রূপচর্চায় ফিটকিরির ব্যবহার: নিয়ম, উপকারিতা ও সাবধানতা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে এক টুকরো ফিটকিরি পাওয়া যায়। কেউ রাখেন পানি পরিষ্কারের জন্য, কেউ সেলুনে দেখেছেন শেভের পর নাপিত গালে ঘষে দিচ্ছেন। রূপচর্চায় ফিটকিরির ব্যবহার নিয়েও নানা কথা শোনা যায়, যার কিছু সত্য, কিছু অতিরঞ্জিত।
বিজ্ঞাপন
সোজা কথায়, ফিটকিরি একটি অ্যাস্ট্রিনজেন্ট, অর্থাৎ ত্বককে সাময়িকভাবে সংকুচিত করে। এর জীবাণুরোধী গুণও আছে। তাই শেভের পর ছোট কাটা থেকে রক্ত পড়া থামাতে, ঘামের দুর্গন্ধ কমাতে আর মাঝেমধ্যে মুখ কুলকুচি করতে এটি কাজে আসে। কিন্তু এটি দাগ মুছে ফেলার বা গায়ের রং বদলানোর কোনো জাদুকরী উপাদান নয়।
ফিটকিরি যেহেতু ত্বকের তেল ও আর্দ্রতা টেনে নেয়, তাই বেশি ব্যবহারে ত্বক রুক্ষ হয়ে যায়, জ্বালাও করতে পারে। নিয়ম মেনে, পরিমাণ বুঝে ব্যবহার করাই আসল কথা।
বাজারে যে স্বচ্ছ বা হালকা সাদা স্ফটিক ফিটকিরি নামে বিক্রি হয়, সেটি সাধারণত পটাশিয়াম অ্যালাম। পানিতে গুললে এটি ময়লা কণাকে জমাট বাঁধিয়ে নিচে বসিয়ে দেয়, এ কারণেই গ্রামে কলসির পানিতে ফিটকিরি দেওয়ার চল আছে। ত্বকের সংস্পর্শে এলে এটি ওপরের স্তরকে খানিকটা টেনে ধরে, ছোট রক্তনালির মুখ বন্ধ করে দেয়। বিদেশে যে ‘অ্যালাম ব্লক’ বা ক্রিস্টাল ডিওডোরেন্ট বিক্রি হয়, সেগুলোও মূলত একই জিনিস।
কেনার সময় পরিষ্কার, স্বচ্ছ টুকরো বেছে নিন। গুঁড়া ফিটকিরি কিনলে খেয়াল রাখুন, তাতে যেন ময়লা বা অন্য কিছু মেশানো না থাকে। ব্যবহারের আগে টুকরোটি পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নেওয়া ভালো।
বিজ্ঞাপন
ত্বকের যত্নে ফিটকিরি: কোথায় কাজে লাগে
১. শেভের পর আফটারশেভ: শেভ শেষে মুখ ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে ভেজা ফিটকিরির টুকরো হালকা করে গালে একবার বুলিয়ে নিন। ছোট কাটা থেকে রক্ত পড়া দ্রুত থামে, রেজরের জ্বালাও কিছুটা কমে। এক-দুই মিনিট পর পানি দিয়ে ধুয়ে ময়েশ্চারাইজার লাগান।
২. ঘামের দুর্গন্ধ কমাতে: গোসলের পর বগল ভালো করে শুকিয়ে ভেজা ফিটকিরি হালকা করে ঘষে নিন। এটি দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী জীবাণু কমাতে সাহায্য করে। তবে ঘাম পুরোপুরি বন্ধ করে না। শেভ বা লোম তোলার ঠিক পরপর লাগাবেন না, জ্বালা করবে।
৩. পায়ের দুর্গন্ধে: এক বালতি কুসুম গরম পানিতে এক চা-চামচ ফিটকিরির গুঁড়া মিশিয়ে দশ মিনিট পা ভিজিয়ে রাখতে পারেন। এরপর পা ভালো করে মুছে শুকিয়ে নিন। মোজা প্রতিদিন বদলানোর অভ্যাসটাও জরুরি।
বিজ্ঞাপন
৪. তৈলাক্ত ত্বকে টোনার হিসেবে: খুব তৈলাক্ত ত্বকের কেউ কেউ এক কাপ গোলাপজলে চিমটি পরিমাণ ফিটকিরি গুলে তুলা দিয়ে কপাল ও নাকে বুলিয়ে নেন। এতে চকচকে ভাব সাময়িকভাবে কমে। তবে শুষ্ক বা সংবেদনশীল ত্বকে এটি একেবারেই করবেন না, আর সপ্তাহে দুই-তিন বারের বেশি নয়।
