খেজুরের উপকারিতা: খাওয়ার নিয়ম আর দিনে কয়টি খাওয়া ভালো
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
রমজানে ইফতারের টেবিলে খেজুর থাকবেই, আর এখন সারা বছরই বাজারে নানা জাতের খেজুর পাওয়া যায়। ছোট এই ফলটি মিষ্টি, সহজে বহন করা যায়, নষ্টও হয় দেরিতে। তবে খেজুর যত উপকারী, ততটাই ক্যালরিবহুল; তাই কতটুকু খাচ্ছেন, সেটি জানা জরুরি।
বিজ্ঞাপন
খেজুরের উপকারিতা মূলত চার জায়গায়: প্রাকৃতিক শর্করা থেকে দ্রুত শক্তি, আঁশ থেকে হজমে সহায়তা, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো খনিজ, আর কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দিনে তিন থেকে পাঁচটি মাঝারি আকারের খেজুর সাধারণত যথেষ্ট বলে পুষ্টিবিদেরা পরামর্শ দেন। ওজন কমাতে চাইলে বা ডায়াবেটিস থাকলে পরিমাণ আরও কম রাখতে হয়।
খেজুর খাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো জাদুকরি সময় নেই। সকালে নাশতার সঙ্গে, দুপুরের পর হালকা খিদেয় বা ব্যায়ামের আগে, যেকোনো সময়ই খাওয়া যায়। কারা কম খাবেন, কীভাবে ভালো খেজুর চিনবেন আর ঘরে কীভাবে রাখবেন, সেসবও নিচে আলাদা করে দেওয়া হলো।
আমাদের বাজারে আজওয়া, মেডজুল, মরিয়ম, সুক্কারি, আম্বার, খুদরি, জাহিদিসহ নানা জাতের খেজুর পাওয়া যায়। জাতভেদে স্বাদ, নরম ভাব আর দাম আলাদা, তবে পুষ্টিগুণে মৌলিক পার্থক্য খুব বড় নয়। দামি জাত মানেই বেশি উপকারী, এমন ভাবার কারণ নেই।
খেজুরে কী আছে
বিজ্ঞাপন
শুকনো খেজুরের বড় অংশ প্রাকৃতিক চিনি, মূলত গ্লুকোজ আর ফ্রুক্টোজ। এ কারণেই খেলে দ্রুত শক্তি পাওয়া যায়। সঙ্গে আছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্য আঁশ, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, কপার, কিছুটা আয়রন আর ভিটামিন বি৬। এতে চর্বি প্রায় নেই, আমিষও খুব কম।
খেজুরের আকার ও জাতভেদে ক্যালরি অনেক আলাদা। বড় নরম মেডজুল জাতের একটি খেজুরে যে ক্যালরি থাকে, ছোট শুকনো খেজুরের দুই-তিনটিতে প্রায় সেই পরিমাণ হতে পারে। তাই "কয়টি" না ভেবে "কতটুকু" ভাবাই ভালো।
খেজুরের উপকারিতা
১. দ্রুত শক্তি: দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর, পরিশ্রমের আগে বা ক্লান্ত লাগলে দু-একটি খেজুর দ্রুত শক্তি জোগায়। এ কারণেই রোজা ভাঙার জন্য এটি এত জনপ্রিয়।
বিজ্ঞাপন
২. হজম ও কোষ্ঠকাঠিন্য: খেজুরের আঁশ মল নরম রাখতে আর অন্ত্রের চলাচল স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে। তবে সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি খেতে হবে, নইলে আঁশ উল্টো পেট ভার করতে পারে।
৩. হৃদ্যন্ত্র ও রক্তচাপ: পটাশিয়াম শরীরে লবণের প্রভাব ভারসাম্যে রাখতে ভূমিকা রাখে। পটাশিয়ামসমৃদ্ধ ফল-সবজির খাদ্যতালিকা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক বলে ধরা হয়, খেজুর তার একটি অংশ হতে পারে।
৪. চিনির ভালো বিকল্প: মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা হলে কেক-বিস্কুট বা মিষ্টির বদলে একটি-দুটি খেজুর খাওয়া তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর, কারণ সঙ্গে আঁশ আর খনিজ মেলে। দুধ, দই বা স্মুদিতে চিনির বদলে খেজুর ব্লেন্ড করে দেওয়া যায়।
৫. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: খেজুরে কিছু পলিফেনলজাতীয় উপাদান আছে, যা শরীরের কোষকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিজ্ঞাপন
খেজুর খেলে রক্ত বাড়ে, এমন কথা প্রচলিত। খেজুরে কিছু আয়রন থাকলেও পরিমাণ খুব বেশি নয়। রক্তস্বল্পতায় শুধু খেজুরের ওপর ভরসা না করে ডাল, শাক, মাছ-মাংস খান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
খেজুর খাওয়ার নিয়ম ও দিনে কয়টি
পরিমাণ: মাঝারি আকারের তিন থেকে পাঁচটি খেজুর বেশির ভাগ সুস্থ মানুষের জন্য যথেষ্ট। বড় মেডজুল জাতের হলে দুই-তিনটিই যথেষ্ট। শিশুদের বয়স অনুযায়ী এক-দুটি।
সঙ্গে কী খাবেন: খেজুরের সঙ্গে কয়েকটি বাদাম, এক গ্লাস দুধ বা এক বাটি দই খেলে শর্করার সঙ্গে আমিষ আর চর্বি যোগ হয়। এতে রক্তে সুগার হঠাৎ বাড়ে না এবং পেট বেশিক্ষণ ভরা থাকে।
