ভারত ভ্রমণ গাইড: বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা, রুট, খরচ ও জরুরি নিয়ম
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
বাংলাদেশিদের বিদেশ ভ্রমণের তালিকায় ভারত বহু বছর ধরে এক নম্বরে। কেউ যান কলকাতায় কেনাকাটা করতে, কেউ চিকিৎসার জন্য চেন্নাই বা ভেলোরে, কেউ দার্জিলিং-শিলংয়ের পাহাড়ে বা তাজমহল দেখতে আগ্রায়। দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের বিরতির পর ২০২৬ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসা আবার চালু হয়েছে, ফলে আবার অনেকে পরিকল্পনা করছেন।
বিজ্ঞাপন
ভারত ভ্রমণ গাইডের মূল কথা তিনটি। প্রথমত, ভিসা নিতে হয় ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রের মাধ্যমে, পাসপোর্ট জমা দিয়ে। দ্বিতীয়ত, ভিসায় যে পথ বা বন্দর উল্লেখ থাকবে, সেই পথেই যাতায়াত করতে হবে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ থেকে বের হওয়ার আগে ভ্রমণ কর আর বৈদেশিক মুদ্রার নিয়ম মানতে হবে।
নিয়মগুলো সময়ে সময়ে বদলায়, বিশেষ করে ভিসার প্রক্রিয়া। আবেদনের আগে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র ও ভারতীয় হাইকমিশনের সর্বশেষ নির্দেশনা দেখে নিন।
ভিসা: কীভাবে আবেদন করবেন
১. অনলাইন ফরম: ভারতের সরকারি ভিসা পোর্টালে অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণ করুন। ভিসার ধরন হিসেবে পর্যটন, চিকিৎসা বা ব্যবসা, যেটি প্রযোজ্য সেটি বেছে নিন।
বিজ্ঞাপন
২. প্রবেশের পথ বাছাই: ফরমে কোন পথে প্রবেশ ও বের হবেন, যেমন বিমানপথ, বেনাপোল-পেট্রাপোল, বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ী, বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা, আখাউড়া-আগরতলা বা তামাবিল-ডাউকি, তা ঠিকভাবে উল্লেখ করুন। এটি পরে বদলানো কঠিন।
৩. অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও জমা: ভিসা আবেদন কেন্দ্রে নির্ধারিত তারিখে পাসপোর্ট, ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র, আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ যেমন ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা ডলার এনডোর্সমেন্ট, পেশার প্রমাণসহ কাগজ জমা দিন। শুরুতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনার কেন্দ্রে পর্যটন ভিসার আবেদন নেওয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
৪. ফি: ভারত সরকার বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে ভিসা ফি নেয় না, তবে আবেদন কেন্দ্রের প্রসেসিং ফি দিতে হয়।
বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য ভারতের ই-ট্যুরিস্ট ভিসা সুবিধা এখনো নেই বলে জানা যায়, তাই স্টিকার ভিসাই একমাত্র উপায়। দালালের মাধ্যমে দ্রুত ভিসার প্রতিশ্রুতিতে টাকা দেবেন না।
বিজ্ঞাপন
ভারত যাওয়ার প্রধান পথ
১. বেনাপোল-পেট্রাপোল: কলকাতা যাওয়ার সবচেয়ে ব্যবহৃত পথ। ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে বা বাসে বেনাপোল গিয়ে সীমান্ত পার হয়ে কলকাতা।
২. বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ী ও বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা: শিলিগুড়ি, দার্জিলিং ও সিকিমের দিকে যাওয়ার সহজ পথ। ভুটান ও নেপালে সড়কপথে যেতেও এগুলো ব্যবহৃত হয়।
৩. তামাবিল-ডাউকি: সিলেট দিয়ে মেঘালয়ের শিলং ও চেরাপুঞ্জি যাওয়ার পথ।
বিজ্ঞাপন
৪. আখাউড়া-আগরতলা: ত্রিপুরা যাওয়ার পথ।
৫. ট্রেন: ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেস ও খুলনা-কলকাতা বন্ধন এক্সপ্রেস ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে বন্ধ ছিল। দুই দেশ আবার চালুর বিষয়ে আলোচনা করছে, চালু হয়েছে কি না যাত্রার আগে বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে জেনে নিন।
৬. বিমান: ঢাকা থেকে কলকাতা, দিল্লি, চেন্নাই, মুম্বাইসহ কয়েকটি শহরে সরাসরি ফ্লাইট আছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকেও কিছু রুটে ফ্লাইট চলে।
ভারত ভ্রমণের নিয়ম: বের হওয়ার আগে
বিজ্ঞাপন
১. ভ্রমণ কর: স্থলপথে গেলে বর্তমানে প্রায় এক হাজার টাকা ভ্রমণ কর দিতে হয়, সঙ্গে বন্দরের সামান্য সেবা ফি। বিমানে গেলে ভ্রমণ কর সাধারণত টিকিটের দামের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
২. ডলার এনডোর্সমেন্ট: ব্যাংক বা অনুমোদিত মানি চেঞ্জার থেকে ডলার কিনে পাসপোর্টে এনডোর্স করুন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মে ভ্রমণের জন্য বছরে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা নেওয়া যায়।
৩. নগদ টাকা: বাংলাদেশি টাকা নির্দিষ্ট সীমার বেশি সঙ্গে নেওয়া যায় না। বেশি ডলার নগদে বহন করলে কাস্টমসে ঘোষণার নিয়ম আছে।
৪. কাগজপত্রের কপি: পাসপোর্ট, ভিসা আর হোটেল বুকিংয়ের ফটোকপি আলাদা জায়গায় রাখুন, মোবাইলেও ছবি তুলে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
ভারতে পৌঁছে যা মানবেন
ভারতের হোটেলে বিদেশি অতিথিদের তথ্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানানোর নিয়ম আছে, তাই চেক-ইনের সময় পাসপোর্ট ও ভিসার কপি চাওয়া হয়। কিছু ছোট হোটেল বিদেশি অতিথি রাখে না, বুকিংয়ের আগে জেনে নিন। মোবাইল সিম কিনতে পাসপোর্ট, ভিসার কপি আর ছবি লাগে। ভিসার মেয়াদ ও এক সফরে কত দিন থাকা যাবে, তা ভিসায় লেখা থাকে, এর বেশি থাকলে জরিমানা ও ভবিষ্যৎ ভিসায় সমস্যা হয়। সংরক্ষিত বা বিশেষ অনুমতির এলাকায়, যেমন সিকিমের কিছু অংশ ও উত্তর-পূর্বের কিছু এলাকা, যেতে বিদেশিদের আলাদা অনুমতি লাগতে পারে।
ভারতে ঘোরার জায়গা
১. কলকাতা: ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, হাওড়া ব্রিজ, কলেজ স্ট্রিট, নিউমার্কেট। সবচেয়ে কাছের ও সাশ্রয়ী গন্তব্য।
বিজ্ঞাপন
২. দার্জিলিং ও শিলিগুড়ি অঞ্চল: কাঞ্চনজঙ্ঘা, চা-বাগান, টয় ট্রেন। মিরিক ও কালিম্পংও কাছে।
৩. শিলং ও চেরাপুঞ্জি: তামাবিল দিয়ে সহজে যাওয়া যায়। ঝরনা, গুহা আর জীবন্ত শিকড়ের সেতু।