ব্রণ ও দাগে ফিটকিরি: যা জানা দরকার
অনেকে ব্রণের ওপর সরাসরি ফিটকিরি ঘষেন। এতে ব্রণ কিছুটা শুকিয়ে যেতে পারে, কিন্তু চারপাশের ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, খোসা ওঠা বা জ্বালা হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। ফেটে যাওয়া বা পুঁজভরা ব্রণে ফিটকিরি ঘষলে ক্ষত আরও খারাপ হতে পারে।
মুখের কালো দাগ, মেছতা বা রোদে পোড়া দাগ ফিটকিরিতে দূর হয় বলে যে দাবি শোনা যায়, তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। দাগের জন্য নিয়মিত সানস্ক্রিন এবং প্রয়োজনে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শই বেশি কার্যকর। ‘ফিটকিরি দিয়ে ফর্সা হওয়া’ নিয়ে যেসব ঘরোয়া প্যাকের কথা শোনা যায়, সেগুলো বরং ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর নষ্ট করে দিতে পারে।
বিজ্ঞাপন
দাঁতের যত্নে ফিটকিরি
মুখের দুর্গন্ধ বা মাড়ির হালকা অস্বস্তিতে ফিটকিরি পানির কুলকুচি একটি প্রচলিত ঘরোয়া পদ্ধতি। এর জীবাণুরোধী গুণ মুখের ব্যাকটেরিয়া কিছুটা কমাতে পারে।
১. মিশ্রণ তৈরি: এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে এক চিমটি, অর্থাৎ খুবই অল্প ফিটকিরির গুঁড়া গুলে নিন। পানি যেন বেশি কষা না হয়।
২. কুলকুচি: ত্রিশ সেকেন্ডের মতো মুখে রেখে কুলকুচি করে ফেলে দিন। কোনোভাবেই গিলবেন না।
বিজ্ঞাপন
৩. কতবার: মাঝেমধ্যে, যেমন সপ্তাহে দুই-তিন দিন যথেষ্ট। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করবেন না।
মনে রাখবেন, ফিটকিরি টুথপেস্ট বা ব্রাশের বিকল্প নয়। দিনে দুবার ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মাজা এবং ছয় মাস বা বছরে একবার দাঁতের ডাক্তার দেখানোই মূল যত্ন। দাঁতে ফিটকিরি সরাসরি ঘষবেন না, এতে এনামেলের ক্ষতি হতে পারে। মাড়ি থেকে নিয়মিত রক্ত পড়া, ফুলে যাওয়া বা দাঁত নড়ে যাওয়া মাড়ির রোগের লক্ষণ হতে পারে। ফিটকিরি দিয়ে এগুলো চাপা দিলে আসল সমস্যা দেরিতে ধরা পড়বে।
ব্যবহারের আগে যে সাবধানতা জরুরি
১. প্যাচ টেস্ট: প্রথমবার ব্যবহারের আগে কনুইয়ের ভেতরের দিকে অল্প ফিটকিরি পানি লাগিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা দেখুন। লালচে ভাব, চুলকানি বা জ্বালা হলে ব্যবহার করবেন না।
বিজ্ঞাপন
২. চোখ থেকে দূরে: ফিটকিরি চোখে গেলে তীব্র জ্বালা হয়। সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর পরিষ্কার পানি দিয়ে চোখ ধুয়ে ফেলুন, অস্বস্তি না কমলে চিকিৎসকের কাছে যান।
৩. কাটা বা পোড়া ক্ষতে নয়: শেভের ছোট আঁচড় ছাড়া বড় কাটা, পোড়া বা ঘায়ে ফিটকিরি লাগাবেন না।
