড় সংখ্যার আড়ালে এই আসল বিষয়গুলো প্রায়ই চাপা পড়ে।
বিজ্ঞাপন
মোবাইল কেনার আগে যা জানা দরকার, তা সংক্ষেপে চারটি ধাপে ভাগ করা যায়। প্রথমে বাজেট আর নিজের ব্যবহারের ধরন ঠিক করুন। দ্বিতীয়ত, প্রসেসর বা চিপসেট, র্যাম ও স্টোরেজ, ব্যাটারি ও চার্জিং, পর্দা আর ক্যামেরা মিলিয়ে দেখুন। তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠান কত বছর সফটওয়্যার আপডেট দেবে তা জানুন। চতুর্থত, কেনার সময় আইএমইআই যাচাই, অফিশিয়াল ওয়ারেন্টি আর ক্যাশ মেমো নিশ্চিত করুন।
মোবাইল কেনার সময় কি কি দেখে কিনতে হয়, এই প্রশ্নের উত্তর তাই শুধু কাগজের স্পেসিফিকেশনে নেই, আছে নিজের ব্যবহারের সঙ্গে সেগুলো মেলানোয়। দাম আর মডেল প্রতি মাসে বদলায়, তাই এখানে নির্দিষ্ট ফোনের নাম বা দাম নেই। যে নিয়মগুলো সব বাজেটে খাটে, সেগুলোই নিচে বিস্তারিত।
বাজেট আর ব্যবহার আগে ঠিক করুন
দোকানে গিয়ে বাজেট ঠিক করলে প্রায়ই তা বেড়ে যায়, কারণ "আর একটু দিলেই ভালোটা পাবেন" কথাটা সব জায়গায় শোনা যায়। তাই ঘর থেকেই সর্বোচ্চ সীমা ঠিক করে বের হোন।
বিজ্ঞাপন
ফোন কেনার আগে যা জানা দরকার, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে সহজ অথচ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত ধাপ। এরপর ভাবুন ফোনটি কে, কী কাজে ব্যবহার করবেন। বাবা-মায়ের জন্য হলে বড় পর্দা, জোরালো স্পিকার, দীর্ঘ ব্যাটারি আর সহজ ব্যবহারই মূল। শিক্ষার্থীর জন্য অনলাইন ক্লাস, পর্যাপ্ত স্টোরেজ আর ভালো ব্যাটারি। যাঁরা ফ্রিল্যান্সিং, ব্যবসা বা সামাজিক মাধ্যমে কনটেন্ট বানান, তাঁদের জন্য ভালো ক্যামেরা, মসৃণ পারফরম্যান্স ও বেশি স্টোরেজ। আর যাঁরা গেম খেলেন, তাঁদের দরকার শক্তিশালী চিপসেট ও ভালো তাপ নিয়ন্ত্রণ।
প্রসেসর, র্যাম ও স্টোরেজ
চিপসেট বা প্রসেসর: ফোনের গতি ও দীর্ঘস্থায়িত্বের মূল চাবিকাঠি। একই দামের দুটি ফোনের মধ্যে চিপসেটের পার্থক্য বড় হতে পারে। স্ন্যাপড্রাগন, মিডিয়াটেক ডাইমেনসিটি বা হেলিও, স্যামসাংয়ের এক্সিনস, অ্যাপলের এ-সিরিজ, প্রতিটির ভেতরে নানা স্তর আছে। ফোনের পুরো চিপসেটের নাম জেনে স্বাধীন পর্যালোচনায় এর পারফরম্যান্স ও গরম হওয়ার প্রবণতা দেখে নিন। শুধু "অক্টা-কোর" লেখা দেখে সন্তুষ্ট হবেন না, এটি প্রায় সব ফোনেই থাকে।
