বাংলার প্রকৃতি ও জীবন যখন মাটির মায়ায়
প্রদর্শনী ১২ দিন চলবে, ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত, প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।
ঢাকা জেলা প্রতিনিধি · ঢাকা
প্রকাশ:
শিল্পী রেহানা ইয়াসমিন ‘মাটির মায়া’ শিরোনামের একক প্রদর্শনী শুরু করেছেন ২/৬ লালমাটিয়ার দ্য ইলুশনস গ্যালারিতে। এই সংস্করণে ৪০টি ত্রিমাত্রিক কাদামাটির শিল্পকর্ম রয়েছে এবং ১২ দিনব্যাপী চলবে। প্রদর্শনী প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
বিজ্ঞাপন
প্রদর্শিত সব কাজই পোড়া মাটির, যা সাধারণ টেরাকোটার তুলনায় ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্যের গুণসম্পন্ন। টেরাকোটা সাধারণত দ্বিমাত্রিক হয়, তবে রেহানা ইয়াসমিনের কাজগুলো ত্রিমাত্রিকভাবে তৈরি করা হয়েছে, কাদামাটি দিয়ে গঠন করে বিশেষ কায়দায় পোড়া হয়েছে। ফলে এই শিল্পকর্মগুলো ভাস্কর্যের মতো দৃশ্যমানতা অর্জন করেছে।
ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবী ২০ অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা চাকমা উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে রফিকুন নবী প্রদর্শনীর কাজ দেখার পরে মন্তব্য করেন, "কাদামাটি দিয়ে এ ধরনের কাজ করা বেশ পরিশ্রমসাধ্য। একই সঙ্গে অনেক ধৈর্য ও মনোনিবেশেরও প্রয়োজন।"
রফিকুন নবী আরও বলেন, রেহানা ইয়াসমিনের কাজে সৃজনশীলতার পাশাপাশি দক্ষতা ও করণকৌশলের চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে। তিনি যোগ করেন, বিষয়বস্তু হিসেবে শিল্পী প্রকৃতি, মানুষের জীবনযাত্রা ও বিভিন্ন পাখি বেছে নিয়েছেন, যার কম্পোজিশনে নিজস্ব ধরণ দেখা যায়। এই কাজগুলো দর্শকদের মুগ্ধ করবে।
প্রদর্শনীতে দর্শকরা গাছের ডালে বা দালানের কার্নিশে বসে থাকা কাক, পায়রা, শালিক, প্যাঁচা ইত্যাদি পাখির ভঙ্গি ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের চিত্র দেখতে পাবেন। এছাড়া ছাগলসহ বিভিন্ন পশুপাখির চিত্রও রয়েছে, যেমন কসাইখানায় বেঁধে রাখা ছাগল, ঘরে ফেরার সময়ের ছাগল, এবং বাড়ির উঠানে বসে থাকা ছাগল। এসব কাজ ছোট সিরিজের মতো সাজানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, বিভিন্ন পেশার মানুষের চিত্রও কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। বাউল শিল্পীরা একতারা-দোতারা বাজিয়ে গান গাইছেন, পাহাড়ি জনপদের এক নারী ক্লান্ত ভঙ্গিতে গাছের তলে বিশ্রাম নিচ্ছেন, এবং জুমের ফসল নিয়ে ঘরে ফেরার দৃশ্য দেখা যাবে। দোলনায় দোল খাওয়া যুগল, অলংকৃত মৃৎপাত্র, প্রাচীন দরদালানের অংশ ইত্যাদিও প্রদর্শিত হয়েছে।
শিল্পসমালোচক মঈনুদ্দিন খালেদ প্রথম আলোকে জানান, "রেহানা ইয়াসমিনের এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের পরিচয়টি উঠে এসেছে। প্রকৃতি, মানুষের গৃহস্থালি, চারপাশের পশুপাখি—সব চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন তিনি।" তিনি আরও মন্তব্য করেন, "আগ্নেয় তাপে কাদামাটি শুকিয়ে লালচে হয়ে ওঠা, কোথাও কোথাও ধোঁয়া লেগে কালচে ছোপ লাগা আমাদের প্রাচীন পৃথিবীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।" খালেদের মতে, কাজগুলো টেরাকোটার বৈশিষ্ট্যকে ছাপিয়ে স্বতন্ত্র ভাস্কর্যের গুণ অর্জন করেছে এবং দেশের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রত্নবিদ্যা ও নৃবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছে।
রেহানা ইয়াসমিনের এটি প্রথম একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সিরামিক বিভাগ থেকে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং দেশ ও বিদেশে বহু দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। এছাড়া তিনি ‘কালারর্স অব থার্টিন’ নামে নারী শিল্পীদের একটি দলের অন্যতম সংগঠক এবং ২০১৬ সাল থেকে প্রতিবছর যৌথ শিল্পী কর্ম প্রদর্শনী আয়োজন করে যাচ্ছেন।
প্রদর্শনী দর্শকদেরকে বাংলার প্রকৃতি, মানুষ ও লোকজ জীবনের নান্দনিক ভাষ্য উপস্থাপন করে। রেহানা ইয়াসমিন পরিচিত পশুপাখি, সাধারণ মানুষের জীবনযাপন এবং চেনা পরিবেশকে ত্রিমাত্রিক অবয়বে তুলে ধরে, পোড়া মাটির শিল্পে স্বতন্ত্র মাত্রা যুক্ত করেছেন।