কোরআনের আয়াত সংখ্যা কত: সূরা, পারা, রুকু ও আয়াতের হিসাব
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
"কোরআনে আয়াত কয়টি?" প্রশ্নটি করলে বাংলাদেশে অনেকেই উত্তর দেবেন ৬৬৬৬। মাদরাসার পুরোনো বই, কুইজের খাতা, এমনকি ওয়াজেও সংখ্যাটি শোনা যায়। অথচ আমাদের হাতে থাকা যেকোনো মুসহাফের আয়াত নম্বর যোগ করলে পাওয়া যায় ৬২৩৬।
বিজ্ঞাপন
প্রচলিত হাফস রেওয়ায়াতের মুসহাফে, যা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে পড়া হয়, আয়াত গণনা করা হয় কুফি পদ্ধতিতে। সেই হিসাবে কোরআনের আয়াত সংখ্যা ৬২৩৬। সূরা ১১৪টি, পারা বা জুজ ৩০টি।
কোরআনের শব্দ ও অক্ষরে কোনো পার্থক্য নেই, পুরো উম্মাহর কাছে একই কোরআন। পার্থক্য শুধু গণনার পদ্ধতিতে, অর্থাৎ কোন জায়গায় একটি আয়াত শেষ ধরা হবে, তা নিয়ে। নিচে এই বিষয়সহ কোরআনের প্রধান হিসাবগুলো একসঙ্গে দেওয়া হলো।
কোরআনের আয়াত সংখ্যা: ৬২৩৬ নাকি ৬৬৬৬
সাহাবিরা মহানবী (সা.)-এর তিলাওয়াত শুনে আয়াতের শেষ চিহ্নিত করেছেন। কোথাও তিনি থেমেছেন, কোথাও টানা পড়েছেন। এ থেকে বিভিন্ন শহরের কারিদের মধ্যে গণনার কয়েকটি ধারা তৈরি হয়: কুফি, বসরি, শামি, মক্কি ও মাদানি। কুফি গণনায় মোট আয়াত ৬২৩৬; অন্য ধারাগুলোতে সংখ্যাটি ৬২০০-এর ঘরে, সামান্য কমবেশি।
বিজ্ঞাপন
উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। সূরা ফাতিহায় কুফি গণনায় বিসমিল্লাহকে প্রথম আয়াত ধরা হয়, আর শেষ দুই বাক্যকে এক আয়াত। অন্য গণনায় বিসমিল্লাহ বাদ দিয়ে শেষ অংশকে দুই আয়াত ধরা হয়। দুই ক্ষেত্রেই আয়াত সাতটি, শব্দও এক।
তাহলে ৬৬৬৬ এল কোথা থেকে? আলেমরা বলেন, এই সংখ্যা কোনো স্বীকৃত গণনা পদ্ধতি থেকে আসেনি। কোরআনের বিষয়ভিত্তিক আয়াতের একটি প্রচলিত তালিকা, যেমন এত আয়াত আদেশের, এত নিষেধের, এত প্রতিশ্রুতির, যোগ করে এই সংখ্যা বানানো হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যার নির্ভরযোগ্য উৎস নেই। তাই কোরআনের আয়াত সংখ্যা জানতে চাইলে ৬২৩৬ বলাই সঠিক। চাইলে নিজেই যাচাই করতে পারেন: যেকোনো মুসহাফের সূচিপত্রে প্রতিটি সূরার আয়াত সংখ্যা দেওয়া থাকে, সেগুলো যোগ করলেই এই সংখ্যা পাওয়া যায়। ভুল তথ্য শিশুদের শেখানো বা কুইজে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
কোরআনে কয়টি সূরা
কোরআনে মোট ১১৪টি সূরা, এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই।
বিজ্ঞাপন
মক্কি ও মাদানি সূরা: হিজরতের আগে নাজিল হওয়া সূরাকে মক্কি এবং পরে নাজিল হওয়া সূরাকে মাদানি বলা হয়। প্রচলিত হিসাবে মক্কি সূরা ৮৬টি ও মাদানি সূরা ২৮টি। তবে কয়েকটি সূরা নিয়ে আলেমদের মতভেদ থাকায় অন্য হিসাবে সংখ্যায় সামান্য পার্থক্য পাওয়া যায়।
