অনলাইনে বয়স্ক ভাতার আবেদন করার নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
দাদির বয়স সত্তর পেরিয়েছে, আয়ের কোনো উৎস নেই। পাড়ার লোকেরা বলছেন, বয়স্ক ভাতার জন্য আবেদন করো। কিন্তু কোথায়, কীভাবে, কী কাগজ লাগবে, এসব প্রশ্নে অনেক পরিবার আটকে যায়, আর সুযোগ বুঝে কিছু দালাল টাকা চেয়ে বসে। অথচ পুরো আবেদনটি এখন অনলাইনে, বিনা খরচে নিজেরাই করা যায়।
বিজ্ঞাপন
বয়স্ক ভাতা সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অংশ, যা পরিচালনা করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তর। অনলাইনে বয়স্ক ভাতার আবেদন করতে হয় অধিদপ্তরের ভাতা ব্যবস্থাপনা ওয়েবসাইট mis.bhata.gov.bd থেকে। সেখানে ভাতার ধরন হিসেবে বয়স্ক ভাতা বেছে নিয়ে আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ছবি, ঠিকানা, নমিনির তথ্য এবং ভাতা গ্রহণের মোবাইল নম্বর দিয়ে আবেদন জমা দিতে হয়। এরপর স্থানীয় পর্যায়ের কমিটি আবেদন যাচাই করে যোগ্যদের তালিকা চূড়ান্ত করে।
মনে রাখবেন, আবেদন জমা দেওয়া মানেই ভাতা নিশ্চিত হওয়া নয়। বরাদ্দ সীমিত, তাই যাচাই শেষে অগ্রাধিকার অনুযায়ী নির্বাচন হয়। তবে সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদন করলে এবং যোগ্যতার শর্ত পূরণ হলে সুযোগ বাড়ে।
বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা
সমাজসেবা অধিদপ্তরের বাস্তবায়ন নীতিমালায় যোগ্যতার শর্তগুলো নির্ধারিত থাকে। প্রচলিত শর্তগুলো মোটামুটি এমন, তবে সরকার সময়ে সময়ে এগুলো হালনাগাদ করে।
বিজ্ঞাপন
১. বয়স: প্রচলিত নিয়মে সাধারণত পুরুষের ক্ষেত্রে ৬৫ বছর এবং নারীর ক্ষেত্রে ৬২ বছর বা তার বেশি বয়স হতে হয়। বয়স যাচাই হয় জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্মতারিখ দেখে।
২. স্থায়ী বাসিন্দা: আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হয়।
৩. আর্থিক অবস্থা: বার্ষিক আয় নির্ধারিত সীমার নিচে হতে হয়। সীমাটি নীতিমালায় উল্লেখ থাকে এবং পরিবর্তন হতে পারে।
৪. অন্য ভাতা নয়: সরকারি চাকরির পেনশনভোগী বা অন্য কোনো নিয়মিত সরকারি ভাতাভোগী হলে সাধারণত বয়স্ক ভাতার জন্য বিবেচিত হন না।
বিজ্ঞাপন
অগ্রাধিকার পান যাঁরা: শারীরিকভাবে অক্ষম বা অসুস্থ, ভূমিহীন ও গৃহহীন, স্বামী বা স্ত্রী নেই এমন ব্যক্তি, সন্তানহীন বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন প্রবীণেরা নির্বাচনের সময় সাধারণত অগ্রাধিকার পান। বয়স যত বেশি, অগ্রাধিকারও তত বেশি দেওয়া হয়।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
আবেদনের আগে নিচের কাগজ ও তথ্য গুছিয়ে নিন।
১. আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র: নম্বর ও জন্মতারিখ সঠিকভাবে লিখতে হবে। পরিচয়পত্রে তথ্য ভুল থাকলে আগে সংশোধন করে নিন।
বিজ্ঞাপন
২. আবেদনকারীর ছবি: সাম্প্রতিক রঙিন ছবির ডিজিটাল কপি। ওয়েবসাইটে নির্দিষ্ট মাপ ও আকার বলা থাকে।
