বরেন্দার তেভাগা যোদ্ধাদের গল্প, বিস্মৃতির গভীর থেকে ফিরে এসেছে
২৪ অক্টোবর বরেন্দা গ্রামে পরিবারকে সম্মাননা ও শিশুদের শিক্ষা উপকরণ প্রদান করা হয়
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি · চাঁপাইনবাবগঞ্জ
প্রকাশ:
বিপ্লবী ইলা মিত্রের নেতৃত্বে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের ঘাঁটি অঞ্চল ছিল নেজামপুর ইউনিয়নের কেন্দুয়া, ঘাঁসুড়া, রাওতাড়া, চণ্ডীপুর, কুসমাডাঙ্গাসহ কয়েকটি গ্রাম। একই ইউনিয়নের বরেন্দা গ্রামেও ইলা মিত্রের অনুসারী সক্রিয় কর্মী ও সমর্থকরা সক্রিয় ছিলেন। ১৯৫০ সালের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ইলা মিত্রের গ্রেপ্তার এবং আন্দোলনের ভাঙনের ফলে বরেন্দা গ্রামেও ব্যাপক অভিযান চালানো হয়। গ্রেপ্তার হয় বেশ কয়েকজন, তাদের মধ্যে সোমরা মুন্ডা পুলিশের নির্যাতনে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে মারা যান, তবে কারাগার কর্তৃপক্ষ তার দেহ পরিবারকে হস্তান্তর করেনি।
বিজ্ঞাপন
পরিবারের লোকজন ভয়ে কারাগার অনুসন্ধানও করেনি; কারাভোগ শেষে অন্যরা বাড়ি ফিরে এলে সোমরা মুন্ডার মৃত্যুর নিশ্চিত খবর পান। বরেন্দা গ্রামের তেভাগা আন্দোলনের এই কর্মীদের সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো লেখক বা গবেষক গ্রামে আসেননি, পরিবার জানায়। প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২৪ অক্টোবর বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন্ধুসভা বরেন্দা গ্রামে গিয়ে শহীদ কর্মীদের পরিবারকে সম্মাননা জানায় এবং শিশুদের শিক্ষা উপকরণ উপহার দেয়।
গ্রামের দুর্গামন্দিরে বন্ধুসভার সভাপতি মাসরুফা খাতুনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি ঝড়ু মুন্ডা (৮৮), যিনি তেভাগা আন্দোলনের সময় মাত্র ১২ বছর বয়সী ছিলেন। তিনি স্মৃতি হাতে নিয়ে বলেন, ‘যখুন ধরপাকড় চলছোলো, তখুনি হামি গরু চরাছুনু। তখুন পুলিশেরা গুলিও ফুটায়। গরু থুয়্যা হামি দৌড় মারি।’
ঝড়ু মুন্ডা জানান, সোমরা মুন্ডা তাঁর ফুফা, যিনি রাজশাহী কারাগারে বন্দি অবস্থায় মারা যান, কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ পরিবারকে দেহ হস্তান্তর করেনি। মৃত্যুর কয়েক দিন পর লোকমুখে খবর পেয়ে স্বজনেরা ভয়ে কারাগারে গিয়ে খোঁজ নিতে পারেনি। তিনি আরও জানান, দীর্ঘদিন কারাবাসের পর ফিরে আসেন আন্দোলনের কর্মী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ও বরেন্দা গ্রামের নগেন মুন্ডা, তাঁর সঙ্গে হাসরু ওঁরাও, লুগু ওঁরাও, বাবলা মুন্ডা, মাকুয়া ওঁরাও ছিলেন।
বাবলা মুন্ডা ও মাকুয়া ওঁরাও বৃদ্ধ বয়সে কারাভোগের শিকার হন; গ্রাম থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে নির্যাতনের শিকার হন। গ্রামের এক মুসলিম জোতদার পুলিশকে তথ্য দেন, ফলে নগেন মুন্ডার বাড়িতে তল্লাশি করে কমিউনিস্ট পার্টির চাঁদা আদায়ের রসিদ বই পাওয়া যায়, যার ওপরই অতিরিক্ত নির্যাতন হয়। ইলা মিত্রের সহযোদ্ধা বাবলা মুন্ডা, হাসরু ওঁরাও, মাকুয়া ওঁরাও বাবলা মুন্ডার স্বজনদের কেউ আর দেশে নেই।
বিজ্ঞাপন
নগেন মুন্ডার ছেলে রতি মুন্ডা (৬৫) বলেন, ‘কারাগার থেকে বাড়ি ফিরে এসে বাবা বিয়ে করেন। বাবা গল্প করতেন আন্দোলনের সময়কার ঘটনার। বলতেন, “আমরা শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য কমিউনিস্ট পার্টি করতাম।” আমিও বাবার আদর্শ ধারণ করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) রাজনীতি করি, সমাজতন্ত্রের রাজনীতি করি। বাবা তো মেহনতি মানুষদের জিতিয়ে যেতে পারেননি। আমার জীবদ্দশায়ও জিত হবে বলে মনে হয় না। তবে আমার সন্তানদের সময় হবে বলে বিশ্বাস করি।’
গ্রামের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি জাতীয় আদিবাসী পরিষদের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সভাপতি টুনু পাহান বলেন, ‘গ্রামের হাতে গোনা কিছু বয়স্ক লোক ছাড়া এ কাহিনির কথা কেউ জানত না। বন্ধুসভার এমন আয়োজনের কারণে আজ গ্রামের অনেকেই জানল। তেভাগা আন্দোলনের প্রয়াত কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের ফুল দিয়ে সম্মাননা জানানো হলো। শিশুদের শিক্ষা উপকরণ দিল। এই প্রথমবারের মতো গ্রামের তেভাগা আন্দোলনের কর্মীদের নিয়ে আলোচনা হলো। তাঁরা তো বিস্মৃতির গভীরে হারিয়ে যাওয়া মানুষ। ইলা মিত্রকে নিয়েও আলোচনা হলো। এই সবকিছুর জন্য বন্ধুসভাকে মন থেকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাই।’
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বন্ধুসভার উপদেষ্টা আনোয়ার হোসেন ও মনোয়ারা খাতুন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাবুডাইং আলোর পাঠশালার প্রধান শিক্ষক আলীউজ্জামান নূর, সহকারী শিক্ষক নয়ন আহমেদ, উজ্জ্বল পাহান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক রামিজ আহমেদ, সহসাংগঠনিক সম্পাদক মুশফিক মাহাদি, প্রশিক্ষণ সম্পাদক মেরাজুল ইসলাম এবং বন্ধু মো. নাসিফ প্রমুখ। সভা শেষে তেভাগা আন্দোলনের শহীদ কর্মীদের পরিবারের ২০ জন সদস্যকে ফুল দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়।