আদার উপকারিতা: আদা চা, আদা পানি আর খাওয়ার নিয়ম
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
আমাদের রান্নাঘরে আদা ছাড়া মাছ-মাংসের ঝোল প্রায় অসম্পূর্ণ। সর্দি লাগলে মা-দাদিরা আদা-চা বানিয়ে দেন, বমিভাব হলে আদা কুচি চিবাতে বলেন। প্রশ্ন হলো, এসব ঘরোয়া অভ্যাসের পেছনে বিজ্ঞান কতটা আছে, আর আদা কতটুকু খাওয়া নিরাপদ?
বিজ্ঞাপন
আদার উপকারিতা নিয়ে গবেষণা হয়েছে অনেক। সবচেয়ে ভালো প্রমাণ আছে বমিভাব কমানোর ক্ষেত্রে, যেমন গর্ভাবস্থার প্রথম দিকের বমিভাব বা ভ্রমণের সময় গা গোলানো। এছাড়া হজমে সহায়তা, পেট ফাঁপায় আরাম, মাসিকের ব্যথা আর হাঁটু-গিরার ব্যথা কিছুটা কমানোর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তবে এসব ক্ষেত্রে প্রভাব সাধারণত মাঝারি বা হালকা। সর্দি-কাশিতে আদা চা গলায় আরাম দেয়, কিন্তু সংক্রমণ সারায় না।
রান্নায় ব্যবহৃত পরিমাণ আর দিনে এক-দুই কাপ আদা চা বেশির ভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ। তবে রক্ত পাতলা করার ওষুধ খেলে, পিত্তথলিতে পাথর থাকলে বা অস্ত্রোপচারের আগে আদা বেশি খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আদায় কী আছে
আদার ঝাঁঝালো স্বাদ আর গন্ধ আসে জিঞ্জেরল ও শোগাওলের মতো কিছু প্রাকৃতিক উপাদান থেকে। তাজা আদায় জিঞ্জেরল বেশি থাকে, আর শুকানো বা রান্না করা আদায় এর কিছু অংশ অন্য উপাদানে রূপ নেয়। এসব উপাদানের প্রদাহরোধী ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণ নিয়ে গবেষণা চলছে।
বিজ্ঞাপন
পুষ্টির দিক থেকে আদা খুব অল্প পরিমাণে খাওয়া হয়, তাই এর ভিটামিন-খনিজ দৈনিক চাহিদায় তেমন বড় ভূমিকা রাখে না। আদার মূল্য তাই স্বাদ আর কিছু নির্দিষ্ট উপকারে, পুষ্টির ভান্ডার হিসেবে নয়।
আদার উপকারিতা
১. বমিভাব কমায়: গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে বমিভাব, গাড়ি বা লঞ্চে ভ্রমণে গা গোলানো, কিছু চিকিৎসার পর বমিভাবে আদা উপকারী বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। গর্ভবতী নারীরা আদার ক্যাপসুল বা বড় পরিমাণে খাওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন; রান্না বা চায়ে অল্প আদা সাধারণত সমস্যা করে না।
২. হজমে সহায়তা: ভারী খাবারের পর পেট ভার, ঢেকুর আর পেট ফাঁপায় অনেকে আদা চায়ে আরাম পান। আদা পাকস্থলী থেকে খাবার সামনে এগোতে সাহায্য করতে পারে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত আছে।
বিজ্ঞাপন
৩. সর্দি-কাশিতে আরাম: গরম আদা চা গলা ভেজায়, খুসখুসে ভাব কমায় এবং শরীরের পানির চাহিদা মেটায়। এটি জ্বর বা সংক্রমণের চিকিৎসা নয়; জ্বর তিন দিনের বেশি থাকলে, শ্বাসকষ্ট বা বুকে ব্যথা হলে চিকিৎসকের কাছে যান।
৪. মাসিকের ব্যথা: কিছু ছোট গবেষণায় মাসিকের শুরুর দিনগুলোতে আদা খেলে ব্যথা কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিলেছে। তীব্র ব্যথায় এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়।
৫. গিরার ব্যথা ও প্রদাহ: হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ব্যথায় আদা সামান্য উপকার দিতে পারে বলে কিছু গবেষণা বলছে, তবে প্রভাব ছোট।
৬. রক্তে সুগার: কিছু গবেষণায় আদা রক্তে সুগার সামান্য কমাতে পারে বলে দেখা গেছে। তবে ডায়াবেটিসের ওষুধের বিকল্প হিসেবে আদার ওপর ভরসা করা যাবে না।
বিজ্ঞাপন
আদা চা আর আদা পানি তৈরির নিয়ম
আদা চা: এক ইঞ্চি পরিমাণ তাজা আদা খোসা ছাড়িয়ে পাতলা করে কেটে বা হালকা থেঁতো করে নিন। দেড় কাপ পানিতে দিয়ে ঢেকে পাঁচ থেকে দশ মিনিট ফোটান। যত বেশি ফোটাবেন, তত ঝাঁঝালো হবে। ছেঁকে কাপে ঢালুন। চাইলে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস আর অল্প মধু দিন। চা-পাতা দিয়ে লাল চা বা দুধ চায়ে আদা দিতে চাইলে পানি ফোটার সময় আদা দিয়ে কয়েক মিনিট ফুটিয়ে তারপর চা-পাতা দিন।