৩. নমিনির জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি: ভাতাভোগীর অবর্তমানে বা অসুস্থতায় যিনি দায়িত্ব নেবেন, সাধারণত পরিবারের কোনো সদস্য।
৪. মোবাইল নম্বর: ভাতার টাকা এখন সরাসরি মোবাইল আর্থিক সেবা বা ব্যাংক একাউন্টে পাঠানো হয়, যাকে জিটুপি পদ্ধতি বলা হয়। তাই যে নম্বরে ভাতা যাবে, সেটি সাধারণত আবেদনকারীর নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রে নিবন্ধিত হওয়া দরকার এবং তাতে মোবাইল আর্থিক সেবার একাউন্ট থাকা বা খোলার সুযোগ থাকা দরকার।
৫. ঠিকানার তথ্য: বিভাগ, জেলা, উপজেলা বা সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড, গ্রাম ও ডাকঘর।
বিজ্ঞাপন
৬. অন্যান্য: শারীরিক অক্ষমতা, ভূমিহীনতা বা অন্য অগ্রাধিকারের দাবি থাকলে তার প্রমাণ বা প্রত্যয়ন, যদি চাওয়া হয়।
অনলাইনে আবেদনের ধাপ
বয়স্ক ভাতার আবেদন কিভাবে করে, এর ব্যবহারিক উত্তর নিচের আটটি ধাপ। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের নকশা ও ঘরের নাম মাঝে মাঝে হালনাগাদ হয়, তবে সাধারণ ক্রম এমন।
১. ওয়েবসাইটে যান: ব্রাউজারে mis.bhata.gov.bd লিখে অফিশিয়াল সাইটে ঢুকুন। ঠিকানার বানান মিলিয়ে নিন, যাতে ভুয়া সাইটে না যান।
বিজ্ঞাপন
২. ভাতার ধরন বেছে নিন: আবেদনের অংশে গিয়ে বয়স্ক ভাতা নির্বাচন করুন।
৩. পরিচয়পত্রের তথ্য দিন: আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্মতারিখ দিন। তথ্য মিলে গেলে নাম ও অন্যান্য তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসতে পারে।
৪. ব্যক্তিগত ও ঠিকানার তথ্য পূরণ: বৈবাহিক অবস্থা, পেশা, আর্থিক অবস্থা, স্বাস্থ্যগত অবস্থা, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা ইত্যাদি সঠিকভাবে দিন।
৫. নমিনির তথ্য: নমিনির নাম, পরিচয়পত্র নম্বর, সম্পর্ক ও ছবি দিন।
বিজ্ঞাপন
৬. ভাতা গ্রহণের মাধ্যম: যে মোবাইল নম্বর বা একাউন্টে ভাতা নিতে চান, তা দিন।
৭. ছবি আপলোড ও জমা: আবেদনকারী ও নমিনির ছবি আপলোড করে সব তথ্য মিলিয়ে আবেদন জমা দিন।
৮. আবেদনের কপি সংরক্ষণ: জমা দেওয়ার পর আবেদন আইডি বা কপি পাওয়া গেলে তা প্রিন্ট বা স্ক্রিনশট করে রাখুন। পরে খোঁজ নিতে কাজে লাগবে।
আবেদনের পর যা ঘটে
বিজ্ঞাপন
অনলাইনে জমা পড়া আবেদনগুলো স্থানীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে যাচাই হয়। ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটি এবং উপজেলা বা শহর পর্যায়ের কমিটি আবেদনকারীর বয়স, আর্থিক অবস্থা ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো দেখে। প্রয়োজনে আবেদনকারীকে মূল কাগজ নিয়ে উপস্থিত হতে বলা হতে পারে।
নির্বাচিত হলে ভাতাভোগীর তালিকায় নাম ওঠে এবং নির্ধারিত সময় পরপর ভাতার টাকা সরাসরি নিবন্ধিত মোবাইল আর্থিক সেবা বা ব্যাংক একাউন্টে পাঠানো হয়। ভাতার পরিমাণ ও বিতরণের সময়সূচি সরকার নির্ধারণ করে এবং বাজেট অনুযায়ী বদলাতে পারে।