বিজ্ঞাপন
ধুয়ে খাওয়া: খোলা বাজারের খেজুর ধুলা-ময়লার সংস্পর্শে থাকে। খাওয়ার আগে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিন। খেজুর মাঝখান থেকে ভেঙে দেখে নিন ভেতরে পোকা বা ছত্রাক আছে কি না।
ভিজিয়ে খাওয়া: শক্ত শুকনো খেজুর রাতে পানিতে ভিজিয়ে সকালে খেলে নরম হয়, চিবানো সহজ হয়। এতে বাড়তি কোনো বিশেষ গুণ তৈরি হয়, এমন প্রমাণ নেই, তবে বয়স্ক ও শিশুদের খেতে সুবিধা।
দাঁতের যত্ন: খেজুর আঠালো, দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকে। খাওয়ার পর কুলি করুন বা পানি খান।
খালি পেটে খেজুর আর ইফতারে খেজুর
বিজ্ঞাপন
খালি পেটে খেজুর খাওয়া বেশির ভাগ মানুষের জন্য সমস্যা নয়। সকালে পানি খেয়ে দু-একটি খেজুর দিয়ে দিন শুরু করেন অনেকে। তবে খালি পেটে অনেকগুলো খেজুর খেলে রক্তে সুগার দ্রুত বাড়ে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আবার যাঁদের পেট ফাঁপার সমস্যা আছে, তাঁদের বেশি খেজুরে অস্বস্তি হতে পারে।
মুসলমানদের মধ্যে খেজুর দিয়ে ইফতার করার প্রচলন আছে; হাদিসে খেজুর দিয়ে, না পেলে পানি দিয়ে ইফতারের কথা এসেছে (তিরমিজি, আবু দাউদ)। সারা দিন রোজার পর দু-তিনটি খেজুর আর পানি দিয়ে শুরু করলে শরীর দ্রুত শক্তি পায়, এরপর ধীরে ধীরে অন্য খাবার খাওয়া ভালো। ইফতারে বেশি খেজুর আর সঙ্গে ভাজাপোড়া ও মিষ্টি পানীয় একসঙ্গে খেলে ক্যালরি অনেক বেড়ে যায়।
ডায়াবেটিসে খেজুর আর কারা সাবধান থাকবেন
ডায়াবেটিস থাকলে খেজুর একেবারে নিষিদ্ধ নয়, তবে এটি শর্করা, তাই হিসাব করে খেতে হবে। অনেক পুষ্টিবিদ এক বেলায় একটি-দুটি খেজুরের বেশি না খেতে বলেন এবং সেদিনের অন্য শর্করা, যেমন ভাত বা রুটি, কিছুটা কমিয়ে দিতে বলেন। খেজুর খাবারের সঙ্গে বা বাদামের সঙ্গে খেলে সুগার তুলনামূলক ধীরে বাড়ে। নিজের জন্য নিরাপদ পরিমাণ জানতে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন এবং খাওয়ার পর সুগার মেপে দেখুন।
বিজ্ঞাপন
কিডনির দীর্ঘমেয়াদি রোগে অনেক রোগীকে পটাশিয়াম সীমিত রাখতে বলা হয়; তাঁরা চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া নিয়মিত খেজুর খাবেন না। যাঁরা ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন, তাঁরা দিনে এক-দুটির মধ্যে রাখুন। খুব ছোট শিশুকে আস্ত খেজুর দেবেন না; বিচি ফেলে ছোট টুকরা বা চটকে দিন, যাতে গলায় আটকে না যায়।
ভালো খেজুর কেনা ও সংরক্ষণ
খেজুরের ত্বক স্বাভাবিকভাবে কিছুটা কুঁচকানো থাকে। অস্বাভাবিক চকচকে, আঠালো বা চিনির দানা লেগে থাকা খেজুর দেখলে সতর্ক হোন; কিছু ক্ষেত্রে সিরাপ বা তেল মাখিয়ে চকচকে করা হয় বলে অভিযোগ আছে। টক বা মদের মতো গন্ধ, সাদা ছত্রাকের দাগ বা ভেতরে পোকা থাকলে কিনবেন না। প্যাকেটজাত খেজুরে উৎপাদন ও মেয়াদের তারিখ দেখে নিন।
বাড়িতে খেজুর মুখবন্ধ কাচের বা খাবারের উপযোগী পাত্রে রাখুন। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কিছুদিন ভালো থাকে, তবে দীর্ঘদিন রাখতে চাইলে ফ্রিজে রাখুন। নরম ভেজা জাতের খেজুর ফ্রিজে রাখাই ভালো।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
খেজুর খেলে কি ওজন বাড়ে?
পরিমিত খেলে ওজন বাড়ার কারণ নেই। কিন্তু খেজুরে ক্যালরি বেশি, তাই প্রতিদিন অনেকগুলো খেলে বাড়তি ক্যালরি থেকে ওজন বাড়তে পারে।
গর্ভাবস্থায় খেজুর খাওয়া যাবে কি?
বিজ্ঞাপন
সাধারণত পরিমিত খাওয়া যায় এবং এটি শক্তি ও আঁশের ভালো উৎস। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকলে পরিমাণ চিকিৎসকের সঙ্গে ঠিক করুন।
রাতে খেজুর খাওয়া কি ঠিক?
খাওয়া যায়, তবে রাতের খাবারের পর মিষ্টি হিসেবে এক-দুটির বেশি না খাওয়াই ভালো। ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ করে নিন।
শিশুকে কোন বয়স থেকে খেজুর দেওয়া যায়?
বিজ্ঞাপন
ছয় মাসের পর বাড়তি খাবার শুরু হলে খেজুর চটকে বা খিচুড়ি-সুজিতে মিশিয়ে অল্প পরিমাণে দেওয়া যায়। আস্ত খেজুর বা বিচিসহ দেবেন না।