অনলাইনে চাকরির আবেদন করার নিয়ম: সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
আবেদনের শেষ দিনের রাত এগারোটা। সার্ভার ধীর, ছবি আপলোড হচ্ছে না, এসএমএসের উত্তর আসছে না। প্রতিবছর হাজারো চাকরিপ্রার্থী এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান, আর অনেকেই শুধু শেষ মুহূর্তের ঝামেলায় একটি সম্ভাবনাময় সুযোগ হারান। নিয়মটা আগে জানা থাকলে আর একটু আগে শুরু করলে পুরো কাজটি আধা ঘণ্টায় শেষ করা যায়।
বিজ্ঞাপন
অনলাইনে চাকরির আবেদন করার নিয়ম সরকারি আর বেসরকারি চাকরিতে আলাদা। সরকারি চাকরির বেশির ভাগ আবেদন হয় টেলিটকের মাধ্যমে। বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া আবেদনের ঠিকানায় গিয়ে অনলাইন ফরম পূরণ, নির্দিষ্ট মাপের ছবি ও স্বাক্ষর আপলোড, তারপর টেলিটক প্রিপেইড সিম থেকে এসএমএস পাঠিয়ে আবেদন ফি জমা দিতে হয়। ফি জমা হলে প্রবেশপত্র ডাউনলোডের জন্য ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড আসে। বেসরকারি চাকরিতে সাধারণত চাকরির পোর্টাল বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ক্যারিয়ার পাতায় প্রোফাইল তৈরি করে সিভি জমা দিতে হয়, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান ইমেইলে আবেদন নেয়।
সব ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় নিয়ম একটি: বিজ্ঞপ্তি পুরোটা মন দিয়ে পড়ুন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজের শর্ত, ফি, ছবির মাপ ও সময়সীমা ঠিক করে দেয়। বয়সসীমা গণনার নির্দিষ্ট তারিখ, শিক্ষাগত যোগ্যতার সমমান, অভিজ্ঞতার শর্ত কিংবা কোন জেলার প্রার্থীরা আবেদন করতে পারবেন, এসব খুঁটিনাটি না মিললে আবেদন জমা হলেও পরে বাতিল হয়ে যেতে পারে। তাই বিজ্ঞপ্তির পিডিএফ ফাইলটি ফোনে বা কম্পিউটারে সংরক্ষণ করে রাখুন, প্রবেশপত্র ও পরীক্ষার নির্দেশনা দেখার সময়ও এটি কাজে লাগবে।
অনলাইনে আবেদন করতে কি কি লাগে
আবেদন শুরুর আগে নিচের জিনিসগুলো হাতের কাছে গুছিয়ে রাখুন। মাঝপথে খুঁজতে গেলে ভুল বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
১. শিক্ষাগত তথ্য: এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, পাসের বছর ও ফল। সনদ বা নম্বরপত্র সামনে রেখে লিখুন।
২. জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন নম্বর: বিজ্ঞপ্তি যেটি চায়।
৩. রঙিন ছবি: সাম্প্রতিক, সাদা বা হালকা পটভূমির পাসপোর্ট আকারের ছবির ডিজিটাল কপি।
৪. স্বাক্ষরের স্ক্যান: সাদা কাগজে কালো কালিতে দেওয়া স্বাক্ষর স্ক্যান বা পরিষ্কার ছবি তুলে কেটে নেওয়া।
বিজ্ঞাপন
৫. স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: জেলা, উপজেলা, ডাকঘর, পোস্ট কোডসহ।
৬. সচল মোবাইল নম্বর: সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে এসএমএসে ফি দেওয়ার জন্য একটি টেলিটক প্রিপেইড সিম, যাতে যথেষ্ট ব্যালেন্স আছে।
৭. অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য সনদ: প্রয়োজনে কাজের অভিজ্ঞতা, কোটা বা বিশেষ যোগ্যতার তথ্য।
