ল্যাপটপ কেনার আগে যা জানা দরকার: প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক বাছাই
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
দোকানে ঢুকলেই বিক্রেতা বলবেন, "এটা নিন ভাই, লেটেস্ট মডেল।" তাকে সাজানো ঝকঝকে ল্যাপটপগুলোর গায়ে লেখা নানা সংখ্যা আর সংক্ষিপ্ত রূপ, কোর আই-ফাইভ, রাইজেন সেভেন, ষোলো জিবি, পাঁচশো বারো এসএসডি। এসব না বুঝে কিনলে হয় প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ হয়, নয়তো কয়েক মাসেই বুঝতে পারেন যন্ত্রটি আপনার কাজের উপযোগী নয়।
বিজ্ঞাপন
ল্যাপটপ কেনার আগে যা জানা দরকার, তার প্রথম কথা হলো: দোকানে যাওয়ার আগে নিজের কাজের তালিকা তৈরি করুন। আপনি কি শুধু পড়াশোনা, অফিসের কাগজপত্র আর ইন্টারনেট ব্যবহার করবেন, নাকি ছবি-ভিডিও সম্পাদনা, প্রোগ্রামিং বা গেম খেলবেন? কাজ অনুযায়ী প্রসেসর, র্যাম, স্টোরেজ ও গ্রাফিকসের চাহিদা বদলায়। এরপর দেখতে হয় পর্দা, ব্যাটারি, ওজন, কি-বোর্ড, পোর্ট এবং সবশেষে ওয়ারেন্টি ও বিক্রয়োত্তর সেবা।
দাম দ্রুত বদলায় বলে এই লেখায় নির্দিষ্ট মডেল বা দামের কথা নেই। বরং যে বিষয়গুলো বুঝলে যেকোনো বাজেটে নিজেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, সেগুলোই ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।
আগে কাজ, তারপর কনফিগারেশন
ব্যবহারকারীদের মোটামুটি চারটি দলে ভাগ করা যায়।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ ব্যবহার ও পড়াশোনা: ওয়ার্ড, এক্সেল, ব্রাউজিং, অনলাইন ক্লাস, ভিডিও দেখা। এখানে মাঝারি প্রসেসর, পর্যাপ্ত র্যাম আর এসএসডি থাকলেই যথেষ্ট। দামি গ্রাফিকস কার্ডের দরকার নেই।
অফিস ও ফ্রিল্যান্সিং: একসঙ্গে অনেক ট্যাব, ভিডিও মিটিং, ডিজাইনের হালকা কাজ। এখানে একটু শক্তিশালী প্রসেসর আর বেশি র্যাম স্বস্তি দেয়। ব্যাটারি ও বহনযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও সম্পাদনা, প্রোগ্রামিং: শক্তিশালী প্রসেসর, বেশি র্যাম, বড় এসএসডি এবং ভালো রঙের পর্দা দরকার। ভিডিও ও থ্রিডি কাজে আলাদা গ্রাফিকস কার্ড বড় সুবিধা দেয়।
গেমিং: শক্তিশালী আলাদা গ্রাফিকস কার্ড, ভালো কুলিং ব্যবস্থা এবং উচ্চ রিফ্রেশ রেটের পর্দা। তবে এ ধরনের ল্যাপটপ সাধারণত ভারী হয় এবং ব্যাটারি কম চলে।
বিজ্ঞাপন
নিজের দল চিনে নিলে অর্ধেক সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। ল্যাপটপ কেনার সময় কি কি দেখে কিনতে হয়, সেই তালিকাও তখন ছোট হয়ে আসে, কারণ যে বৈশিষ্ট্য আপনার কাজে লাগবে না, তার জন্য বাড়তি টাকা দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।
প্রসেসর: ল্যাপটপের মস্তিষ্ক