আবেদনের অবস্থা জানতে উপজেলা বা শহর সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন। সেখানে আবেদন আইডি বা পরিচয়পত্র নম্বর দিলে অগ্রগতি জানা যায়।
ভাতা চালু হওয়ার পর কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুন। যে মোবাইল নম্বরে ভাতা আসে, সেটি যেন সচল থাকে এবং সিম হারিয়ে না যায়। নম্বর বদলাতে হলে নিজে থেকে নয়, সমাজসেবা কার্যালয়ের নির্ধারিত পদ্ধতিতে বদলাতে হয়। ভাতার টাকা এলে এসএমএস আসে, তা মিলিয়ে দেখুন এবং কোনো কিস্তি না এলে কার্যালয়ে জানান।
বিজ্ঞাপন
প্রতারণা থেকে সাবধান
ভাতার নাম ব্যবহার করে প্রতারণা প্রায়ই দেখা যায়। কেউ ফোন করে বলেন, "আপনার ভাতা এসেছে, টাকা পেতে কোডটি বলুন", কেউ আবার নাম তালিকায় তুলে দেওয়ার কথা বলে টাকা চান। মনে রাখবেন, আবেদন করতে কোনো ফি লাগে না এবং সরকারি কোনো কর্মকর্তা ফোনে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পিন বা ওটিপি চান না। বয়স্ক মানুষের ফোনে মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্ট থাকলে পরিবারের একজন বিশ্বস্ত সদস্য যেন বিষয়টি নজরে রাখেন এবং পিন গোপন রাখতে সাহায্য করেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
নিজে অনলাইনে আবেদন করতে না পারলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে গিয়ে সাহায্য নিতে পারেন। পরিবারের কোনো সদস্য মোবাইল বা কম্পিউটার থেকেও আবেদনকারীর হয়ে তথ্য পূরণ করতে পারেন, তবে সব তথ্য আবেদনকারীর নিজের হতে হবে।
জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স কম লেখা থাকলে কী হবে?
যোগ্যতা যাচাই হয় পরিচয়পত্রের জন্মতারিখ অনুযায়ী। তথ্য ভুল থাকলে নির্বাচন কমিশনের নিয়মে পরিচয়পত্র সংশোধন করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ এবং প্রমাণের প্রয়োজন হয়।
স্বামী-স্ত্রী দুজনই কি বয়স্ক ভাতা পেতে পারেন?
বিজ্ঞাপন
নীতিমালার শর্ত ও স্থানীয় বরাদ্দের ওপর এটি নির্ভর করে। প্রত্যেকে আলাদাভাবে আবেদন করতে পারেন, তবে নির্বাচন হবে যাচাই ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। বিস্তারিত স্থানীয় সমাজসেবা কার্যালয় থেকে জেনে নিন।
ভাতাভোগী মারা গেলে কী করতে হয়?
দ্রুত উপজেলা বা শহর সমাজসেবা কার্যালয়কে জানাতে হয়। নমিনির প্রাপ্য ও প্রক্রিয়া নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
আবেদন করার নির্দিষ্ট সময় আছে কি?
বিজ্ঞাপন
অনলাইনে আবেদন সাধারণত বছরের যেকোনো সময় জমা দেওয়া যায়, তবে নতুন ভাতাভোগী নির্বাচন হয় বরাদ্দ ও সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে। তাই যোগ্য হলে দেরি না করে আবেদন জমা দিয়ে রাখুন এবং স্থানীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের ঘোষণার খোঁজ রাখুন।