র্যাম: সাধারণ ব্যবহারে আজকাল অন্তত চার থেকে ছয় জিবি র্যাম আরামদায়ক, আর দীর্ঘমেয়াদি মসৃণ ব্যবহারের জন্য আট জিবি বা বেশি ভালো। অনেক ফোনে "ভার্চুয়াল র্যাম" বা "এক্সটেন্ডেড র্যাম" লেখা থাকে, যা আসলে স্টোরেজের অংশ ধার নেয়। এটি আসল র্যামের সমান কাজ করে না, তাই মূল র্যামের সংখ্যাটি দেখুন।
বিজ্ঞাপন
স্টোরেজ: ছবি, ভিডিও আর অ্যাপের আকার দিন দিন বাড়ছে। ৬৪ জিবি এখন খুব দ্রুত ভরে যায়। সম্ভব হলে অন্তত ১২৮ জিবি নিন। মেমোরি কার্ড বসানোর সুযোগ আছে কি না, সেটিও দেখে নিন। স্টোরেজের ধরনেও পার্থক্য আছে, নতুন প্রজন্মের দ্রুত স্টোরেজ ফোনকে বেশি চটপটে রাখে।
ব্যাটারি, পর্দা ও ক্যামেরা
ব্যাটারি ও চার্জিং: ব্যাটারির ক্ষমতা মিলিঅ্যাম্পিয়ার-আওয়ারে লেখা থাকে, তবে শুধু সংখ্যা নয়, চিপসেট কতটা বিদ্যুৎসাশ্রয়ী তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত চার্জিং সুবিধাজনক, তবে বাক্সে চার্জার দেওয়া আছে কি না জেনে নিন। কিছু ফোনের সঙ্গে চার্জার আলাদা কিনতে হয়।
পর্দা: অ্যামোলেড পর্দায় রং গাঢ় ও কালো রং সত্যিকারের কালো দেখায়, আর এলসিডি সাধারণত কম দামে আসে। উচ্চ রিফ্রেশ রেট, যেমন নব্বই বা একশো বিশ হার্জ, স্ক্রল ও অ্যানিমেশনকে মসৃণ করে। রোদে ব্যবহার করলে পর্দার উজ্জ্বলতা গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
ক্যামেরা: মেগাপিক্সেলের সংখ্যা ছবির মানের একমাত্র মাপকাঠি নয়। সেন্সরের আকার, লেন্সের মান, ছবি প্রক্রিয়াকরণের সফটওয়্যার এবং ছবি স্থির রাখার প্রযুক্তি মিলেই ছবি ভালো হয়। অনেক ফোনে চার-পাঁচটি ক্যামেরা লেখা থাকলেও বাড়তিগুলো কম মানের ছোট লেন্স। দোকানে নিজে কম আলোয় ছবি তুলে দেখুন, ভিডিও করে দেখুন কাঁপছে কি না।
সফটওয়্যার আপডেটের মেয়াদ
অনেকে এই বিষয়টি একেবারেই খেয়াল করেন না, অথচ এটি ফোনের নিরাপত্তা ও আয়ু ঠিক করে। কোনো প্রতিষ্ঠান কত বছর অপারেটিং সিস্টেম ও নিরাপত্তা আপডেট দেবে, তা সাধারণত তাদের অফিশিয়াল ঘোষণায় থাকে। বেশি বছর আপডেট মানে বেশি দিন নিরাপদে ব্যবহার। মোবাইল ব্যাংকিং বা অফিসের কাজে ফোন ব্যবহার করলে বিষয়টি আরও জরুরি, কারণ আপডেট বন্ধ হওয়া ফোনে নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ে এবং একসময় কিছু অ্যাপও চলা বন্ধ হয়ে যায়।
কেনার সময় যাচাইয়ের তালিকা
বিজ্ঞাপন
১. আইএমইআই যাচাই: ফোনে *#০৬# ডায়াল করলে আইএমইআই নম্বর দেখায়। এটি বাক্সের গায়ে লেখা নম্বরের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। বিটিআরসির ব্যবস্থায় এসএমএসে KYD লিখে একটি স্পেস দিয়ে পনেরো সংখ্যার আইএমইআই নম্বর লিখে ১৬০০২ নম্বরে পাঠালে হ্যান্ডসেটটি বৈধভাবে আমদানি বা উৎপাদিত কি না জানা যায়। হ্যান্ডসেট নিবন্ধন নিয়ে সরকারের নীতি বিভিন্ন সময়ে বদলেছে, তাই কেনার সময় হালনাগাদ নিয়ম জেনে নিন।
