স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহ্বান: উচ্চকক্ষ আলোচনা লংমার্চে হবে না, কমিটিতে আসুন
সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, লংমার্চে এসব সমস্যার সমাধান হবে না
নিজস্ব প্রতিবেদক · ঢাকা
প্রকাশ:
অনুপাতক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে আলোচনায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শনিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আয়োজনে ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ সেমিনার সিরিজের প্রথম পর্ব হিসেবে জাদুঘরের মনসুন থিয়েটারে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়।
বিজ্ঞাপন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উচ্চকক্ষের ক্ষমতা কী হবে এবং সংবিধান সংশোধনী উচ্চকক্ষে যাবে কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, এসব বিষয়ের সমাধান লংমার্চে হবে না। সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন, সরকার গণতান্ত্রিক সংস্কার চায়। এমনভাবে সংবিধান সংশোধনী আনা প্রয়োজন যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ভারসাম্য বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যাালান্স’ থাকে। তিনি বিরোধী দলের সহযোগিতা চেয়ে বলেন, ঐকমত্য ও সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করা গেলে সেটি জাতির জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর হবে, কারণ তারা কোনো রাজনৈতিক বিভক্তি চান না।
সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ শূন্য রাখা হলেও তারা কোনো প্রতিনিধি দেয়নি। বিরোধী দলের দাবি, গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। অন্যদিকে সরকার সংসদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চায়। এই মতপার্থক্যের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। শনিবারও তাদের খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখী লংমার্চ কর্মসূচি ছিল।
সেমিনারে বিভিন্ন সময়ের সাংবিধানিক সংকটের উদাহরণ দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাকশালের পরে সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক সংকট তৈরি করেছিল সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী। তাঁর মতে, এই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করায় রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নষ্ট করে এবং শেষ পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি রচিত হয়। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যাতে এ রকম আরেকটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং স্বৈরশাসকের উত্থানের পথ বন্ধ করতে রাজনৈতিক ঐক্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করার লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণতন্ত্রকে পাহারা দেওয়ার জন্য ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে স্বাধীন গণমাধ্যম, স্বাধীন বিচার বিভাগ, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থাকবে। এর বাইরে অন্যান্য সাংবিধানিক সংশোধনী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও তারুণ্যের চাহিদা অনুযায়ী হতে হবে। তিনি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সঙ্গে তার জবাবদিহি না থাকলে সেটিও স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে। তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, আইন মন্ত্রণালয় শুধু ‘পোস্ট অফিসের’ কাজ করে।
বিজ্ঞাপন
শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্র অর্জন করেছিলেন—এমন বক্তব্যের সঙ্গে তিনি একমত নন। তবে তাঁর মতে, তখন শূন্য সাংবিধানিক অবস্থায় অন্য উপায় ছিল না, যদিও শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক চরিত্রে স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা ছিল। তিনি মন্তব্য করেন, ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাও এই চরিত্র ধারণ করেন।
সেমিনারে প্রধান বক্তা ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, এখন যে ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, সেখানে সরকারি দল বা বিরোধী দল—যেকোনো পক্ষ চাইলে অচলাবস্থা তৈরি করতে পারবে। আসিফ নজরুল বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার ক্ষেত্রে অন্তত সরকারি দল ও বিরোধী দলের ঐকমত্য থাকতে হবে। তা না হলে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা সবার জানা।’
সরকারের উদ্দেশে অধ্যাপক আসিফ নজরুল আরও বলেন, ‘আপনারা কতগুলো প্রতিষ্ঠান গড়ে দিয়ে যান। আপনাদের কাছে অনেক বড় একটা সুযোগ এসেছে।’ তিনি বলেন, যত ভালো কথা লেখা হোক, যত সম্পদ থাকুক কিংবা যত সৎ প্রধানমন্ত্রীই থাকুন না কেন, প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা না হলে দেশের উন্নতি হবে না। তাঁর মতে, দুটি প্রতিষ্ঠান সরকারকে প্রকৃত জবাবদিহির মধ্যে রাখতে পারে। এর জন্য উচ্চ আদালতকে স্বাধীন, ক্ষমতাশালী ও দায়িত্বশীল করতে হবে এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বিচারক নিয়োগে আইন প্রণয়ন, ধাপে ধাপে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ উচ্চ আদালতের হাতে দেওয়া এবং সংসদীয় কমিটিগুলোর তলব করার ক্ষমতা বাড়াতে আইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।