বাজারে প্রধানত ইন্টেল ও এএমডির প্রসেসর পাওয়া যায়, আর অ্যাপলের ম্যাকবুকে থাকে অ্যাপলের নিজস্ব চিপ। ইন্টেলের কোর আই-থ্রি, আই-ফাইভ, আই-সেভেন বা নতুন নামকরণের কোর আলট্রা সিরিজ, আর এএমডির রাইজেন থ্রি, ফাইভ, সেভেন, এগুলো মোটামুটি ক্ষমতার ধাপ বোঝায়।
তবে শুধু আই-ফাইভ বা আই-সেভেন দেখে বিচার করবেন না। প্রজন্ম খুব গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক প্রজন্ম পুরোনো আই-সেভেনের চেয়ে নতুন প্রজন্মের আই-ফাইভ অনেক সময় দ্রুত ও বিদ্যুৎসাশ্রয়ী। প্রসেসরের মডেল নম্বরেই প্রজন্মের তথ্য থাকে। বিক্রেতাকে পুরো মডেল নম্বর জিজ্ঞাসা করুন এবং প্রস্তুতকারকের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে মিলিয়ে নিন। এ ছাড়া প্রসেসরের নামের শেষের অক্ষর থেকেও বোঝা যায় এটি বেশি ব্যাটারিসাশ্রয়ী নাকি বেশি শক্তিশালী ধরনের।
বিজ্ঞাপন
র্যাম ও স্টোরেজ
র্যাম: একসঙ্গে কতগুলো কাজ মসৃণভাবে চলবে, তা নির্ভর করে র্যামের ওপর। আজকের দিনে সাধারণ ব্যবহারের জন্যও আট জিবি র্যাম ন্যূনতম ধরা হয়, আর অফিস, ফ্রিল্যান্সিং বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের জন্য ষোলো জিবি স্বস্তিদায়ক। ভারী সম্পাদনার কাজে আরও বেশি। কেনার আগে জেনে নিন পরে র্যাম বাড়ানোর সুযোগ আছে কি না, কারণ অনেক পাতলা ল্যাপটপে র্যাম বোর্ডে স্থায়ীভাবে লাগানো থাকে।
স্টোরেজ: অবশ্যই এসএসডি নিন। পুরোনো ধরনের হার্ডডিস্কওয়ালা ল্যাপটপ কম দামে পাওয়া গেলেও তা চালু হতে ও প্রোগ্রাম খুলতে অনেক ধীর। এসএসডির মধ্যে এনভিএমই ধরনের এসএসডি আরও দ্রুত। জায়গার ক্ষেত্রে সাধারণ ব্যবহারে মাঝারি আকারের এসএসডি যথেষ্ট, তবে ছবি-ভিডিও নিয়ে কাজ করলে বড় স্টোরেজ বা বাড়তি এসএসডি বসানোর সুযোগ দেখে নিন।
পর্দা, ব্যাটারি, ওজন আর কি-বোর্ড
বিজ্ঞাপন
পর্দা: অন্তত ফুল এইচডি রেজল্যুশন নিন, এর কম হলে লেখা ঝাপসা লাগে। আইপিএস বা ওলেড প্যানেলে রং ও দেখার কোণ ভালো হয়। দিনে বাইরে কাজ করলে উজ্জ্বলতা বেশি হওয়া দরকার। আকারের ক্ষেত্রে চৌদ্দ ইঞ্চি বহনে সুবিধাজনক, আর পনেরো-ষোলো ইঞ্চি বড় পর্দায় কাজের আরাম দেয়।
ব্যাটারি: বিজ্ঞাপনে লেখা ব্যাটারি সময় বাস্তবে প্রায়ই কম হয়। বিভিন্ন স্বাধীন পর্যালোচনায় বাস্তব ব্যবহারের হিসাব দেখে নিন। যাঁরা লোডশেডিং বা বাইরে কাজের কারণে চার্জার ছাড়া চালাতে চান, তাঁদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।
ওজন: প্রতিদিন ব্যাগে বহন করলে দেড় কেজির আশপাশের ল্যাপটপ আরামদায়ক। গেমিং ল্যাপটপ অনেক বেশি ভারী হয়।
কি-বোর্ড ও টাচপ্যাড: দোকানে নিজে কয়েক লাইন টাইপ করে দেখুন। চাবিগুলোর চাপ আরামদায়ক কি না, ব্যাকলাইট আছে কি না, টাচপ্যাড মসৃণ কি না।
বিজ্ঞাপন
পোর্ট: ইউএসবি, এইচডিএমআই, হেডফোন জ্যাক, প্রয়োজনে ইউএসবি-সি ও কার্ড রিডার আছে কি না দেখুন। প্রজেক্টর বা বাড়তি মনিটর ব্যবহার করলে এইচডিএমআই কাজে লাগে।
কেনার সময় দোকানে যা যাচাই করবেন
