ঢাকার এই রাস্তায় সেদিন প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলে ওঠে
নবাব আহসানউল্লাহর উদ্যোগে সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যয়ে সে সময় আধুনিকায়নের পথে যাত্রা শুরু করে ঢাকা
ঢাকা জেলা প্রতিনিধি · ঢাকা
প্রকাশ:
এক সময় সন্ধ্যার পর অন্ধকার নেমে আসত ঢাকার অধিকাংশ সড়কে। কেরোসিন কিংবা দু-একটি গ্যাসের বাতি ছিল তখন নগরীর একমাত্র ভরসা। ঘরবাড়ি আলোকিত রাখার জন্য মোমবাতি ও কেরোসিনের বাতির ওপরই নির্ভর করতে হতো সবাইকে। এমন এক পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের বাতি জ্বলে ওঠার ঘটনাটি ছিল নগরবাসীর জন্য এক বড় পরিবর্তন।
বিজ্ঞাপন
১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর আহসান মঞ্জিলে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নবাব আহসানউল্লাহর আমন্ত্রণে সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন কলকাতা থেকে আসা রাজস্ব বোর্ডের সচিব সি ডব্লিউ বোল্টন। বিকেল পাঁচটার দিকে তিনি সুইচ টিপলে জ্বলে ওঠে বৈদ্যুতিক বাতি, যা ঢাকাবাসীর সামনে আলোর এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। নবাব আহসানউল্লাহর উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বাংলার ছোট লাট স্যার জন উডবার্নের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও অসুস্থতার কারণে তিনি আসতে পারেননি।
সে সময় পুরো শহর বিদ্যুতের আওতায় ছিল না। প্রথম পর্যায়ে আহসান মঞ্জিল ও শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বৈদ্যুতিক বাতি স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের ২০ নম্বর গ্যালারিতে সংরক্ষিত তথ্যে উঠে এসেছে, নগরবাসীর দুর্দশা লাঘব, ঢাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের জন্য নবাব আহসানউল্লাহ প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যয়ে ঢাকায় প্রথম বিজলি বাতি স্থাপনের ব্যবস্থা করেন।
পরদিন ৮ ডিসেম্বর এ ঘটনা নিয়ে ঢাকা প্রকাশ পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের ‘ঢাকাসমগ্র ১’ বইয়ে ওই প্রতিবেদনের বরাতে লেখা হয়, ‘গতকল্য সন্ধ্যার অব্যবহিত পরে, শ্রীযুক্ত নবাব বাহাদুরের অনুকম্পায় ঢাকা নগরীর প্রধান প্রধান রাস্তাগুলি চপলা চমকে অকস্মাৎ হাসিয়া উঠিয়াছে…ঢাকার ন্যায় শহরে এরূপ দৃশ্য লোকনয়নে নিপতিত হইবে দশ বৎসর পূর্বে বোধ হয় তাহা স্বপ্নের অগোচর ছিল কিন্তু নবাব বাহাদুরের অপার অনুগ্রহে অসম্ভবও সম্ভব হইয়াছে।’
জাদুঘরে সেদিনের ঘটনা নিয়ে আঁকা একটি কাল্পনিক তৈলচিত্র সংরক্ষিত আছে। পাশাপাশি প্রদর্শিত হচ্ছে তৎকালীন বৈদ্যুতিক বাতি, পাখা, মিটার ও কেটলি। এছাড়া আগের দিনের কেরোসিনের বাতি, সংকেতবাতি ও কেরোসিনচালিত পাখাও সেখানে দেখা যায়। এই বৈদ্যুতিক বাতি স্থাপনের পরিকল্পনায় ছিল রহমতগঞ্জ, চকবাজার, মোগলটুলী, নালগোলা, বাবুবাজার, কমিটিগঞ্জ, ইসলামপুর, আহসান মঞ্জিল, পাটুয়াটুলী, বাংলাবাজার, ফরাশগঞ্জ, লক্ষ্মীবাজার, সদরঘাট, শাঁখারীবাজার, জনসন রোড, নবাবপুরসহ শহরের বিভিন্ন সড়ক। তালিকায় ভিক্টোরিয়া পার্ক ও রেলওয়ে স্টাফ কোয়ার্টার রোডের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিজ্ঞাপন