টেলিটকে সরকারি চাকরির আবেদনের ধাপ
বিজ্ঞাপন
টেলিটকের মাধ্যমে আবেদনযোগ্য সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিগুলোর তালিকা সাধারণত alljobs.teletalk.com.bd ঠিকানায় পাওয়া যায়। প্রতিটি বিজ্ঞপ্তির জন্য আলাদা আবেদনের ঠিকানা থাকে, যা বিজ্ঞপ্তিতেই লেখা থাকে।
১. বিজ্ঞপ্তি পড়ুন: পদের নাম, বয়সসীমা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আবেদন শুরু ও শেষের তারিখ এবং ফি দেখে নিশ্চিত হোন আপনি যোগ্য।
২. ফরম পূরণ: আবেদনের পাতায় পদ বেছে নিয়ে নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা ও শিক্ষাগত তথ্য দিন। নাম ও জন্মতারিখ শিক্ষাসনদের সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে লিখুন।
৩. ছবি ও স্বাক্ষর আপলোড: সাধারণত ছবির মাপ ৩০০ x ৩০০ পিক্সেল এবং স্বাক্ষরের মাপ ৩০০ x ৮০ পিক্সেল চাওয়া হয়, সঙ্গে ফাইলের সর্বোচ্চ আকারের সীমা থাকে। তবে বিজ্ঞপ্তিভেদে এটি আলাদা হতে পারে, তাই নির্দেশনা দেখে মাপ ঠিক করুন।
বিজ্ঞাপন
৪. প্রিভিউ যাচাই: জমা দেওয়ার আগে প্রিভিউ পাতায় প্রতিটি তথ্য মিলিয়ে নিন। জমা দেওয়ার পর সাধারণত সংশোধনের সুযোগ থাকে না।
৫. অ্যাপ্লিকেন্টস কপি সংরক্ষণ: জমা দিলে একটি ইউজার আইডিসহ আবেদনের কপি তৈরি হয়। এটি ডাউনলোড বা প্রিন্ট করে রাখুন।
৬. এসএমএসে ফি পরিশোধ: বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া নিয়মে টেলিটক প্রিপেইড সিম থেকে দুটি এসএমএস পাঠাতে হয়। প্রথম এসএমএসে প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট সংক্ষিপ্ত কোড, স্পেস দিয়ে ইউজার আইডি লিখে ১৬২২২ নম্বরে পাঠালে ফিরতি এসএমএসে একটি পিন আসে। দ্বিতীয় এসএমএসে প্রতিষ্ঠানের কোড, স্পেস, Yes, স্পেস, সেই পিন লিখে আবার ১৬২২২ নম্বরে পাঠালে ফি কেটে নেওয়া হয়। ফরম জমার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফি না দিলে আবেদন বাতিল হয়ে যায়, সময়সীমা বিজ্ঞপ্তিতে লেখা থাকে।
৭. ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ: ফি জমার পর এসএমএসে ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড আসে। এগুলো দিয়েই পরে প্রবেশপত্র ডাউনলোড করতে হবে, তাই লিখে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
বেসরকারি চাকরিতে অনলাইনে আবেদন
বেসরকারি খাতে আবেদনের পথ মূলত তিনটি।
চাকরির পোর্টাল: দেশে প্রচলিত চাকরির ওয়েবসাইট ও অ্যাপে একবার পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল তৈরি করলে পরে এক ক্লিকে বিভিন্ন পদে আবেদন করা যায়। প্রোফাইলে সাম্প্রতিক ছবি, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও প্রত্যাশিত বেতন হালনাগাদ রাখুন।
প্রতিষ্ঠানের ক্যারিয়ার পাতা: বড় ব্যাংক, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও এনজিও সাধারণত নিজেদের ওয়েবসাইটের ক্যারিয়ার অংশে আবেদন নেয়। সেখানে আলাদা একাউন্ট খুলে ফরম পূরণ করতে হয়।
বিজ্ঞাপন