আদা পানি: আদা কুচি বা পাতলা টুকরা এক জগ পানিতে কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলে হালকা স্বাদের আদা পানি হয়, যা সারা দিন অল্প অল্প খাওয়া যায়। গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখলে স্বাদ তাড়াতাড়ি আসে। তৈরি আদা পানি ফ্রিজে রেখে এক দিনের মধ্যে শেষ করুন।
আদা-মধু: কাশিতে অনেকে আদার রসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খান। এক বছরের কম বয়সী শিশুকে কোনোভাবেই মধু দেবেন না।
বিজ্ঞাপন
প্রচলিত আছে যে খালি পেটে আদা পানি খেলে ওজন দ্রুত কমে। এর পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই। ওজন কমাতে খাবারের পরিমাণ আর শারীরিক পরিশ্রমই আসল।
আদা খাওয়ার নিয়ম ও পরিমাণ
রান্নায় যে পরিমাণ আদাবাটা বা আদাকুচি দেওয়া হয়, তা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। বাড়তি হিসেবে দিনে এক-দুই কাপ আদা চা, অথবা ছোট এক টুকরা কাঁচা আদা চিবিয়ে খাওয়া বেশির ভাগ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য নিরাপদ বলে ধরা হয়।
যাঁদের গ্যাস্ট্রিক বা বুক জ্বালার প্রবণতা আছে, তাঁরা খালি পেটে কাঁচা আদা না খেয়ে খাবারের পর বা খাবারের সঙ্গে খান। বাজারের আদার ক্যাপসুল, পাউডার বা নির্যাস ঘন ও উচ্চমাত্রার হতে পারে; এগুলো নিয়মিত খেতে চাইলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন।
বিজ্ঞাপন
শিশুদের রান্নায় আদা দেওয়া যায়, তবে কাঁচা আদা চিবাতে দেওয়া বা কড়া আদা চা খাওয়ানো ঠিক নয়।
আদার অপকারিতা আর কারা সাবধান থাকবেন
পরিমাণ বেশি হলে আদা থেকে কিছু সমস্যা হতে পারে:
১. বুক জ্বালা ও অম্লভাব: বিশেষ করে খালি পেটে কাঁচা আদা বেশি খেলে।
বিজ্ঞাপন
২. পেটে অস্বস্তি ও পাতলা পায়খানা: অতিরিক্ত আদা পাকস্থলী ও অন্ত্রে জ্বালা তৈরি করতে পারে।
৩. মুখ ও গলায় জ্বালা: কাঁচা আদা বেশি চিবালে।
যাঁরা সাবধান থাকবেন: রক্ত পাতলা করার ওষুধ যাঁরা খান, তাঁদের বেশি আদায় রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়। অস্ত্রোপচারের আগে কিছুদিন আদার সাপ্লিমেন্ট বন্ধ রাখার কথাও বলা হয়; চিকিৎসককে জানিয়ে রাখুন। পিত্তথলিতে পাথর থাকলে, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খেলে নিয়মিত বেশি পরিমাণে আদা খাওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। আদায় অ্যালার্জি হলে, যেমন মুখে চুলকানি বা ফুসকুড়ি, খাওয়া বন্ধ করুন।
আদা কেনা ও সংরক্ষণ
বিজ্ঞাপন
তাজা আদা শক্ত, ভারী আর মসৃণ খোসার হয়। কুঁচকে যাওয়া, নরম হয়ে যাওয়া বা ছত্রাক ধরা আদা কিনবেন না। আদায় ছত্রাক বা পচন দেখলে শুধু ওই অংশ কেটে না ফেলে পুরো টুকরাই ফেলে দেওয়া নিরাপদ।
আদা কাগজে মুড়ে বা ছিদ্রযুক্ত পলিথিনে ফ্রিজের সবজির তাকে রাখলে দুই-তিন সপ্তাহ ভালো থাকে। আদাবাটা বেশি করে বানিয়ে বরফের ট্রেতে জমিয়ে রাখলে রান্নায় সময় বাঁচে। ঘরে বানানো আদাবাটায় সামান্য লবণ বা তেল দিয়ে মুখবন্ধ পাত্রে ফ্রিজে রাখলে কয়েক দিন চলে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রতিদিন আদা চা খাওয়া কি ঠিক?
বিজ্ঞাপন
দিনে এক-দুই কাপ আদা চা বেশির ভাগ মানুষের জন্য সমস্যা নয়। বুক জ্বালা বা পেটের অস্বস্তি হলে পরিমাণ কমান বা খাবারের পর খান।
শুকনো আদা গুঁড়া আর কাঁচা আদার মধ্যে পার্থক্য কী?
শুকনো গুঁড়া ঘন, তাই অল্প পরিমাণেই ঝাঁঝ বেশি। রান্নায় কাঁচা আদার বদলে গুঁড়া দিলে পরিমাণ অনেক কম দিন। উপকারী উপাদান দুটিতেই থাকে, তবে ধরন কিছুটা আলাদা।
আদা খেলে কি গলা ব্যথা সেরে যায়?
বিজ্ঞাপন
আদা চা গলায় আরাম দেয়, কিন্তু সংক্রমণ সারায় না। গলাব্যথার সঙ্গে জ্বর, গিলতে খুব কষ্ট বা টনসিলে সাদা দাগ থাকলে চিকিৎসকের কাছে যান।
গ্যাস্ট্রিক থাকলে আদা খাওয়া যাবে কি?
অনেকের হজমে আদা আরাম দেয়, আবার কারও কারও বুক জ্বালা বাড়ায়। অল্প পরিমাণে, খাবারের সঙ্গে খেয়ে দেখুন। সমস্যা বাড়লে বাদ দিন।