ল্যাপটপ কেনার সময় করণীয় শুধু কনফিগারেশন মেলানো নয়। হাতে নিয়ে কয়েকটি জিনিস নিজে পরীক্ষা করা আর কাগজপত্র বুঝে নেওয়াও জরুরি।
১. অফিশিয়াল না আনঅফিশিয়াল: দেশের অনুমোদিত পরিবেশকের মাধ্যমে আসা ল্যাপটপে স্থানীয় ওয়ারেন্টি ও সার্ভিস সেন্টারের সুবিধা থাকে। কম দামের আনঅফিশিয়াল পণ্যে ওয়ারেন্টি দেয় শুধু দোকান, যা ঝুঁকিপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
২. ওয়ারেন্টির শর্ত: কত দিনের ওয়ারেন্টি, কোন কোন অংশ এর আওতায়, ব্যাটারি ও অ্যাডাপ্টারের জন্য আলাদা শর্ত আছে কি না, সার্ভিস সেন্টার কোথায়। লিখিত ওয়ারেন্টি কার্ড ও ক্যাশ মেমো নিন।
৩. বাক্স ও সিরিয়াল নম্বর: বাক্সের সিরিয়াল নম্বর আর ল্যাপটপের নিচের নম্বর মিলিয়ে নিন। সিল খোলা বাক্স হলে কারণ জিজ্ঞাসা করুন।
৪. পর্দা ও অংশগুলো পরীক্ষা: পুরো সাদা ও কালো পর্দায় মৃত পিক্সেল বা দাগ আছে কি না দেখুন। স্পিকার, ক্যামেরা, ওয়াইফাই, সব পোর্ট ও কি-বোর্ড পরীক্ষা করুন।
৫. অপারেটিং সিস্টেম: লাইসেন্সপ্রাপ্ত উইন্ডোজ আগে থেকে দেওয়া আছে কি না জানুন। পাইরেটেড সফটওয়্যার নিরাপত্তা ও আপডেটের ঝুঁকি তৈরি করে।
বিজ্ঞাপন
৬. চার্জার: আসল অ্যাডাপ্টার দেওয়া হচ্ছে কি না এবং তা ল্যাপটপের মডেলের সঙ্গে মেলে কি না দেখুন।
পুরোনো বা ব্যবহৃত ল্যাপটপ কিনলে
সীমিত বাজেটে ব্যবহৃত ল্যাপটপ ভালো বিকল্প হতে পারে, তবে সাবধানে। ব্যাটারির অবস্থা, কবজা ঢিলা কি না, কি-বোর্ডের সব চাবি কাজ করে কি না এবং অতিরিক্ত গরম হয় কি না পরীক্ষা করুন। সম্ভব হলে অভিজ্ঞ কাউকে সঙ্গে নিন। বিক্রেতার কাছ থেকে মূল ক্যাশ মেমো বা মালিকানার প্রমাণ চেয়ে নিন, যাতে চুরি হওয়া পণ্য কেনার ঝুঁকি না থাকে। পরিচয় নিশ্চিত না হলে খুব কম দামের প্রলোভনে পা দেবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
শিক্ষার্থীর জন্য কোন ল্যাপটপ ভালো?
পড়াশোনা ও সাধারণ কাজের জন্য নতুন প্রজন্মের মাঝারি প্রসেসর, অন্তত আট জিবি র্যাম, এসএসডি, ফুল এইচডি পর্দা এবং ভালো ব্যাটারির ল্যাপটপ যথেষ্ট। প্রোগ্রামিং বা ডিজাইন পড়লে র্যাম বেশি নিন।
গ্রাফিকস কার্ড কি সবার দরকার?
না। আজকের প্রসেসরের সঙ্গে থাকা বিল্ট-ইন গ্রাফিকস সাধারণ কাজ ও ভিডিও দেখার জন্য যথেষ্ট। ভিডিও সম্পাদনা, থ্রিডি বা গেমিংয়ের জন্য আলাদা গ্রাফিকস কার্ড লাগে।
বিজ্ঞাপন
ম্যাকবুক নাকি উইন্ডোজ ল্যাপটপ?
ম্যাকবুকের ব্যাটারি ও গঠনমান সাধারণত ভালো, তবে দাম বেশি এবং কিছু সফটওয়্যার শুধু উইন্ডোজে চলে। আপনার কাজের সফটওয়্যার কোন প্ল্যাটফর্মে চলে, সেটি দেখে সিদ্ধান্ত নিন।
অনলাইনে কেনা কি নিরাপদ?
নির্ভরযোগ্য বিক্রেতা বা অনুমোদিত পরিবেশকের অনলাইন দোকান থেকে কিনলে নিরাপদ। ডেলিভারির সময় বাক্স খুলে পরীক্ষা করার সুযোগ ও ফেরতের নীতি আগে জেনে নিন।