ঢাকার রাস্তায় বিদ্যুতের বাতি জ্বালানোর এই উদ্যোগ একদিনের ছিল না। ইতিহাস-গবেষক দেলওয়ার হাসানের ‘ঢাকার নবাব পরিবার ও তৎকালীন ঢাকার সমাজ’ বইয়ে ঐতিহাসিক কেদারনাথ মজুমদারের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ আছে, ১৮৮৭ সালে নবাব আহসানউল্লাহর বাবা নবাব খাজা আবদুল গণি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ‘নাইট কমান্ডার অব দ্য স্টার অব ইন্ডিয়া’ (কেসিএসআই) উপাধি লাভ করেন। বাবার এই সম্মান প্রাপ্তিতে আনন্দিত হয়ে আহসানউল্লাহ ঢাকাবাসীকে আনন্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
বইটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কলকাতার ইংরেজি সংবাদপত্র ‘ইংলিশম্যান’ সে সময় একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে জানানো হয়, বাবার উপাধি লাভের ঘটনায় নগরবাসীর আনন্দ ও সৌজন্যের প্রতিদান হিসেবে ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে নিজের খরচে তেলের বাতির বদলে গ্যাসের বাতি স্থাপনের প্রস্তাব দেন আহসানউল্লাহ। তবে তাঁর শর্ত ছিল, আলোর জন্য যে অর্থ ব্যয় হবে, তার বিনিময়ে মিউনিসিপ্যালিটিকে পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দমকলের যন্ত্রপাতি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেছে, ১৮৮৮ সালে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড ডাফরিন ঢাকা সফরে এলে গ্যাসের বাতি স্থাপনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। ১৮৯১ সালে নবাব আহসানউল্লাহর আইনবিষয়ক সচিব জি এল গার্থ ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির কাছে এ বিষয়ে একটি স্মারকলিপিও পাঠান, কিন্তু পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তীতে নবাব আহসানউল্লাহ সরাসরি বিদ্যুতের বাতি স্থাপনের উদ্যোগ নেন।
‘ঢাকার নবাব পরিবার ও তৎকালীন ঢাকার সমাজ’ বইয়ের তথ্যমতে, ১৯০১ সালে ঢাকার রাস্তায় বিদ্যুতের বাতি স্থাপনের জন্য গঠিত হয় ‘দ্য ঢাকা ইলেকট্রিক লাইট ট্রাস্ট’। এই ট্রাস্টের তহবিলে নবাব আহসানউল্লাহ দান করেন সাড়ে চার লাখ টাকা। ওই বছরের ৫ জুলাই ট্রাস্টের পক্ষ থেকে পত্রিকায় প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও সড়কে বিদ্যুৎ সরবরাহের লাইসেন্স পেতে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ঢাকায় বিদ্যুতের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে এবং ৭ ডিসেম্বর আহসান মঞ্জিলে বাতি জ্বালানোর অনুষ্ঠান ছিল সেই প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বিজ্ঞাপন
ঢাকায় বিদ্যুতের আলো উদ্বোধনের মাত্র ৯ দিন পর ১৯০১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নবাব আহসানউল্লাহ মারা যান। তিনি হৃদ্রোগে ভুগছিলেন। সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর ‘নবাব সলিমুল্লাহ ও তাঁর সময়’ বইয়ে ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে লিখেছেন, ‘আহসানউল্লাহ বিষয়সম্পত্তি নিয়ে মানসিক চাপে ছিলেন। তিনি হৃদ্রোগেও ভুগছিলেন। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থা অত খারাপ, তা বাইরে থেকে বোঝা যেত না। আহসানউল্লাহ হৃদ্রোগে আকস্মিকভাবে মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে পূর্ববঙ্গের জনজীবনে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া।’