৪. দিল্লি, আগ্রা, জয়পুর: তাজমহল, লাল কেল্লা, আমের দুর্গ। একসঙ্গে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল নামে পরিচিত।
৫. আজমির: খাজা মঈনুদ্দীন চিশতির দরগাহ, অনেক বাংলাদেশির কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
৬. কাশ্মীর ও হিমাচল: পাহাড় ও বরফ দেখতে, তবে খরচ ও দূরত্ব বেশি।
৭. পুরী ও গোয়া: সমুদ্রসৈকত।
ভারত ভ্রমণ খরচ: মোটামুটি ধারণা
নিচের হিসাব আনুমানিক, জনপ্রতি, বিনিময় হার ও মৌসুমভেদে বদলায়।
বিজ্ঞাপন
১. কলকাতা, চার দিন, বাসে: আসা-যাওয়া বাস ও ভ্রমণ করসহ আনুমানিক ৫০০০ থেকে ৮০০০ টাকা, থাকা ও খাওয়া মিলিয়ে মোট আনুমানিক ১২০০০ থেকে ২০০০০ টাকা।
২. দার্জিলিং, পাঁচ দিন, স্থলপথে: মোট আনুমানিক ১৫০০০ থেকে ২৫০০০ টাকা।
৩. দিল্লি-আগ্রা-জয়পুর, সাত-আট দিন, বিমানে কলকাতা বা দিল্লি হয়ে: মোট আনুমানিক ৪৫০০০ থেকে ৮০০০০ টাকা বা বেশি।
এর সঙ্গে ভিসা প্রসেসিং ফি যোগ হবে। ভারতের ভেতরে দূরের পথে ট্রেন সাধারণত সবচেয়ে সাশ্রয়ী, টিকিট আগে কাটতে হয়।
বিজ্ঞাপন
খরচ কমাতে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখুন। দুই-তিনজনে মিলে হোটেলের কক্ষ ভাগ করুন, শহরের ভেতরে মেট্রো, বাস বা শেয়ার ট্যাক্সি ব্যবহার করুন, আর পর্যটনকেন্দ্রের রেস্তোরাঁর বদলে স্থানীয় খাবারের দোকানে খান। কলকাতার মতো শহরে নিউমার্কেট ও মারকুইস স্ট্রিট এলাকায় বাংলাদেশিদের জন্য পরিচিত বাজেট হোটেল অনেক, তবে পূজা ও শীতের ছুটিতে দাম বাড়ে, তাই আগে বুকিং দিন।
ফেরার সময় যা খেয়াল রাখবেন
ফেরার পথও ভিসায় উল্লেখিত বন্দর দিয়ে হতে হবে। বাংলাদেশের কাস্টমস বিধি অনুযায়ী ব্যাগেজে কী কী শুল্কমুক্তভাবে আনা যায় আর কোনগুলোর জন্য শুল্ক দিতে হয়, তা জেনে কেনাকাটা করুন। নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি সোনা, ইলেকট্রনিক পণ্য বা বাণিজ্যিক পরিমাণে কাপড় আনলে শুল্ক বা জটিলতা হতে পারে। চিকিৎসার জন্য গেলে প্রেসক্রিপশন ও ওষুধের রসিদ সঙ্গে রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
ভারতের পর্যটন ভিসা পেতে কত দিন লাগে?
সময় চাহিদা ও যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করে। চালু হওয়ার পর চাহিদা বেশি থাকায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতেই সময় লাগতে পারে, তাই যাত্রার অনেক আগে আবেদন করুন।
ভিসায় এক বন্দর লেখা থাকলে অন্য বন্দর দিয়ে কি যাওয়া যায়?
সাধারণত না। ভিসায় উল্লেখিত পথেই প্রবেশ ও বহির্গমন করতে হয়। বিমানপথ উল্লেখ থাকলে বিমানে যাতায়াত করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
ভারতে কি বাংলাদেশি টাকা চলে?
সীমান্ত এলাকার কিছু জায়গা ছাড়া চলে না। ভারতীয় রুপিতে লেনদেন করুন, ডলার বা টাকা অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জে ভাঙান।
চিকিৎসা ভিসা কি এখনো আলাদাভাবে দেওয়া হচ্ছে?
হ্যাঁ, জরুরি চিকিৎসা ভিসা আলাদাভাবে চালু ছিল এবং আছে। চিকিৎসার জন্য গেলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের কাগজসহ চিকিৎসা ভিসায় আবেদন করুন।