ইমেইলে আবেদন: বিজ্ঞাপনে ইমেইল ঠিকানা দেওয়া থাকলে বিষয়ে পদের নাম লিখে, মূল অংশে সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে, পিডিএফ সিভি সংযুক্ত করে পাঠান।
পেশাদার নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্মে হালনাগাদ প্রোফাইল রাখাও এখন কাজে আসে, কারণ অনেক নিয়োগকর্তা সেখান থেকে প্রার্থী খোঁজেন। সব ক্ষেত্রেই প্রতিটি পদের চাহিদা অনুযায়ী সিভি সামান্য সাজিয়ে নিলে বাছাইয়ে টেকার সম্ভাবনা বাড়ে।
যে ভুলগুলো আবেদন বাতিল করে
১. নামের বানানে অমিল: সনদ, পরিচয়পত্র আর আবেদনে নামের বানান আলাদা হলে পরে মৌখিক পরীক্ষা বা যোগদানের সময় সমস্যা হয়।
বিজ্ঞাপন
২. ভুল মাপের ছবি: আকার বা মাপ না মিললে আপলোড হয় না, আর ঝাপসা ছবি পরে প্রবেশপত্রে সমস্যা তৈরি করে।
৩. শেষ দিনের অপেক্ষা: শেষ দিনে সার্ভারে চাপ বাড়ে, এসএমএস আসতে দেরি হয়। অন্তত দুই-তিন দিন আগে আবেদন সারুন।
৪. ফি জমা না দেওয়া: অনেকে ফরম জমা দিয়েই নিশ্চিন্ত হয়ে যান, অথচ ফি না দিলে আবেদন গণ্য হয় না।
৫. ভুয়া বিজ্ঞপ্তি: চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা চাওয়া বা অচেনা লিংকে ব্যক্তিগত তথ্য দিতে বলা বিজ্ঞপ্তি এড়িয়ে চলুন। সরকারি বিজ্ঞপ্তি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটেও মিলিয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
টেলিটক সিম ছাড়া কি সরকারি চাকরির ফি দেওয়া যায়?
বেশির ভাগ টেলিটকভিত্তিক আবেদনে টেলিটক প্রিপেইড সিম থেকেই ফি দিতে হয়। নিজের না থাকলে পরিচিত কারও টেলিটক সিম ব্যবহার করা যায়। কিছু প্রতিষ্ঠান অন্য পদ্ধতিতেও ফি নেয়, যা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ থাকে।
মোবাইল দিয়ে কি আবেদন করা যায়?
বিজ্ঞাপন
যায়, তবে ফরম লম্বা হলে এবং ছবি-স্বাক্ষরের মাপ ঠিক করতে কম্পিউটার বেশি সুবিধাজনক। মোবাইলে করলে ব্রাউজারের ডেস্কটপ মোড চালু করলে কাজ সহজ হয়।
ইউজার আইডি বা পাসওয়ার্ড হারিয়ে গেলে কী করব?
টেলিটকের আবেদন সাইটে সাধারণত হারানো ইউজার আইডি বা পাসওয়ার্ড পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা থাকে, যা এসএমএসের মাধ্যমেও করা যায়। নির্দিষ্ট নিয়ম ওই বিজ্ঞপ্তির আবেদন পাতায় দেওয়া থাকে।
কম্পিউটারের দোকানে আবেদন করালে কী খেয়াল রাখব?
বিজ্ঞাপন
নিজে পাশে বসে প্রতিটি তথ্য মিলিয়ে নিন, অ্যাপ্লিকেন্টস কপি নিজের কাছে নিন এবং ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড নিজের ফোনেই রাখুন।
প্রবেশপত্র কখন ও কোথা থেকে নামাব?
পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা হলে সাধারণত নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে এসএমএস আসে। তখন একই আবেদন সাইটে ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করে প্রবেশপত্র নামাতে হয়। রঙিন প্রিন্ট করে পরীক্ষার দিন সঙ্গে রাখুন এবং এসএমএস না এলেও মাঝে মাঝে প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে নোটিশ দেখে নিন।