হাদিস কাকে বলে: হাদিসের অর্থ, প্রকারভেদ ও গুরুত্ব
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
নামাজ কয় রাকাত, জাকাত কত শতাংশ, রোজা ভাঙে কিসে, কোরআনে এসবের বিস্তারিত হিসাব নেই। কোরআন নামাজ কায়েম করতে বলেছে, জাকাত দিতে বলেছে, কিন্তু কীভাবে, তা দেখিয়ে দিয়েছেন মহানবী (সা.)। তাঁর সেই কথা, কাজ ও অনুমোদনের বিবরণই হাদিস।
বিজ্ঞাপন
সংক্ষেপে উত্তর: মহানবী মুহাম্মাদ (সা.) যা বলেছেন, যা করেছেন এবং তাঁর সামনে কেউ কিছু করলে বা বললে তিনি যা নীরবে অনুমোদন করেছেন, তার নির্ভরযোগ্য বিবরণকে হাদিস বলে। অনেক আলেম এর সঙ্গে তাঁর শারীরিক গঠন ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বর্ণনাও হাদিসের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
কোরআনের পর হাদিস ইসলামি শরিয়তের দ্বিতীয় উৎস। হাদিস ছাড়া কোরআনের অনেক নির্দেশ বাস্তবে পালন করা সম্ভব নয়।
হাদিস শব্দের অর্থ
আরবি "হাদিস" শব্দের আভিধানিক অর্থ নতুন, কথা, বাণী বা সংবাদ। কোরআনেও শব্দটি "কথা" বা "বাণী" অর্থে এসেছে। পরিভাষায় শব্দটি নির্দিষ্টভাবে মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত বর্ণনার জন্য ব্যবহৃত হয়।
বিজ্ঞাপন
হাদিসের সঙ্গে প্রায়ই "সুন্নাহ" শব্দটি আসে। সুন্নাহ অর্থ পথ বা পদ্ধতি, অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর জীবনাচার। হাদিস হলো সেই জীবনাচারের লিখিত বা মৌখিক বিবরণ। সাধারণ আলোচনায় দুটি শব্দ প্রায় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়।
হাদিসের দুটি অংশ: সনদ ও মতন
প্রতিটি হাদিসের দুটি অংশ থাকে।
সনদ: বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিক তালিকা। যেমন, অমুক বলেছেন, তিনি অমুকের কাছে শুনেছেন, তিনি শুনেছেন অমুক সাহাবির কাছে, আর সাহাবি শুনেছেন মহানবী (সা.)-এর কাছে।
বিজ্ঞাপন
মতন: হাদিসের মূল বক্তব্য বা বাণী।
মুসলিম পণ্ডিতেরা সনদ যাচাইয়ের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান গড়ে তুলেছেন, যাকে বলা হয় উসুলুল হাদিস। হাজারো বর্ণনাকারীর জীবনী, সততা, স্মৃতিশক্তি, কার সঙ্গে কার সাক্ষাৎ সম্ভব ছিল, এসব যাচাই করে হাদিসের মান নির্ধারণ করা হয়। বর্ণনাকারীদের জীবনী নিয়ে আলাদা শাস্ত্রকে বলা হয় আসমাউর রিজাল।
হাদিস কত প্রকার ও কী কী
হাদিসের প্রকারভেদ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে করা হয়। প্রধান কয়েকটি ভাগ নিচে দেওয়া হলো।
বিজ্ঞাপন
বিষয়বস্তুর ধরন অনুযায়ী তিন প্রকার
১. কাওলি হাদিস: মহানবী (সা.)-এর মুখের কথা। যেমন, "সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল" (বুখারি, মুসলিম)।
২. ফে'লি হাদিস: তাঁর কাজের বর্ণনা। যেমন, তিনি কীভাবে ওজু করতেন, কীভাবে নামাজ পড়তেন।
৩. তাকরিরি হাদিস: তাঁর সামনে কোনো সাহাবি কিছু করেছেন বা বলেছেন, আর তিনি নিষেধ না করে চুপ থেকে বা সম্মতি দিয়ে অনুমোদন করেছেন।
বিজ্ঞাপন
উৎস অনুযায়ী তিন প্রকার
১. মারফু: যে বর্ণনা সরাসরি মহানবী (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে।
২. মাওকুফ: যে বর্ণনা কোনো সাহাবি পর্যন্ত পৌঁছেছে, অর্থাৎ সাহাবির কথা বা কাজ।
৩. মাকতু: যে বর্ণনা কোনো তাবেয়ি পর্যন্ত পৌঁছেছে।
বিজ্ঞাপন
বর্ণনাকারীর সংখ্যা অনুযায়ী
১. মুতাওয়াতির: প্রতিটি স্তরে এত বেশি সংখ্যক বর্ণনাকারী, যাঁদের সবার মিথ্যার ওপর একমত হওয়া অসম্ভব। এ ধরনের হাদিস নিশ্চিত জ্ঞান দেয়। যেমন, "যে আমার নামে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বলে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।"
২. খবরে ওয়াহিদ বা আহাদ: যে হাদিস মুতাওয়াতিরের স্তরে পৌঁছায়নি। এর ভেতরে আবার মাশহুর, আজিজ ও গরিব ভাগ আছে, বর্ণনাকারীর সংখ্যা অনুযায়ী।
গ্রহণযোগ্যতা অনুযায়ী
বিজ্ঞাপন
১. সহিহ: যার সনদ অবিচ্ছিন্ন, প্রত্যেক বর্ণনাকারী সৎ ও পূর্ণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী, এবং যাতে কোনো গোপন ত্রুটি বা অন্য নির্ভরযোগ্য বর্ণনার সঙ্গে বিরোধ নেই।
২. হাসান: সহিহের সব শর্ত আছে, তবে কোনো বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি সামান্য কম। এটিও দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