সবচেয়ে বড় সূরা: সূরা বাকারা, আয়াত ২৮৬টি। কোরআনের দীর্ঘতম আয়াতও এই সূরায়, ২৮২ নম্বর আয়াত, যেখানে ঋণের লেনদেন লিখে রাখার বিধান আছে।
সবচেয়ে ছোট সূরা: সূরা কাওসার, আয়াত তিনটি। সূরা আসর ও সূরা নাসরেও তিনটি করে আয়াত, তবে শব্দসংখ্যায় কাওসারই সবচেয়ে ছোট।
বিসমিল্লাহ ছাড়া সূরা: সূরা তাওবা। এর শুরুতে বিসমিল্লাহ নেই।
বিজ্ঞাপন
দুবার বিসমিল্লাহ: সূরা নামলে শুরুর বিসমিল্লাহ ছাড়াও ৩০ নম্বর আয়াতে হজরত সুলাইমান (আ.)-এর চিঠির শুরুতে বিসমিল্লাহ আছে। তাই কোরআনে মোট বিসমিল্লাহর সংখ্যা ১১৪।
কোরআনে কয় পারা, মঞ্জিল ও রুকু
পারা বা জুজ: পড়ার সুবিধার জন্য কোরআনকে ৩০টি প্রায় সমান ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ফারসি শব্দ "পারা" ও আরবি "জুজ" একই অর্থে ব্যবহৃত। রমজানে প্রতিদিন এক পারা পড়লে মাসে এক খতম হয়, তারাবিতেও সাধারণত এভাবে পড়া হয়। এই ভাগ মহানবী (সা.)-এর যুগের নয়, পরবর্তী সময়ে তিলাওয়াতের সুবিধায় করা হয়েছে।
৩০তম পারা: আম্মা পারা নামে পরিচিত। এতে সূরা নাবা থেকে সূরা নাস পর্যন্ত ৩৭টি সূরা আছে, যার বেশির ভাগ ছোট এবং নামাজে বহুল পঠিত।
বিজ্ঞাপন
মঞ্জিল: সপ্তাহে এক খতমের সুবিধার জন্য কোরআনকে সাত মঞ্জিলে ভাগ করা হয়।
রুকু: উপমহাদেশের মুসহাফে বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে পাশে "আইন" চিহ্ন দেওয়া থাকে, যাকে রুকু বলে। তারাবিতে প্রতি রাকাতে মোটামুটি এক রুকু পড়ার সুবিধা থেকে এ ভাগের প্রচলন বলে ধারণা করা হয়। রুকুর মোট সংখ্যা বিভিন্ন সূত্রে ভিন্নভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়, সাধারণত ৫৪০ থেকে ৫৫৮-এর মধ্যে, কারণ বিভিন্ন প্রকাশনায় বিভাজনে কিছু পার্থক্য আছে।
আরও কিছু হিসাব ও তথ্য
সিজদায়ে তিলাওয়াত: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী কোরআনে ১৪টি সিজদার আয়াত আছে। এগুলো পড়লে বা শুনলে একটি সিজদা দেওয়া ওয়াজিব। মুসহাফে এসব জায়গায় পাশে চিহ্ন দেওয়া থাকে।
বিজ্ঞাপন
নাজিলের সময়কাল: প্রায় ২৩ বছর, মক্কায় প্রায় ১৩ বছর ও মদিনায় প্রায় ১০ বছর।
প্রথম নাজিল হওয়া আয়াত: সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত, হেরা গুহায়। এটি বুখারির হাদিসে বর্ণিত।
শেষ নাজিল হওয়া আয়াত: এ নিয়ে একাধিক মত আছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে সূরা বাকারার ২৮১ নম্বর আয়াত। বিধানসংক্রান্ত শেষ আয়াত হিসেবে সূরা মায়েদার ৩ নম্বর আয়াতের কথাও বহুল আলোচিত।