৪. ময়েশ্চারাইজার ভুলবেন না: ফিটকিরি ব্যবহারের পর ত্বক টানটান লাগলে হালকা ময়েশ্চারাইজার লাগান। শুষ্ক ত্বকে এটি যত কম ব্যবহার করা যায়, তত ভালো।
৫. শিশুর নাগালের বাইরে: ফিটকিরির টুকরো দেখতে চিনি বা মিছরির মতো, শিশু ভুল করে মুখে দিতে পারে। বেশি পরিমাণে গিলে ফেললে বমি বা পেটে সমস্যা হতে পারে। তাই উঁচু তাকে, আলাদা পাত্রে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
একজিমা, সোরিয়াসিস বা খুব সংবেদনশীল ত্বক থাকলে ফিটকিরি এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। ত্বকে দীর্ঘদিনের কোনো সমস্যা থাকলে ঘরোয়া উপায়ে পরীক্ষা না চালিয়ে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
মুখ ধোয়ার পানিতে ফিটকিরি: একটি প্রচলিত ভুল
গ্রামে অনেকে কলসি বা ড্রামের ঘোলা পানিতে ফিটকিরি দিয়ে সেই পানি দিয়েই মুখ ধোন, কেউ কেউ খানও। ফিটকিরি পানির ময়লা কণা নিচে বসিয়ে দেয় ঠিকই, কিন্তু সব জীবাণু মেরে ফেলে না। তাই ফিটকিরি দেওয়া পানি খাওয়ার আগে ওপরের পরিষ্কার অংশ আলাদা করে ফুটিয়ে নেওয়া বা অন্য স্বীকৃত উপায়ে বিশুদ্ধ করা দরকার।
মুখ ধোয়ার পানিতে প্রতিদিন ফিটকিরি গুলে ব্যবহার করারও দরকার নেই। এতে বাড়তি কোনো সৌন্দর্য আসে না, বরং বারবার ব্যবহারে ত্বক টানটান ও রুক্ষ হয়ে যেতে পারে। পরিষ্কার পানি আর একটি মৃদু ফেসওয়াশই মুখের জন্য যথেষ্ট।
বিজ্ঞাপন
ফিটকিরির টুকরো কীভাবে পরিষ্কার রাখবেন
শেভ বা বগলে ব্যবহারের পর টুকরোটি পানিতে ধুয়ে শুকনো জায়গায় রাখুন। ভেজা অবস্থায় সাবানদানিতে ফেলে রাখলে গলে যায়, ময়লাও জমে। একজনের টুকরো আরেকজন ব্যবহার না করাই স্বাস্থ্যকর, কারণ শেভের পর ত্বকের সূক্ষ্ম কাটা থেকে জীবাণু ছড়াতে পারে। পুরোনো টুকরোয় ফাটল ধরলে বা ধারালো কিনারা তৈরি হলে বদলে নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ফিটকিরি কি প্রতিদিন মুখে ব্যবহার করা যায়?
বিজ্ঞাপন
প্রতিদিন মুখে ব্যবহার করা ঠিক নয়, কারণ এটি ত্বক শুষ্ক করে দেয়। শেভের পর আফটারশেভ হিসেবে অল্প সময়ের জন্য ব্যবহার করে ধুয়ে ফেলা যায়, তার বেশি নয়।
ফিটকিরি দিয়ে কি গায়ের রং ফর্সা হয়?
না। ফিটকিরি ত্বকের প্রাকৃতিক রং বদলায় না। উল্টো বেশি ঘষলে ত্বক রুক্ষ ও লালচে হয়ে যেতে পারে।
ফিটকিরি পানি দিয়ে কি প্রতিদিন কুলকুচি করা যায়?
বিজ্ঞাপন
মাঝেমধ্যে করা যায়, তবে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে নয়। মুখের দুর্গন্ধ বা মাড়ির সমস্যা না কমলে দাঁতের চিকিৎসক দেখান।
বগলে ফিটকিরি লাগালে কি ঘাম বন্ধ হয়?
পুরোপুরি বন্ধ হয় না। এটি মূলত দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী জীবাণু কমিয়ে গন্ধ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অতিরিক্ত ঘাম হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।