২. অফিশিয়াল ওয়ারেন্টি: অনুমোদিত পরিবেশকের ফোনে দেশের সার্ভিস সেন্টারে ওয়ারেন্টি পাওয়া যায়। আনঅফিশিয়াল ফোন কম দামে পাওয়া গেলেও ওয়ারেন্টি থাকে শুধু দোকানের মুখের কথায়।
৩. বাক্সের সিল ও আনুষঙ্গিক: নতুন ফোনের বাক্সের সিল অক্ষত কি না, ক্যাবল, চার্জার বা অন্যান্য জিনিস ঠিকঠাক আছে কি না দেখুন।
৪. পর্দা ও বোতাম পরীক্ষা: পর্দায় দাগ বা মৃত পিক্সেল, টাচের সংবেদনশীলতা, বোতাম, স্পিকার, মাইক্রোফোন, দুই সিমের স্লট ও চার্জিং পোর্ট দোকানেই পরীক্ষা করুন।
বিজ্ঞাপন
৫. ক্যাশ মেমো: দোকানের নাম, ঠিকানা, ফোনের মডেল ও আইএমইআই নম্বর লেখা ক্যাশ মেমো নিন। পরে ওয়ারেন্টি দাবি বা হারানো ফোনের জিডিতে এটি কাজে লাগে।
পুরোনো ফোন কিনলে বাড়তি সতর্কতা
ব্যবহৃত ফোন কিনলে বিক্রেতার কাছে মূল বাক্স ও ক্যাশ মেমো চান। ফোনটি ফ্যাক্টরি রিসেট করা আছে কি না এবং আগের মালিকের গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্ট সরানো হয়েছে কি না নিশ্চিত হোন, নইলে পরে ফোন লক হয়ে যেতে পারে। ব্যাটারির অবস্থা, পর্দা বদলানো হয়েছে কি না, পানিতে পড়ার চিহ্ন আছে কি না দেখুন। অচেনা জায়গায় খুব কম দামে বিক্রি হওয়া ফোন চুরি হওয়া হতে পারে, এমন ফোন কিনলে আপনিই আইনি ঝামেলায় পড়তে পারেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
নতুন ফোন কেনার সবচেয়ে ভালো সময় কোনটি?
নতুন মডেল বাজারে আসার পর অনেক সময় আগের মডেলের দাম কমে। তবে অপেক্ষার চেয়ে প্রয়োজনই আসল বিবেচ্য। প্রয়োজন হলে বাজেটের মধ্যে সেরা ভারসাম্যপূর্ণ ফোনটি নিন।
অনলাইনে ফোন কেনা কি নিরাপদ?
অনুমোদিত ব্র্যান্ড শপ বা নির্ভরযোগ্য বিক্রেতার কাছ থেকে কিনলে নিরাপদ। ডেলিভারির সময় বাক্স খুলে পরীক্ষা ও আইএমইআই মেলানোর সুযোগ আছে কি না আগে জেনে নিন।
বিজ্ঞাপন
ফাইভজি ফোন কি এখনই দরকার?
দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলে ফাইভজি সমর্থন একটি বাড়তি সুবিধা। তবে আপনার এলাকায় সেবা ও অপারেটরের নেটওয়ার্ক কতটা আছে, তা দেখে সিদ্ধান্ত নিন।
বেশি র্যাম মানেই কি ভালো ফোন?
না। দুর্বল চিপসেটের সঙ্গে বেশি র্যাম থাকলেও ফোন ধীর হতে পারে। চিপসেট, র্যাম, স্টোরেজ ও সফটওয়্যার, সবকিছুর ভারসাম্যই ভালো ফোনের পরিচয়।