নবীদের নাম: কোরআনে ২৫ জন নবী-রাসুলের নাম এসেছে। মহানবী (সা.)-এর "মুহাম্মাদ" নাম এসেছে চারবার, আর "আহমাদ" নাম একবার, সূরা সফে।
বিজ্ঞাপন
একমাত্র নারীর নাম: কোরআনে নাম ধরে উল্লেখ করা একমাত্র নারী হজরত মারইয়াম (আ.), তাঁর নামে একটি পূর্ণ সূরাও আছে।
কোরআন সংকলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় পুরো কোরআন সাহাবিদের মুখস্থ ছিল এবং বিভিন্ন উপকরণে লিখিত ছিল। প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.)-এর সময় ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফেজ সাহাবি শহীদ হলে হজরত উমর (রা.)-এর পরামর্শে পুরো কোরআন এক জায়গায় গ্রন্থিত করা হয়। এ দায়িত্ব পালন করেন সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)। পরে তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান (রা.) সেই সংকলন থেকে কয়েকটি অনুলিপি তৈরি করে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠান। ঘটনাগুলো সহিহ বুখারিতে বর্ণিত। আজকের সব মুসহাফ সেই উসমানি অনুলিপির ধারাবাহিকতা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
কোরআনে মোট কয়টি শব্দ ও অক্ষর?
বিভিন্ন গবেষক ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে গুনেছেন, ফলে সংখ্যায় পার্থক্য আছে। শব্দ ও অক্ষরের নির্দিষ্ট সংখ্যা বলার চেয়ে এটুকু জানাই যথেষ্ট যে কোরআনের প্রতিটি অক্ষর সংরক্ষিত।
কোন কোন সূরায় সিজদার আয়াত আছে?
হানাফি গণনা অনুযায়ী ১৪টি সিজদার আয়াত আছে এই সূরাগুলোতে: আরাফ, রাদ, নাহল, বনি ইসরাইল, মারইয়াম, হজ, ফুরকান, নামল, সাজদা, সোয়াদ, হা-মিম সাজদা (ফুসসিলাত), নাজম, ইনশিকাক ও আলাক। শাফেয়ি মাজহাবে সূরা হজে দুটি সিজদা ধরা হয় এবং সূরা সোয়াদের সিজদাকে শুকরিয়ার সিজদা গণ্য করা হয়, তাই তাঁদের গণনাতেও সংখ্যা ১৪, তবে তালিকা কিছুটা ভিন্ন। মুসহাফের পাশে দেওয়া চিহ্ন দেখে সহজেই সিজদার জায়গা চেনা যায়।
বিজ্ঞাপন
কোরআনের মাঝখান কোথায়?
পারার হিসাবে ১৫তম পারার শেষে কোরআনের অর্ধেক। অক্ষর বা আয়াতের হিসাবে মধ্যবিন্দু নিয়ে বিভিন্ন মত আছে।
মক্কি ও মাদানি সূরা চেনার উপায় কী?
মুসহাফে প্রতিটি সূরার শুরুতে সাধারণত লেখা থাকে সূরাটি মক্কি না মাদানি। বিষয়বস্তুর দিক থেকে মক্কি সূরায় তাওহিদ, আখিরাত ও নবীদের কাহিনি বেশি, আর মাদানি সূরায় বিধিবিধান ও সমাজ পরিচালনার আলোচনা বেশি।
বিজ্ঞাপন
ছোটদের কোরআন শেখানো কোথা থেকে শুরু করব?
সাধারণত নুরানি বা কায়দা দিয়ে আরবি হরফ চেনানো হয়, তারপর আম্মা পারার ছোট সূরা। এরপর পুরো কোরআন দেখে পড়া।