৩. জয়িফ বা দুর্বল: যাতে সহিহ বা হাসানের এক বা একাধিক শর্ত অনুপস্থিত। দুর্বল হাদিস দিয়ে আকিদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না। ফজিলতের ক্ষেত্রে কিছু শর্তসহ এর ব্যবহার নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা আছে।
৪. মাওজু বা জাল: যা মিথ্যাভাবে মহানবী (সা.)-এর নামে বানানো হয়েছে। প্রকৃত অর্থে এটি হাদিসই নয়, একে হাদিস হিসেবে প্রচার করা কঠিন গুনাহ।
বিজ্ঞাপন
হাদিসে কুদসি: যে হাদিসে মহানবী (সা.) আল্লাহর কথা বর্ণনা করেছেন, তবে তা কোরআনের অংশ নয়। যেমন, সহিহ মুসলিমের হাদিস, "হে আমার বান্দারা, আমি নিজের ওপর জুলুম হারাম করেছি..."।
হাদিস কি কোরআনের ব্যাখ্যা
হ্যাঁ, হাদিসের প্রধান ভূমিকাগুলোর একটি কোরআনের ব্যাখ্যা। সূরা নাহলের ৪৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, আমি আপনার প্রতি জিকির (কোরআন) নাজিল করেছি, যাতে আপনি মানুষের কাছে স্পষ্ট করে দেন, যা তাদের প্রতি নাজিল হয়েছে।
হাদিস কোরআনের সঙ্গে কয়েকভাবে সম্পর্কিত:
বিজ্ঞাপন
সংক্ষিপ্ত নির্দেশের বিস্তারিত রূপ: কোরআনে "নামাজ কায়েম করো" আছে; ওয়াক্ত, রাকাত, রুকু-সিজদার পদ্ধতি এসেছে হাদিসে। বুখারির হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমরা আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখো, সেভাবে নামাজ পড়ো।
সাধারণ বিধানের সীমা নির্ধারণ: কোরআনে চুরির শাস্তির কথা আছে; কতটুকু চুরিতে, কোন শর্তে, তা নির্ধারিত হয়েছে হাদিসে।
নতুন বিধান: কিছু বিধান সরাসরি হাদিসে এসেছে, যেমন কোনো নারী এবং তার ফুফু বা খালাকে একই সঙ্গে বিয়েতে রাখার নিষেধাজ্ঞা (বুখারি, মুসলিম)।
এ কারণেই সূরা হাশরের ৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, রাসুল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো, আর যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।
বিজ্ঞাপন
হাদিসের প্রধান গ্রন্থগুলো
হাদিস সংকলনের মধ্যে ছয়টি গ্রন্থকে একত্রে "সিহাহ সিত্তাহ" বা ছয় বিশুদ্ধ গ্রন্থ বলা হয়: সহিহ বুখারি (ইমাম বুখারি, মৃত্যু ২৫৬ হিজরি), সহিহ মুসলিম (ইমাম মুসলিম, মৃত্যু ২৬১ হিজরি), সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিজি, সুনানে নাসাঈ এবং সুনানে ইবনে মাজাহ। এর মধ্যে বুখারি ও মুসলিমকে সবচেয়ে বিশুদ্ধ ধরা হয়। তবে বাকি চারটিতে কিছু দুর্বল হাদিসও আছে, যা মুহাদ্দিসরা চিহ্নিত করেছেন। এর বাইরে মুয়াত্তা ইমাম মালেক, মুসনাদে আহমদসহ আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ সংকলন রয়েছে।
হাদিস শেয়ার করার আগে সতর্কতা
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন "হাদিস" নামে অসংখ্য বাণী ছড়ায়, যার অনেকগুলোর কোনো সূত্র নেই। মহানবী (সা.)-এর নামে মিথ্যা বলার শাস্তি নিয়ে মুতাওয়াতির হাদিস আছে। তাই কোনো হাদিস শেয়ার করার আগে দেখুন, কোন গ্রন্থের উদ্ধৃতি দেওয়া আছে, আর সন্দেহ হলে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে যাচাই করুন। "শুনেছি" বা "কোথাও পড়েছি" ভিত্তিতে হাদিস প্রচার না করাই নিরাপদ। সহিহ মুসলিমের ভূমিকায় একটি হাদিস আছে, কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শোনে, তা-ই বলে বেড়ায়। ধর্মীয় বিষয়ে এ সতর্কতা আরও বেশি প্রযোজ্য।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হাদিস ও কোরআনের পার্থক্য কী?
কোরআন আল্লাহর বাণী, শব্দ ও অর্থ দুটোই আল্লাহর, যা তিলাওয়াত ইবাদত। হাদিস মহানবী (সা.)-এর কথা, কাজ ও অনুমোদন; এর তিলাওয়াত কোরআনের মতো ইবাদত হিসেবে গণ্য নয়, এবং নামাজে কিরাত হিসেবে পড়া যায় না।
সব হাদিস কি সমান নির্ভরযোগ্য?
বিজ্ঞাপন
না। সহিহ ও হাসান হাদিস দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য, দুর্বল হাদিসের ব্যবহার সীমিত, আর জাল বর্ণনা সম্পূর্ণ বর্জনীয়।
হাদিস কবে লিখিত আকারে সংকলিত হয়?
সাহাবিদের যুগেই কিছু সাহাবি ব্যক্তিগতভাবে হাদিস লিখে রাখতেন। পরে উমাইয়া খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের সময় সরকারিভাবে সংকলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, আর হিজরি তৃতীয় শতকে প্রধান গ্রন্থগুলো সংকলিত হয়।